প্রশ্নটা টেকনিক বনাম মানসিকতার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সামান্য ধৈর্য যোগ হলে কি তাঁর খেলা আরও ভারসাম্য পাবে? নাকি ধৈর্য বাড়াতে গিয়ে হারিয়ে ফেলবেন নিজের স্বভাবসিদ্ধ আগ্রাসন?

অভিষেক শর্মা
শেষ আপডেট: 23 February 2026 12:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অনুরাগীরা আহ্লাদে গালভরা কিছু তকমা দিয়েছিলেন। কেউ ডাকতেন ‘অভিসিক্স’ বলে। কারও নজরে যুবরাজ সিংয়ের হাতে গড়ে ওঠা মানসপুত্র যেন সাক্ষাৎ ‘বেবি যুবি’! কয়েক মাস আগেও নামটা উচ্চারণ হলেই ব্যাটে আগুন ঝরত। প্রথম বলে ছক্কা। পাওয়ারপ্লে-তে ঝড়।
সেই অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma) এখন টানা ব্যর্থতায় কোণঠাসা। টি-২০ বিশ্বকাপের (T20 World Cup 2026) মতো বড় মঞ্চে এখনও ছাপ ফেলতে পারেননি। তার উপর পাকিস্তানের পেসার মহম্মদ আমির (Mohammad Amir) প্রকাশ্যে তাঁকে ‘স্লগার’ বলে দেগে দেওয়ায় বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। উঠেছে প্রশ্ন। সত্যিই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে গিয়েছে? নাকি এ কেবল টি-২০ ক্রিকেটে ফর্মের স্বাভাবিক ওঠাপড়া?
‘স্লগার’ মন্তব্য: নিছক অপমান না টেকনিকের প্রশ্ন?
ভারতীয় ওপেনারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার আরও এক নজির ফুটে উঠল গতরাতে, আমদাবাদের ময়দানে। পরপর তিন শূন্যের পর রানের খাতা খুললেও দলের হাল ধরতে ব্যর্থ। সেই প্রেক্ষিতে মহম্মদ আমির জানালেন, পূর্বকথিত ‘স্লগার’ শব্দটি অপমানে ব্যবহার করেননি। তাঁর যুক্তি—অভিষেকের ব্যাটিং টেকনিক এমন, যেখানে পাকা বোলাররা তাঁকে ফাঁদে ফেলতে পারে। কাল দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) বিরুদ্ধে সংক্ষিপ্ত ইনিংসেও (১৫) মূলত খারাপ বলেই রান করেছেন তিনি, ভাল ডেলিভারি সামলাতে ব্যর্থ—এমনই দাবি আমিরের। প্রাক্তন পাক পেসারের মন্তব্যে বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি নিরপেক্ষ মহলে প্রশ্ন উঠেছে—অভিষেকের খেলার ধরন কি পুরোটাই ঝুঁকিপূর্ণ? বুঝে ইনিংস গোছানোর কোনও ‘প্ল্যান-বি’ নেই?
বিশ্লেষকদের চোখে, ভারতীয় ওপেনার এমন ব্যাটার, যিনি বলের মেধা বিচার করে খেলার চেয়ে, নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী আক্রমণ চালাতে বেশি পছন্দ করেন। অফ-সাইডে জায়গা তৈরি করে মারেন। শর্ট বল সামলাতে জানেন। হাত চালান দ্রুত। স্ট্রাইক রেট ভয়ংকর। কিন্তু এই স্টাইলের ভেতরেই লুকিয়ে আছে উইকেট হারানোর ঝুঁকি।
‘অভিসিক্স’ দর্শন
ভারতীয় দল (India) গত এক বছরে একটি স্পষ্ট দর্শন মেনে খেলছে—প্রতিপক্ষ যেই থাক, প্রথম বল থেকেই আক্রমণ শানাতে হবে। উইকেট পড়লে পড়ুক, গতি থামানো যাবে না। এই কাঠামোয় অভিষেক ফ্রন্টম্যান! বাঁ-হাতি ওপেনার, আক্রমণাত্মক, অপ্রথাগত। রেকর্ডের বিচারে বেশ সফলও। ২০২৫ সালে ২১ ম্যাচে ৮৫৯ রান করেছিলেন। সেখান থেকেই আত্মবিশ্বাস জমে ওঠে, দলের বিশ্বাসও তৈরি হয়।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিপক্ষও বসে থাকে না। ভিডিও অ্যানালিসিস চলে। পায়ের মুভমেন্ট থেকে কোন দিকে জায়গা করে মারেন, কোথায় বল ঢুকলে অস্বস্তি—সব নোট করা হয়। এই কারণে প্রথম দফার সাফল্যের পরই দ্বিতীয় দফার পরীক্ষা। সাফল্যের হার কমে যাওয়া অনিবার্য। বোলাররা গতি বদলায়, লেংথ পাল্টায়। যার ফলশ্রুতিতে গতকাল দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে মার্কো জানসেনের (Marco Jansen) স্লোয়ার বলে ধরা পড়লেন অভিষেক। এটাই টি-২০ ক্রিকেটের স্বরূপ! ঝুঁকি যত বেশি, মুনাফার হারও তত চড়া। কিন্তু পাশাপাশি রয়েছে ব্যর্থতার সম্ভাবনাও। অভিষেককে আপাতত সেই জ্বালা সহ্য করতে হচ্ছে।
তাহলে কি বুদ্বুদ ফেটে গেল?
এই প্রশ্নটাই এখন জোর চর্চায়। টানা শূন্য, তারপর ছোট ইনিংস। ব্যাটিংয়ে অস্থিরতা। স্ট্রাইক রোটেশন নেই। বড় শটের চেষ্টা অব্যাহত।
এত অন্ধকারের মধ্যে এটাও সত্যি—এই ঝুঁকিপূর্ণ স্টাইলে অভিষেক নিজের নাম করেছেন। টি-২০-তে কোনও ব্যাটার ৫০ শতাংশের বেশি সাফল্যের গ্যারান্টি দিতে পারেন না। বিশেষ করে এই ধরনের আক্রমণাত্মক ভূমিকায়। ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট এখনও তাঁর পাশে। অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav) তাঁর গত বছরের পারফরম্যান্সের কথা স্মরণ করিয়েছেন। সহকারী কোচ রায়ান টেন দুশখাতে (Ryan ten Doeschate) জানিয়েছেন, তাঁদের কাজ এখন কোণঠাসা ওপেনারের আত্মবিশ্বাস ফেরানো।
প্রশ্নটা টেকনিক বনাম মানসিকতার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সামান্য ধৈর্য যোগ হলে কি তাঁর খেলা আরও ভারসাম্য পাবে? নাকি ধৈর্য বাড়াতে গিয়ে হারিয়ে ফেলবেন নিজের স্বভাবসিদ্ধ আগ্রাসন? ‘স্লগার’ তকমা হয়তো কঠোর। কিন্তু বিতর্কটা জরুরি। অভিষেকের জার্নি সবে শুরু, এখনও শেষ হয়নি। আপাতত তাঁকে প্রমাণ করতে হবে—তিনি শুধু ‘অভিসিক্স’ নন, পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ব্যাটার।