শাকিব আল হাসান বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন। তাঁর বিদায় যদি সম্মানের সঙ্গে হয়, তাতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু তাঁকে যদি বিসিবির ব্যর্থতা ঢাকার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটা সমস্যা।

শাকিব আল হাসান
শেষ আপডেট: 26 January 2026 12:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শনিবার, ২৪ জানুয়ারি—বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে দিনটা আলাদা করে মনে রাখার মতো। সকালে চরম অপমান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) জানিয়ে দিল, টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জায়গায় খেলবে স্কটল্যান্ড। ভারতে ম্যাচ খেলতে অস্বীকার করায় মুস্তাফিজুরদের বিদায় কার্যত নিশ্চিতই ছিল। তবু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ঘনিয়ে আনে প্রবল ধাক্কা!
আর সেই একই দিনে, ঠিক কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে, সামনে এল আরেকটা বিস্ময়কর খবর। প্রায় দেড় বছর ধরে দেশে ঢোকার অনুমতি না পাওয়া শাকিব আল হাসান (Shakib Al Hasan) নাকি আবার জাতীয় দলের জন্য ‘যোগ্য’! বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (Bangladesh Cricket Board) বা বিসিবি হঠাৎই জানিয়ে দিল—ফিট থাকলে সাকিবের ফেরার রাস্তা খোলা। সময়টা এমনই, যাতে প্রশ্ন না উঠে পারে না—এই ঘোষণা নিছক কাকতালীয়, নাকি সচেতনভাবে সাজানো ‘ডাইভারশন’?
বিশ্বকাপ অপমানের দিনেই কেন শাকিব?
টি-২০ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। ভারতবিরোধী অবস্থান, কূটনৈতিক জটিলতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল আগে থেকেই সাজানো। কিন্তু বিস্ময় জেগেছে বিসিবি-র সিদ্ধান্তে: কেন সাকিবের প্রসঙ্গ ঠিক সেই দিনেই উঠতে হল?
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন (Amzad Hossain) এবং পরিচালক আসিফ আকবর (Asif Akbar) দু’জনই প্রকাশ্যে জানান, শাকিব খেলতে চাইলে আর কোনও বাধা নেই। অথচ কিছুদিন আগে এই আসিফ আকবরের বক্তব্য ছিল, ক্ষমা না চাইলে এবং রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার না করলে প্রাক্তন অধিনায়কের জাতীয় দলে ফেরার প্রশ্নই ওঠে না। এই নাটকীয় ইউ-টার্ন কি বিশ্বাসযোগ্য?
‘শাকিব কার্ড’—নাটকীয় পাবলিসিটি নাকি প্রাপ্য সম্মান?
এক পুরনো মন্তব্যে সাকিব নিজেই বলেছিলেন, ‘আমাকে বাদ দিলে ক্রিকেটটা বোরিং হয়ে যাবে। মিডিয়ারও শাকিব লাগে।’ সেই কথাই যেন হাতেগরম প্রমাণ করল বিসিবি। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার লজ্জা ঢাকতে কি সবচেয়ে বড় তারকাকে সামনে আনা হল?
‘ভারত টুডে’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনি (Ariful Islam Roney) এই সিদ্ধান্তকে সোজাসাপটা ‘হাস্যকর’বলেছেন। তাঁর যুক্তি পরিষ্কার—শাকিব এখনও আওয়ামী লিগের (Awami League) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথাও বলেছেন। তাহলে বদল কোথায়? আচমকা কী এমন ঘটল যে বিসিবির অবস্থান পুরো পালটে গেল? রনির মতে, ‘এটা স্পষ্টতই একটা হিসেবি চাল। বিশ্বকাপের ব্যর্থতা, প্রশাসনিক অচলাবস্থা—সব থেকে নজর ঘোরানোর জন্য শাকিবকে সামনে আনা হচ্ছে।’
বিসিবির ভিতরে ভাঙন, বাইরে বিশৃঙ্খলা
এই ঘোষণার পেছনের প্রেক্ষাপট আরও অস্বস্তিকর। বিসিবি এই মুহূর্তে গভীর সংকটে। পরিচালক ইশতিয়াক সাদেক (Ishtiaque Sadeque) পদত্যাগ করেছেন। অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মোখলেসুর রহমান শামিম (Mokhlesur Rahman Shamim) সরে দাঁড়িয়েছেন ম্যাচ-ফিক্সিং সংক্রান্ত অভিযোগের পরে। আন্তর্জাতিক স্তরে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা বাংলাদেশ হারিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভোট। রনির কথায়, ‘বিসিবির মধ্যে সমন্বয়ের সম্পূর্ণ অভাব। পরিচালকদের মধ্যে প্রকাশ্য ঝগড়া। এই অবস্থায় সাকিবকে সামনে এনে একটা “ভালো খবর” বানানোর চেষ্টা চলছে!’
সম্মান আগে, স্টান্ট নয়
শাকিব আল হাসান বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন। তাঁর বিদায় যদি সম্মানের সঙ্গে হয়, তাতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু তাঁকে যদি বিসিবির ব্যর্থতা ঢাকার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটা সমস্যা। শাকিব নিজেই জানিয়েছেন, দেশে খেলে অবসর নিতে চান। বিসিবির উচিত ছিল সেই ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া, নাটক না বানিয়ে পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া। এক জন ক্রিকেটারকে তাসের মতো ব্যবহার করে প্রশাসনিক দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফলই দেয়।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আসল প্রয়োজন—স্বচ্ছতা, স্থিরতা আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ‘শাকিব কার্ড’ খেললে হয়তো কিছুক্ষণের জন্য শোরগোল তৈরি হবে। কিন্তু তাতে বিশ্বকাপের লজ্জা বা বোর্ডের ভাঙন—কোনোটাই ঢেকে রাখা যাবে না।