সিসিফাস পারেননি পাথরের প্রকাণ্ড খণ্ডকে পাহাড়ে তুলতে। করুণ ইংল্যান্ড সফরে রান পান-না পান, সিসিফাস হয়ে যাননি। করুণ নায়ার জিতেছেন।

করুণ নায়ার
শেষ আপডেট: 17 June 2025 11:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ যে গ্রিক পুরাণের অভিশপ্ত সিসিফাসের লড়াই!
একটা প্রকাণ্ড বড় পাথরের চাঁইকে টেনে পাহাড়ের উপরে তোলা। তারপর সেটা গড়িয়ে পড়লে ফের একবার ঠেলে ঠেলে চূড়ায় নিয়ে যাওয়া। আবার নেমে আসা… আবার উপরে ওঠা। দিন, মাস, বছর পেরিয়ে এভাবেই অনন্তকালের জন্য অভিশাপের সাজা ভোগ করেন সিসিফাস।
করুণ নায়ারের জীবনও ২০১৬ সালের পর গ্রিক পুরাণের কাহিনি হয়ে দাঁড়ায়। আচমকা দল থেকে বাদ পড়া, সেটাও ত্রিশতরানের পর, সবদিক দিয়ে ছিল ‘অভিশাপ’। তারপর শাপমোচনে অনবরত পরিশ্রম, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উদয়াস্ত খেটে চলা। ধারাবাহিকতা দেখানো, সমস্ত ঘরোয়া ক্রিকেটে নামা, সমস্ত ফর্ম্যাটে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং—যোগ্যতা প্রমাণে এতটুকু খামতি রাখেননি করুণ।
তবু ভাগ্যলক্ষ্মী সুপ্রসন্ন হননি। বছর ঘুরেছে। যোধপুরের ছেলে, কর্নাটকের হয়ে খেলে চলা, শেষমেশ বিদর্ভের জার্সিতে নামা করুণ নায়ারের নাম যেন জনস্মৃতি থেকে মুছে যায়। বৃথাই বয়ে যায় রঞ্জির শতরান, মুস্তাক আলিতে একের পর এক চোখধাঁধানো ব্যাটিং!
হাল ছেড়ে দিতেই পারতেন। যেমনটা তাঁকে ‘উপদেশ’ দেন নামকরা এক ক্রিকেটার—‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়াও। আইপিএল খেলো। ওখানেই টাকা। ওটাই ভবিষ্যৎ।‘
পরামর্শ কানে তোলেননি করুণ। মিশন একটাই—জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামা। নিজের কাজটুকু সৎভাবে করে যাওয়া। উমেদারি নয়, বশ্যতা মানা নয়… পরিশ্রম, পরিশ্রম আর পরিশ্রম… আন্তর্জাতিক মঞ্চে ব্যাগি ব্লু টুপি মাথায় লাল বলের ক্রিকেট খেলতে নামার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন করুণ, তা যে অলীক কুহক ছিল না, ইংল্যান্ড সফরের দল ঘোষণার দিন তা পরিষ্কার। বছর তেত্রিশের করুণ ফিরে এসেছেন দলে। আট বছর বাদে। লড়াই সেই ইংল্যান্ড, শেষ টেস্ট খেলেছিলেন যাদের বিরুদ্ধে, তাদেরই ঘরের মাটিতে।
এখনও ২০ জুন হেডিংলে টেস্টের প্রথম একাদশ ঘোষণা হয়নি। কিন্তু রঞ্জি ক্রিকেটে পারফরম্যান্স এবং ওয়ার্ম আপ ম্যাচে দ্বিশতরানের পর এটা পরিষ্কার যে, প্রথম টেস্টে করুণ অবধারিতভাবে দলে জায়গা পেতে চলেছেন।
তার আগে একলব্যের মতো অনুশীলন এবং অবসরে সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিয়ে চলেছেন করুণ। যে দীর্ঘ আট বছর ধরে নিজেকে পর্দার আড়ালে রেখেছিলেন, তার মধ্যে কোন সময়টা সবচেয়ে অসহনীয় ছিল?
