‘মেয়েরাও পারে’—এই কথাটা শুনতে নিরীহ, নির্দোষ। আমাদের মনে উল্লাস জাগায়। কিন্তু সামান্য ‘ও’-এর সংযোজন যে কি তীব্র বৈষম্য-বিষ, তা নিয়ে হয়তো নতুন করে ভাবার সময় এসেছে!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 31 October 2025 12:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা উপমান—যার সঙ্গে তুলনা টানছি। অন্যটা উপমেয়—যাকে তুলনা করা হল। অলঙ্কারশাস্ত্রে উপমেয়ই মূল বস্তু বা পদ। 'চাঁদের মতো মুখ' বলছি যখন, তখন অজান্তে হলেও চাঁদকেই গরিমাময় করে তুলছি। মুখ সুন্দর। কিন্তু তার সৌন্দর্য বোঝাতে আরও অপরূপ কিছুর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে!
কথাগুলো মাথায় এল অস্ট্রেলিয়াকে পর্যুদস্ত করে ভারতের মেয়েদের ফাইনালে জায়গা পাকা করাকে কেন্দ্র করে। ঐতিহাসিক এই সাফল্য। উত্তুঙ্গ অর্জন৷ সাতবারের চ্যাম্পিয়নকে হারানো মুখের কথা নয়। দেশজুড়ে উৎসব৷ মেয়েদের ক্রিকেট নিয়েও উৎসাহ বাড়ছে। দিকে দিকে।
কিন্তু পাশাপাশি যদি প্রশ্ন তোলা যায়: সত্যি কি আমরা ট্যাবু ভাঙতে পেরেছি? যদি ভেঙেই থাকি, তাহলে কেন জেমাইমার ইনিংসকে কুর্নিশ জানাতে বারবার গম্ভীরের ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের ইনিংসের তুলনা টানা হবে? কেন ঘুরেফিরে আসবে ধোনির নাম? প্রশস্তির আড়ালেও কীভাবে লিঙ্গের উচ্চাবচতা আত্মগোপন করে রয়েছে? কেন ‘উত্তমর্ণ ছেলেদের ক্রিকেটে’র আলোয় ‘অধমর্ণ মেয়েদের ক্রিকেট’কে বিচার করা হবে? মুখে আগল ভাঙার কথা বলছি বটে। কিন্তু ছদ্মবেশে প্রশংসার আড়ালে উপমান আর উপমিতের বৈষম্যকে কি অনবরত প্রশ্রয় দিয়ে চলছি না?
৩৩৯ রানের টার্গেট। শুধু বিশ্বকাপ কেন, মেয়েদের ক্রিকেটের কোনও আন্তর্জাতিক মঞ্চেই এত বড় স্কোর তাড়া করে জেতেনি কেউ। ঘরের মাঠে খেলা৷ প্রত্যাশার চাপ৷ তদুপরি গ্রুপ স্তরে লাগাতার খারাপ পারফরম্যান্স—নক আউটে ওঠাই যখন অনিশ্চিত ছিল, প্রশ্ন উঠেছিল হরমনপ্রীত কৌরের অধিনায়কত্ব নিয়ে, কোচ অমল মজুমদারের রণকৌশল সাজানো নিয়ে, দলগত সংহতি নিয়ে—তখন সবকিছু সামলে দুর্ধর্ষ অস্ট্রেলিয়া—গেলবার সুদ্ধ সাতবারের চ্যাম্পিয়ন টিমকে হারানো কি চাট্টিখানি কথা!
জেমাইমা, হরমনপ্রীতরা সেই সংশয়কে বস্তা বেঁধে আরব সাগরে ছুড়ে ফেললেন। দেখালেন জোশ, জুনুন... তীব্র আগ্রাসন, মাপা সংযম। শুরুতে ধরে খেলে, উইকেট বাঁচিয়ে, পার্টনারশিপ বাঁচিয়ে ইনিংস সাজানো। টার্গেট, যার নাগালটুকু পাওয়া অসাধ্য বলে মনে হচ্ছিল, তাকে বাগে আনা। তারপর মিডল অর্ডারে গিয়ার বদল। ঝুঁকি নেওয়া। ভাগ্য সঙ্গ দিল নিশ্চয়৷ কিন্তু ভাগ্যলক্ষ্মী আর সাহসী, উদ্যমীদের নিয়ে তো প্রবাদ চালুই আছে... ইনিংস বিরতির 'পেপ টকে' অনিবার্যভাবে এই কথাটা মেলে ধরেছিলেন অমল!
