রান না পেলে আদৌ দলে থাকা যায়? স্রেফ উইকেটের ধার কাটছেন, অথচ রান আসছে না। দলে কি এমন কোনও ব্যাটসম্যান নেই যিনি দুই-ই সমান দক্ষতায় করতে পারেন?

করুণ নায়ার
শেষ আপডেট: 14 July 2025 10:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নয় বছর আগে ট্রিপল সেঞ্চুরি। তারপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিসর থেকেই করুণ নায়ারের আকস্মিক বিদায়। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পর কামব্যাক করলেন, কঠিন রাস্তা পেরলেন। যে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষ টেস্ট খেলেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেই প্রত্যাবর্তন—এর চেয়ে কাব্যিক সমাপতন আর কী হতে পারে?
কিন্তু গল্পটা পুরোপুরি সিনেমার ঘুরে দাঁড়ানো নায়কের মতো থাকছে না। তৃতীয় টেস্টের মাঝপথে এটুকু স্পষ্ট—সফরটা ব্যক্তিগতভাবে করুণের জন্য ঠিক মসৃণ নয়। লর্ডস পর্যন্ত পাঁচ ইনিংসে রানসংখ্যা যথাক্রমে—০, ২০, ৩১, ২৬, ৪০। মানে শুরু করছেন, কিন্তু শেষ হচ্ছে না। মাঝরাস্তায় থেমে যাচ্ছেন। শটের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, ফুটওয়ার্কে ছলকে উঠছে আত্মবিশ্বাস। দেখে মনে হচ্ছে, একটা বড়ো ইনিংস আসা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু শেষমেশ আসছে না।
অথচ খেলতে খারাপ লাগছে না। ব্যাটিং চোখে পড়ছে। শরীরী ভাষা ইতিবাচক। টেকনিক দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু একটা বড় ইনিংস, একটা দাপুটে শতরান… কোথায়?
হেডিংলিতে ওলি পোপ, ক্রিস ওকস, আর লর্ডসে জো রুট—টানা তিন ইনিংসে দুর্দান্ত তিনটে ক্যাচে আউট হয়েছেন করুণ। এ তো কপালের দোষ! কেউ কেউ বলছেন, ফিল্ডার যদি এমন অবিশ্বাস্য ক্যাচ ধরেন, তবে ব্যাটসম্যানের কী করার থাকতে পারে? কিন্তু এটা আর যাই হোক, করুণের সমস্যার সমাধান নয়!
ফলে পরের পর ইনিংসে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি—ভাল খেলছেন, সেট হচ্ছেন, তারপর ব্যর্থতা! রান উঠছে না। অথচ ইংল্যান্ড লায়ন্সের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে তো ২০৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন করুণ। সেটা উধাও হল কেন?
আর এই সূত্রে আরও একটি প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে: ক্রিকেটে নম্বর থ্রি-র জমানা কি ফুরিয়ে এসেছে? আগে যাঁরা তিনে নামতেন, তাঁরা দলের সেরা ব্যাটার। এখন ছবিটা পাল্টেছে। নম্বর তিন এখন সবচেয়ে কঠিন পজিশন। পরিসংখ্যান বলছে, টেস্ট ইতিহাসে এই দশকে ওয়ান ডাউনের ব্যাটিং গড় সবচেয়ে খারাপ—মাত্র ৩৫.২! বিশের দশকের গোড়াতেও বিষয়টা এত হতশ্রী ছিল না। একুশ শতকে যেখানে তিন নম্বর ব্যাটারের গড় ৪৩.৪১, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। এমন অধোগমন আর কোনও পজিশনের নেই! মাথায় রাখতে হবে—বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর পর থেকেই ব্যাটিং গড় সব জায়গাতেই একটু করে কমেছে। কিন্তু তিন নম্বরে ধস সবচেয়ে বেশি, অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক।
তাহলে কারুণ দলে কী করছেন? খালি চোখে তিনি বড় রান করছেন না ঠিকই। কিন্তু এক ঘণ্টা উইকেটে থাকছেন। বল পুরনো করছেন। নতুন বলের ধার কমানোয় হাত খুলে, ইচ্ছেমতো খেলার সুযোগ পাচ্ছেন শুভমান গিল, ঋষভ পন্থরা। গিলের ২৬৯ বা ১৬১—দুটো ইনিংসেই তিনি উইকেটে এসেছেন ২১-২৪ ওভারের মধ্যে। মানে, তখন বল নরম।
আর পন্থ? তিনিও নামছেন ২৫ ওভার পেরিয়ে। মনে রাখতে হবে— যে ডিউক বলে ইংল্যান্ড সিরিজ খেলা হচ্ছে, তা ২০ ওভার পর আকার হারায়, ধার কমে।
এই সিরিজে তিন নম্বরে ব্যাট করে করুণ খেলেছেন—৫০, ৪৬, ৬২ বল। মানে নিয়ম করে অন্তত একটা ঘণ্টা ক্রিজে থেকেছেন। ইংল্যান্ডের বোলারদের প্রাথমিক ঝাঁজ সামাল দিয়েছেন। লর্ডসেই আর্চারের কামব্যাক স্পেল যুঝেছেন সাহসের সঙ্গে। সিম, সুইং তুখোড়। তবু করুণ লড়েছেন বুক চিতিয়ে। ওভারপিচড বল এলেই শট। বাকি সময় ছেড়ে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে জমাট ডিফেন্স আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
লর্ডসে রুটের ক্যাচে যখন আউট হন, তখন ২১ ওভার অতিক্রান্ত। গিল নেমেছেন সঠিক সময়ে। পন্থ আরও পরে। হয়তো এটাই করুণের দায়িত্ব। ক্রিজে যাও। সামলে নাও। বলের ধার, পিচের ভার নির্বিষ করো।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়বে ফুটবলের ‘ফলস থ্রি’ ট্যাকটিক্স। মানে স্ট্রাইকার নিজে গোল করবেন না, গোল করাতে সাহায্য করবেন। করুণ নায়ার এখন সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ। তিনে নামছেন, কিন্তু তাঁর প্রধান কাজ রান নয়। তিনি আসলে মঞ্চ তৈরি করছেন। একদম ফুটবলের স্টাইলে গোল করানোর ছকে রণকৌশল সাজাচ্ছেন।
যদিও প্রশ্ন রয়ে যায়। রান না পেলে আদৌ দলে থাকা যায়? স্রেফ উইকেটের ধার কাটছেন, অথচ রান আসছে না। দলে কি এমন কোনও ব্যাটসম্যান নেই যিনি দুই-ই সমান দক্ষতায় করতে পারেন?
বিকল্প নেই, এটা বলা ভুল। সাই সুদর্শন একবার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁকে ফেরানো হবে? ধ্রুব জুরেলও স্কোয়াডে রয়েছেন। যদি পন্থের আঙুলের চোট বাড়ে, তাহলে তিনিও সুযোগ পেতে পারেন।
যদিও সবটাই নির্ভর করছে টিম ম্যানেজমেন্টের ইচ্ছের উপর। তারা যদি ভাবে, সময় কাটিয়ে গিল-পন্থকে সেট হতে দেওয়াই সবচেয়ে জরুরি—তাহলে করুণ টিকে যাবেন। কিন্তু যদি মনে হয়, একই কাজ করে আরও রানও তোলা সম্ভব, দলে তেমন ক্রিকেটার রয়েছেন, তাহলে আসন টলমল। এই ঝক্কি মেটাতে, নিজেকে টিমে ‘নিয়মিত’ করতে হয়তো করুণকে আরও একটু আগ্রাসী হতে হবে। এ ছাড়া উপায় কী?