এতটুকু না ভেবেই করুণ নায়ারের জবাব, ‘ঘটনার দিক দিয়ে দেখতে হলে, আমি বলব ২০২২-এর শেষ জীবনের অন্ধকারময় সময়। আমার জন্য খুব কষ্টের পর্ব। সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। ২০১৮-র চেয়েও বেশি।‘
হয়তো তিন-চারটে বাক্য বলতে গিয়েই ফিরে গেলেন সেই দুনিয়ায়… দু’বছর আগেই মলিন, বিবর্ণ পৃথিবীতে। তারপর এক ঝটকায় সম্বিত ফিরতেই বলে উঠলেন, ‘বছর দুই আগে যেখানে ছিলাম, আর কখনও, কোনওদিন আমি সেখানে ফেরত যেতে চাই না। আর চাই না কোনও রকম অনুযোগ-অভিযোগ করতে। ওই পর্ব আমি পেরিয়ে এসেছি। এখন যেখানে, তার জন্য আমি খুবই ভাগ্যবান। জীবন উপভোগ করছি। যে কাজ ভালবাসি, সেটা করে চলেছি। আর তার জন্য গত ২-৩ বছর ধরে যারা পাশে ছিলেন, তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে চাই।‘
এই যন্ত্রণার অধ্যায় কীভাবে বদলে দিল মানুষ করুণকে? জবাবে টিম ইন্ডিয়ার ‘কামব্যাক কিং’য়ের জবাব, ‘এখন আমি জিনিসকে মূল্য দিতে শিখেছি। মুহূর্তকে দাম দিচ্ছি। একটা দিন যে নতুন দিন—এই চিন্তাটাই আনন্দ দেয়।‘
কিন্তু তবু যদি ফিরে দেখেন, দু’বছর আগের নয়, তারও আগের সময়, ঠিক কী ঘটেছিল তখন? কেন আচমকা বাদ পড়লেন দল থেকে? করুণ বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি বুঝিনি কী ঘটে চলেছিল। একটাই জিনিস দেখেছিলাম: আমার নাম তালিকায় নেই।‘
শুধু স্কোয়াড লিস্ট কেন, ট্রিপল সেঞ্চুরির পর তো যে কোনও ব্যাটসম্যানের নাম পরের টেস্টে প্রথম একাদশে থাকার কথা! কিন্তু অদ্ভুত ও অজ্ঞাত কারণে করুণের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। অথচ তখন একের পর এক দুর্দান্ত, জমকালো ইনিংস খেলে আত্মবিশ্বাসে ফুটছেন করুণ! পরের সিরিজ ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে, তারপর শ্রীলঙ্কা সফর।
দু’বছর আগের অন্ধকার অতীত আর মাটি খুঁড়ে বের করতে চান না করুণ। কিন্তু তিনি এখনও মনে করেন, ইংল্যান্ড সিরিজের পর অস্ট্রেলিয়ায় সুযোগ জুটলেই তিনি রান পেতেন। করুণ নায়ার ঝলক্টুকু দেখিয়ে ফুরিয়ে যেতে আসেনি, ব্যাট হাতে পারফর্ম করে বুঝিয়ে দিতেন!
বিগত সময়কে টেনে আনা যায় না। কিন্তু সুযোগ আসে। তাকে দু’হাত পেতে গ্রহণ করতে হয়। ক্রিকেটের ঈশ্বরের কাছে সেই সুযোগ চেয়েছিলেন করুণ। তিনি সেই সুযোগ পেয়েছেন।
সিসিফাস পারেননি পাথরের প্রকাণ্ড খণ্ডকে পাহাড়ে তুলতে। করুণ ইংল্যান্ড সফরে রান পান-না পান, সিসিফাস হয়ে যাননি। করুণ নায়ার জিতেছেন।