হেডিংলেতে ভারতীয় সময় বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ মাঠে নামার সময় অনেক কিছু মনে পড়তে পারে করুণ নায়ারের। স্মৃতি উস্কে ঘা দিতে পারে আট বছরের চাপ চাপ অন্ধকার, হঠাৎ একলা হয়ে যাওয়া, যে ক্রিকেট তাঁর সর্বস্ব ছিল...

করুণ নায়ার
শেষ আপডেট: 20 June 2025 12:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘পোয়েটিক জাস্টিস’ কথাটা তাহলে এখনও তামাদি হয়ে যায়নি!
বহু ব্যবহারে জীর্ণ স্তুতি-বন্দনা, মলিন থেকে মলিনতর হয়ে চলা বিশেষণের ভিড়ে এখনও ‘কাব্যিক ন্যায়বিচার’ মাথা উঁচু করিয়ে দাঁড়িয়ে!
হেডিংলেতে ভারতীয় সময় বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ মাঠে নামার সময় অনেক কিছু মনে পড়তে পারে করুণ নায়ারের। স্মৃতি উস্কে ঘা দিতে পারে আট বছরের চাপ চাপ অন্ধকার, হঠাৎ একলা হয়ে যাওয়া, যে ক্রিকেট তাঁর সর্বস্ব ছিল, যে জাতীয় দলের টুপি মাথায়, ব্যাট হাতে লাল বলকে শাসন করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি, সেই খোয়াবের ক্রমশ দূরে সরতে থাকা… অনেক উপদেশ, অনেক বিদ্রূপ, অনেক কটাক্ষ, তির্যক চাহনি, অপ্রত্যাশিত আঘাত… একে একে উতল হাওয়ার মতো, জলের উচ্ছ্বাসের মতো আছড়ে পড়বে করুণের ক্ষতবিক্ষত মনে।
কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মাথায় ঘা মারবে ২০১৮ সালের ইংল্যান্ড সফর। আগের বছর, ২০১৭-তে একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ত্রিশতরান হাঁকিয়েছিলেন যিনি, সেবার একটি টেস্টেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি। অধীর আগ্রহে দিন বয়ে যায়। প্র্যাকটিসে গা ঘামান। আর দেখেন একটার পর একটা টেস্ট খতম হচ্ছে। মিডল অর্ডারে খেলানোর জন্য প্রাথমিক দলে জায়গা না পাওয়া হনুমা বিহারি দেশ থেকে ইংল্যান্ডের বিমান ধরছেন। আর তিনি নিজে যে তিমিরে, সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছেন।
প্রায় আট বছর বাদে ফের সুযোগ পেলেন করুণ নায়ার। জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন। যার আগে ‘রাজকীয়’ বিশেষণটা জুড়ে দেওয়া যেতেই পারে। বিকল্প হিসেবে বসতে পারে ‘কাব্যিক’। যে ইংল্যান্ডের ড্রেসিং রুম তাঁকে অতল আঁধারে ঠেলেছিল, সেখানেই যখন ফের একবার ঢুকলেন তিনি, যোগ্যতার সমস্ত ধাপ একবার নয়, বার বার উত্তীর্ণ হয়ে, অগ্নিপরীক্ষার সমস্ত স্তর মাথা উঁচু করে পেরিয়ে… কেমন ছিল অনুভূতি?
বিসিসিআই টেস্ট শুরুর আগে যে একান্ত সাক্ষাৎকারটি সমাজমাধ্যমে শেয়ার করেছে, সেখানে করুণের অকপট স্বীকারোক্তি: ‘গত আট বছর ধরে আমি প্রতিদিন ভেবে যাই—দেশের জার্সিতে টেস্ট খেলতে হবে। আর এই বিশ্বাসটাই আমায় এতদূর টেনে এনেছে।’
This is Karun Nair and he is 𝗥𝗲𝗮𝗱𝘆 𝗧𝗼 𝗚𝗼! 👍 👍#TeamIndia | #ENGvIND | @karun126
— BCCI (@BCCI) June 20, 2025
যে অন্ধকার অতীতকে তিনি আর কোনওদিন ফিরে দেখতে চান না, সেই ছেড়ে আসা জীবনে আলো ফেলে করুণের অনুভূতি খুব জীবন্ত। যারা সবকিছু পেয়ে সমস্তটা ফের হারানোর অবসাদের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, হয়তো নিজেদের খুঁজে পাবেন করুণের জবানিতে। ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে যন্ত্রণা, কান্না আর ফিরে আসার, ঘুরে দাঁড়ানোর অটুট জেদ। করুণ বলেছেন, ‘একটা সময় ছিল, যখন আমি স্রেফ টিভি দেখতাম। সবাই খেলছে, আমি ঘরে বসে। তবু টিভি দেখা ছাড়িনি। আর ছাড়িনি প্রত্যাবর্তনের জেদ। তবু বিস্মিত হতাম: আদৌ কি কোনওদিন সুযোগ পাব? তাই যখন এত বছর বাদে ড্রেসিংরুমে ঢুকলাম, সবাইকে প্রথমবার দেখলাম, আমার মাথায় ধাক্কা মেরেছিল একটাই চিন্তা: হ্যাঁ, আমি ফিরে এসেছি!’
বিগত কয়েক বছরে কীভাবে, কতটা পালটে গিয়েছেন তিনি? করুণের বক্তব্য: ‘এখন আমি অনেক বেশি ধৈর্যবান, ক্ষমাশীল। ছোট ছোট বিষয়ে আনন্দে পেতে শিখেছি। আর চেয়েছি নিজের কাছে সৎ থাকতে।’
একদা দেশের এক বিখ্যাত ক্রিকেটার করুণকে অবসরের পরামর্শ দেন। জানান, আইপিএলে মন দিতে। সেখানেই অর্থ, সেখানেই বৈভব। টেস্ট যতই স্বপ্নের গন্তব্য হোক না কেন, করুণ পারবেন না তা ফিরে পেতে!
দু’বছর আগের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ করে কি কিঞ্চিৎ গ্রাম্ভারী, কিছুটা চপল? মোটেও না। অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসার সংঘর্ষ তাঁকে আরও বিনত, আরও স্থিতধী করেছে। তাই ভিডিও শেষের আগে হাসিমুখে অনুরাগী, শুভানুধ্যায়ীদের অভিবাদন জানিয়ে বলে উঠেছেন, ‘আমি করুণ নায়ার… আমি লড়াইয়ের জন্য তৈরি!’