টেস্ট ক্রিকেট খেলার ধৈর্য আর কৌশল তৈরি করতে কোচিং দরকার—সেটা আজ ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে অনুপস্থিত। একাডেমিগুলো নিস্তেজ, লেভেল-২ কোচের সংখ্যা নগণ্য। প্রশিক্ষণের আধুনিক কাঠামো নেই। ফলে প্রতিভা আসে, কিন্তু তৈরি হয় না।

স্বর্ণযুগের ওয়েস্ট ইন্ডিজ
শেষ আপডেট: 6 October 2025 14:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাবিনা পার্কের ওই দিনটা যেন প্রতীক হয়ে রইল… অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অলআউট মাত্র ২৭ রানে। কী বলা যায় একে? ইতিহাসের মর্মান্তিক পালাবদল? নাকি ওঠানামার এই জীবনের নির্মম সত্য?
এক সময়ের ভয়ঙ্কর দল এখন হাসির খোরাক। অ্যান্ডি রবার্টস, বর্ণময় সাম্রাজ্যের নীরব স্থপতি, ধরা গলায় বলেছিলেন, ‘আমরা অনেক নিচে নেমেছি, কিন্তু ভাবিনি আরও নিচে নামতে পারি। এখন বুঝছি—খাদের তলাটা কেমন!’
এই পতনের আড়ালে আসল কারণ কী? শুধু খেলোয়াড়ের অভাব? নাকি গল্পটা আরও গভীর, আরও জটিল? একদিকে অর্থনীতি, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা, তার সঙ্গে বদলে যাওয়া সমাজ। আর এই মিশেলের বারুদই ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটকে আজ ছাই করে দিয়েছে।
এ কথা মানতে অসুবিধে নেই, বাইশ গজের লড়াই এখন মুনাফা আর ব্যবসার নামান্তর। ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া—এই তিন শক্তি যত রাজস্ব আয় করে, তা ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোর স্বপ্নেরও বাইরে। ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের সিইও ক্রিস ডেহরিং খোলাখুলি সেটা মেনেও নিয়েছেন। এমন অসম কাঠামোয় টেস্ট ক্রিকেট চালানো মানে ‘অর্থনৈতিক আত্মহত্যা’। টেলিভিশন রাইটস নেই, স্পনসর আসে না, মাঠে দর্শক কম। ফলে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নামেমাত্র, পরিকাঠামো দুর্বল, জুনিয়র পর্যায়ের উন্নয়ন বন্ধ। একে একে প্রতিটি খিলান ভেঙে পড়ছে।
তবু আশ্চর্য, এখনও ক্যারিবিয়ান মানুষ ক্রিকেটকে ভালোবাসে। ডেহরিংয়ের কথায়, ‘যেদিন আমরা ২৭ রানে অলআউট হলাম, বিমানবন্দরে সবাই থামিয়ে জিজ্ঞেস করছিল—‘স্যার, এই দলটার কী হবে?’ সেটাই প্রমাণ যে মানুষ এখনও ভাবে, এখনও কেয়ার করে!’
ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো অখণ্ড ভূখণ্ড নয়। আসলে পনেরোটি দেশ ও দ্বীপের সমষ্টি। একটা পতাকার নিচে যে ঐক্যবন্ধন তৈরি হয়েছিল, তা আসে স্বাধীনতার আবেগ থেকে। তখন ক্রিকেট ছিল গর্বের ভাষা—একসঙ্গে ‘সাদা পৃথিবী’-র বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক।
কিন্তু সেই যুগ বিগত। দেশগুলো এখন স্বাধীন। সবার নিজেদের সরকার, নিজস্ব স্বার্থ। প্রশ্ন উঠছে—‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামের এই যৌথ সত্তা আদৌ প্রয়োজনীয়?’ প্রাক্তন অধিনায়ক জিমি অ্যাডামসের সোজা কথা, ‘এটা ভেবে দেখা দরকার। আমরা কি পুরোনো ভাবনায় আটকে নেই?’ আসলে যখন একাধিক ছোট দেশ মিলে একদল তৈরি করে, তখন প্রশাসন, তহবিল, বাছাই—সব জায়গায় মতভেদ দানা বাঁধে। এবং সেই ফাটলই ধীরে ধীরে চওড়া হয় বাইশ গজে।