দেশের মহিলা ক্রিকেটের পরিমণ্ডলে যখন এই জয়কে 'ক্রান্তি', একটা পরিচ্ছন্ন পালাবদলের মুহূর্ত বলে ধরা হচ্ছে, উঠে আসছে অনেক অকথিত বয়ান, যা হাজারো জৌলুসের আড়ালে এতদিন চাপা পড়েছিল, অজস্র পারিবারিক মুহূর্ত আর ‘ঘরের কথা’ না থেকে পলকে দুনিয়ার সামনে ফুটে উঠছে, পর্দা উঠছে লজ্জার, মানসিক অবসাদ আর জড়তাকে জিতে কীভাবে হার না মারা জেদ দেখিয়েছেন তিনি—চোখে চোখ রেখে বলে উঠছে জেমাইমা, ভাঙছে 'মেয়েদের খেলা' নিয়ে অচ্ছুৎ-আগল, অনিচ্ছার ট্যাবু—তখনও কি সন্তর্পণে লিঙ্গভেদ সংক্রমিত হচ্ছে 'প্রশস্তি' আর 'তুলনা'র ছদ্মবেশে!
জেমাইমা বিজয়িনী, কিন্তু ‘অ-তুলনীয়’ নন৷ আমাদের মনে করতে এবং করাতেই হবে গম্ভীরের ইনিংসের কথা! শেষে হাঁকানো জয়সূচক বাউন্ডারি চোখে-জল-আনা, নয়নাভিরাম। কিন্তু তা উপমান মাত্র। 'উপমেয়' হিসেবে ইনস্টাগ্রাম রিলে বারবার, বারবার ঘুরেফিরে আসবে মহেন্দ্র সিং ধোনির এগারোর বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রলম্বিত ছক্কা। দুটোকে পাশে রাখতেই হবে। নিজের কিরণে পূর্ণ প্রস্ফুটিত নন জেমাইমা, হরমনপ্রীত, রিচারা! তাঁদের সাফল্য ঐতিহাসিক। কিন্তু ইতিহাসেরও পূর্ব স্তর রয়েছে। মনে করানো হবে এই কঠোর সত্য।
অবাক লাগে—যেখানে এই জয়ই যথেষ্ট ইতিহাস লেখার জন্য, সেখানে এখনও তার পাশে পুরুষের ইতিহাস টেনে আনতে হয় কেন? অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ভারতের মেয়েরা যে কীর্তি গড়েছে, সেটি যেন স্বাধীন, স্বাবলম্বী নয়! যেন তারও একটা মানদণ্ড দরকার। দুটোকে মেলালে ‘দেশে’র সাফল্য পূর্ণতা পায়! তাই ঘুরেফিরে রোহিত-বিরাট-ধোনিদের ‘রেফারেন্স’! যেন মান্ধানাদের অর্জনকে বোঝানোর জন্যই পুরুষদের কীর্তিকে তুলনা হিসেবে হাজির করতেই হবে। এই মানসিকতা শুধু খেলার দুনিয়ায় নয়, গোটা সমাজে ছড়িয়ে থাকা এক অদৃশ্য ব্যারোমিটার—যার স্কেলে নারী-অর্জনকে মাপা হয় পুরুষদের সাফল্যের কাঁটা দিয়ে!
