গাভাসকরের প্রশ্ন খুব সরল—আজ যখন প্রযুক্তি ও সুরক্ষার এত উন্নতি হয়েছে, তখনও কি শরীর নিশানা করে বল ছুড়ে ব্যাটারকে ভয় দেখানো যাবে?

সুনীল গাভাসকার
শেষ আপডেট: 13 July 2025 16:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফের আলোচনায় বডিলাইন। ফের আলোচ্য ইংল্যান্ড। কিন্তু এবার আর ব্র্যাডমান কিংবা ব্র্যাডমানের দেশ অস্ট্রেলিয়া নয়। টার্গেট টিম ইন্ডিয়ার ঋষভ পন্থ। তিনি আহত, বাঁ-হাতের আঙুলে চোট পেয়েছেন জেনেও, নাগাড়ে শর্ট বল করে গেল ইংরেজ বাহিনী। যাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফুঁসে উঠলেন সুনীল গাভাসকার। টেনে আনলেন বডিলাইনের প্রসঙ্গ। ১৯৩২-৩৩ সিরজে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানকে আউট করতে শরীর লক্ষ করে বল ছোড়ার রণকৌশল বেছে নিয়েছিল ইংল্যান্ড। যাকে ঘিরে একসময় দানা বাঁধে অজস্র প্রশ্ন। নতুন করে ক্রিকেটের নিয়ম পর্যন্ত লেখা হয়।
লর্ডস টেস্টের তৃতীয় দিনে ঘনিয়ে উঠল ৯২ বছরের পুরনো স্মৃতি। বইল বিতর্কের ঝড়। বাঁ-হাতে চোট পেয়েও ব্যাট করতে নামা উইকেটকিপারকে লক্ষ্য করে বাউন্সারের বৃষ্টি নামালেন বেন স্টোকস অ্যান্ড কোং। পন্থকে বেসামাল করতে ছ’জনকে লেগ সাইডে রেখে সাজানো হল ফিল্ডিং। আর সেই দৃশ্য দেখে কমেন্ট্রি বক্সে সোজাসাপটা মন্তব্য করে বসলেন সুনীল গাভাসকর—‘এটা ক্রিকেট নয়। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় যদি শোনেন, তাহলে এই নিয়ম এবার খতিয়ে দেখা হোক!’
শনিবার, ম্যাচের তৃতীয় দিনে প্রথম সেশনেই স্পষ্ট হয়ে যায় ইংল্যান্ডের শর্ট বল পরিকল্পনা। বেন স্টোকস নিজের হাতে বল তুলে নেন। চোট পাওয়া বাঁ-হাতে ফের বল লাগায় ফিজিও ছুটে আসেন। কিন্তু ইংরেজরা তাদের প্ল্যান থেকে একচুল সরেনি। প্রথম সেশনে ইংল্যান্ডের মোট ডেলিভারির ৬০ শতাংশই শর্ট অফ লেংথ। বল ধরার জন্য চার ফিল্ডার সরাসরি বাউন্ডারিতে। সঙ্গে ছ’জন লেগ সাইডে। স্পষ্টতই ক্রিকেটের আইন আর খেলার স্পিরিট—দুই-ই প্রশ্নের মুখে।
ধারাভাষ্যে তখন সুনীল গাভাসকর। বর্ষীয়ান এই ক্রিকেটার সাফ বলেন, ‘এটা ক্রিকেট নয়। আজকের দিনে ৫৬ শতাংশ শর্ট বল। এটা তো ভয় দেখানোর মতো বোলিং। যদি ১৯৮০-৯০-র দশকে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ঠেকাতে আইসিসি এক ওভারে দু’টি শর্ট বলের নিয়ম তৈরি করতে পারে, তাহলে আজ এই ধরনের ফিল্ডিং কৌশল নিয়ে কেন চুপ করে থাকবে?’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘লেগ সাইডে ছয়জন ফিল্ডার কখনওই গ্রহণযোগ্য নয়। সৌরভ গাঙ্গুলী যদি সম্প্রচার শুনে থাকেন, তাহলে অনুরোধ করব, এই বিষয়ে আলোচনা করে নিয়ম স্পষ্ট করা হোক।’
গাভাসকরের এই মন্তব্যে ফের সামনে আসে ১৯৩২-৩৩ সালের ঐতিহাসিক ‘বডিলাইন’ বিতর্ক। ব্র্যাডম্যানকে রুখতে সেই সময় শর্ট বল আর লেগ সাইডে ফাঁদ পেতেছিল ইংল্যান্ড। সমালোচনার ঝড় ওঠে। বাধ্য হয়ে এমসিসি বিবৃতি দিয়ে জানায়— ব্যাটারের শরীর লক্ষ করে বল করা ক্রিকেটের স্পিরিটের পরিপন্থী। নিয়মে বদল আসে। বলা হয়, স্কোয়ার লেগের পিছনে দু’জনের বেশি ফিল্ডার রাখা যাবে না। কার্যত নিষিদ্ধ হয় বডিলাইন কৌশল। কিন্তু লর্ডসে আবার যেন ফিরে এল সেই পুরনো অধ্যায়।
এদিন অবশ্য ভারতের প্রথম ইনিংস ছিল নজরকাড়া। কেএল রাহুলের সেঞ্চুরি। তিন টেস্টে তিনটি হাফ সেঞ্চুরি করা রবীন্দ্র জাডেজার আবারও অর্ধশতক। আর চোট নিয়ে নেমে ঋষভ পন্থ খেললেন ৭৪ রানের লড়াকু ইনিংস। তাঁর ও রাহুলের ১৪১ রানের পার্টনারশিপের উপর ভর করে ভারত ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে তোলা ৩৮৭ রানের সমান স্কোর দাঁড় করায়। তবে লাঞ্চের আগে-পরে পন্থ ও রাহুল ফিরে গেলে ব্যাটিং ধস নামে। শেষ চার উইকেট পড়ে যায় মাত্র ১৮ রানে।
দিনশেষে ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে। খেলা হয় মাত্র এক ওভার। রান ওঠে ২। উইকেট না পড়লেও ম্যাচের থেকে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সেই বিতর্ক—শর্ট বলের নামে কি আবার ফিরে আসছে পুরনো দিনের ভয়ংকর বোলিং কৌশল?
গাভাসকরের প্রশ্ন খুব সরল—আজ যখন প্রযুক্তি ও সুরক্ষার এত উন্নতি হয়েছে, তখনও কি শরীর নিশানা করে বল ছুড়ে ব্যাটারকে ভয় দেখানো যাবে? আইসিসির বর্তমান ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের দিকে তাকিয়ে ক্রিকেট দুনিয়া। নিয়ম কি বদলাবে? নতুন করে কি সংজ্ঞা তৈরি হবে শর্ট বল আর ফিল্ডিং সীমাবদ্ধতার?
সওয়াল কিন্তু থেমে থাকবে না। গাভাসকর বল ঠেলেছেন সৌরভের কোর্টে। এখন জবাবের অপেক্ষা।