যে ঘর ভেতর থেকে পচে, তাকে আর ঝড়ের দোষ দেওয়া যায় না। ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে চলছে একাধিক ভুল সিদ্ধান্তে। প্রাক্তন ক্রিকেটার রোল্যান্ড বুচারের কথায়, ‘২০২২ সালে আমরা ৫১ শতাংশ ম্যাচ জিতেছিলাম। তারপর সব ওলটপালট হয়ে গেল!’ বোর্ড তখন ‘এক ব্যক্তির সর্বময় ক্ষমতা’ নীতি নেয়—একজনই হবেন তিন ফরম্যাটের কোচ, তিন ফরম্যাটের সিলেক্টর। সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় ড্যারেন স্যামিকে। বুচারের মতে, ‘এভাবে কোনও কোচ খেলোয়াড়ের বন্ধু হতে পারে না। কেউই নিজের দুর্বলতা বলবে না, কারণ নির্বাচন তার হাতে!’ এই ব্যবস্থাই সম্পর্ক নষ্ট করেছে। খেলোয়াড়রা ক্রমশ দূরে সরে গেছে বোর্ড থেকে। আর আস্থা হারালে ফলাফলও হারায়। মাঠের পারফরম্যান্সই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
২০০০ সালের পর থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ডে অন্তহীন রাজনীতি। ছোট রাজ্যগুলো বড় রাজ্যের বিরুদ্ধে, নির্বাচকরা প্রদেশভিত্তিক, নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা। একসময়ে ক্রিকেট ছিল জাতির ঐক্যের প্রতীক, আজ সেটা হয়ে গেছে দ্বীপপুঞ্জের দড়ি টানাটানি।
বার্বাডোসের তরুণ জ্যাকব বেটহেল আজ ইংল্যান্ডে ক্রিকেট খেলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজে থাকলে হয়তো এখনও অনূর্ধ্ব-১৯ স্তরেই ঘুরপাক খেতেন। বুচারের সঙ্গত প্রশ্ন, ‘আমাদের দেশে একটা ছেলেকে সিনিয়র দলে জায়গা পেতে ২৭–২৮ বছর লাগে। এত দেরি হলে কে থাকবে?’
সমস্যা স্রেফ একটা নয়। আসলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট-পরিকাঠামোই ভেঙে পড়েছে। স্কুল ও ক্লাব ক্রিকেটে প্রতিযোগিতা কমেছে। নতুন প্রজন্ম ফুটবল ও আমেরিকান লিগে আকৃষ্ট হচ্ছে। অথচ এই ক্যারিবিয়ান অঞ্চলেই একসময় ঘরোয়া ক্লাবগুলো থেকে উঠে আসতেন ভিভ, লারা, মার্শালরা।
আসলে আজকের তরুণরা ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলার চেয়ে আইপিএল, বিগ ব্যাশ বা সিপিএলে নাম তুলতে বেশি আগ্রহী। যুক্তিটাও বাস্তব—ওখানে অর্থ আছে, জনপ্রিয়তা আছে। ব্যর্থ হলে পরদিনই অন্য লিগে খেলার সুযোগ আছে। যে কারণে অ্যান্ডি রবার্টস আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমাদের সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ জার্সি ছিল গর্ব। এখন সেটা নেই। এখন শুধুই টাকার খেলা!’ ভুল বলেননি রবার্টস। আজকাল অনেকেই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নাম কামিয়ে শেষে জাতীয় দলে ফিরে আসেন—যেন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরছে বেতন বাড়ানোর আশায়! এই মানসিক দূরত্বই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মাটিতে নামিয়েছে। ক্রিকেটাররা এখন আর দেশের প্রতীক নন, পেশাদার কর্মচারী।
তাই বলে ডিএনএ তো পুরোপুরি গায়েব হতে পারে না! ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা আজও দ্রুত বল করতে পারেন। তরুণ পেসাররা ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাময়—জেডেন সিলস, আলজারি জোসেফ, কেমার রোচের অভিজ্ঞতাও কম নয়। কিন্তু সমস্যা ব্যাটিংয়ে। টেকনিক্যাল ধৈর্য আর মানসিক স্থিতি কার্যত উধাও। জনি গ্রেভ, প্রাক্তন সিইও, বলেন, ‘আমাদের পেসাররা অস্ট্রেলিয়াকে আউট করতে পেরেছে, কিন্তু নিজেরা রান তুলতে পারিনি। ওটাই পার্থক্য!’
টেস্ট ক্রিকেট খেলার ধৈর্য আর কৌশল তৈরি করতে কোচিং দরকার—সেটা আজ ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে অনুপস্থিত। একাডেমিগুলো নিস্তেজ, লেভেল-২ কোচের সংখ্যা নগণ্য। প্রশিক্ষণের আধুনিক কাঠামো নেই। ফলে প্রতিভা আসে, কিন্তু তৈরি হয় না।
‘গর্ব’—এই একটা শব্দ একসময় ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের মেরুদণ্ড। অ্যান্ডি রবার্টসের কথায়, ‘আমরা দেশের জন্য খেলতাম। এখনকার ছেলেরা টাকার জন্য খেলে! গর্ব হারিয়ে গেলে ক্রিকেট কেবল আরেকটা ‘চাকরি’ হয়ে যায়!’