সমস্যাটা এখানেই। আমরা বাহ্যত প্রশংসা করি, কিন্তু অবচেতনে টেনে তুলি তুলনা! আকছার বলি, ‘স্মৃতি আজ গম্ভীরের মতো খেলেছে’, ‘হরমন দ্যাখো ধোনির মতো ঠান্ডা মাথা দেখিয়েছে’, ‘শ্রী চরণির ঠিক কোহলির মতো ফিটনেস’! অথচ জেমাইমা, রিচা—তো কারও প্রতিরূপ নন! তাঁরা সমস্ত খামতি, অর্জন, পরিশ্রম মিলিয়ে নিজেদের গড়ে তুলেছেন! কিন্তু আলাদা করে নারী হওয়ার জন্যই তাঁর সাফল্য বুঝি যথেষ্ট নয়—আরও একটা ‘চেনা মুখ’ লাগবে পাশেই, যাতে প্রশংসাটার ওজন বাড়ে।
এই প্রবণতা নতুন নয়। ১৯৭৩ সালে যখন ইংল্যান্ডে প্রথম মহিলা বিশ্বকাপ হয়েছিল—পুরুষদের বিশ্বকাপেরও আগে—তখনও খবরের কাগজে লেখা হয়েছিল, ‘ক্রিকেটে মেয়েরাও নেমেছে!’ অর্থাৎ, খেলাটা ‘তাদের’ ছিল, মেয়েরা শুধু ‘চেষ্টা’ করছে। ২০২৫-এ দাঁড়িয়ে ছবিটা খুব বদলায়নি। ভাষার অন্দরেই লিঙ্গবৈষম্য গেঁথে! যখন পুরুষরা জেতে, লেখা হয় ‘টিম ইন্ডিয়া জিতল’! যখন মেয়েরা শেষ হাসি হাসে, তখন ‘ইন্ডিয়া উইমেন’ জেতে… বয়ান বদলে যায়! এই বাড়তি বিশেষণটাই আমাদের অভ্যেসের আয়না—নারী ক্রিকেট এখনো যেন মূল স্রোতের বাইরে, এক ‘অন্য ইন্ডিয়া’!
পরিসংখ্যানও এই ফারাকের সাক্ষ্য দিচ্ছে। ছেলেদের ক্রিকেটে বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (BCCI) বছরে মিডিয়া রাইটস থেকে আয় করে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। মহিলা ক্রিকেটে সে অঙ্ক এখনও ১০০ কোটির গণ্ডি ছোঁয়নি। বেতন কাঠামো বদলেছে, হ্যাঁ—এখন নারী ক্রিকেটাররাও সমান ম্যাচ ফি পান—তবু বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, টেলিভিশন-স্লট, দর্শকসংখ্যা—সবেতেই বৈষম্য! মহিলাদের বিশ্বকাপ ফাইনালে (২০২৩) গড় দর্শক ছিল ৯ কোটির মতো; পুরুষদের ফাইনালে তা ছুঁয়েছিল ৩০ কোটির উপরে!
এই হিসেব কিন্তু কেবল সংখ্যার পার্থক্য নয়, মানসিক ফারাকের প্রতিফলন। আমরা এখনও নারী ক্রিকেট দেখি ‘অনুপ্রেরণার’ চোখে, নিখাদ ‘স্পোর্টস’ হিসেবে নয়। যেন তারা খেলছে সমাজকে কিছু প্রমাণ করার জন্য। আর পুরুষরা জেতার লক্ষ্যে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবধানই মূল সংকট। হরমনপ্রীতদের এই অর্জন তাই শুধু মাঠের লড়াই নয়, এক সামাজিক যুদ্ধ। একটা দল, যারা নিয়মিত ৮০–৯০ শতাংশ সময় পায় না প্রাইম টাইম টেলিকাস্টে, তাদের জয় সেই প্রান্তিকতার জবাব।
একটা ঘটনা মনে পড়ছে—২০২০ সালের টি২০ বিশ্বকাপ ফাইনাল। মেলবোর্নে গর্জন তুলেছিল এক লক্ষেরও বেশি দর্শক। তবু টেলিভিশনে আলোচনার বড় অংশজুড়ে ছিল—‘এরা কি ধোনিদের মতো বড় ম্যাচ সামলাতে পারবে?’ কেন এই প্রশ্ন? কেন এমন দৃষ্টিকোণ? কোন যুক্তিতে হরমনপ্রীতদের কাঁধে অদৃশ্য বোঝা কেন চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে ‘দায়িত্ব’ হলেও, মেয়েদের ক্ষেত্রে বদলে যায় ‘পরীক্ষা’-য়?
এই টেস্টের মানদণ্ড শুধু পারফরম্যান্স নয়, আচরণেও। মেয়েদের মাঠে উত্তেজনা মানেই ‘অযথা আগ্রাসন’। ছেলেরা করলে সেটা ‘প্যাশন’। একই কাজ, কিন্তু প্রতিক্রিয়া উলটো। একই অভিব্যক্তি, বিশ্লেষণ আলাদা।
‘মেয়েরাও পারে’—এই কথাটা শুনতে নিরীহ, নির্দোষ। আমাদের মনে উল্লাস জাগায়। কিন্তু সামান্য ‘ও’-এর সংযোজন যে কি তীব্র বৈষম্য-বিষ, তা নিয়ে হয়তো নতুন করে ভাবার সময় এসেছে!