দু’দিনে শেষ হওয়া মানেই টেস্ট ক্রিকেটের অপমৃত্যু নয়। বরং এটাই প্রমাণ করে, এই ফরম্যাট কতটা বহুমাত্রিক।

এমসিজি, ২০২৫
শেষ আপডেট: 28 December 2025 13:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: টেস্ট ক্রিকেট মানেই পাঁচ দিন—এই ধারণাটা বহুদিন ধরে অটল, অনড় পাথরের মতো আমাদের ধারণায় বসে। কিন্তু বাস্তব এতটা সরল নয়। লাল বলের লড়াই আসলে সময়ের নয়, সমস্যার খেলা। কন্ডিশন, পিচ, বল, আলো, হাওয়া—এই সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যুদ্ধ! যে কারণে দু’দিনে শেষ হওয়া মানে টেস্ট নয়—এই অভিযোগ যতটা আবেগপ্রসূত, ততটাই অসম্পূর্ণ।
পিচই ক্যানভাস, খেলোয়াড় শিল্পী
মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (Melbourne Cricket Ground) এবারের বক্সিং ডে টেস্ট এই বক্তব্যের চরম উদাহরণ। প্রায় ১০ মিলিমিটার ঘাস রেখে তৈরি পিচে ছয় সেশনের মধ্যেই ৩৬ উইকেট। ব্যাট-বলের ভারসাম্য যে বোলারদের দিকে হেলে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল—স্রেফ এই কারণেই কি ম্যাচের ঐতিহাসিক গুরুত্ব খাটো হয়ে যায়?
টেস্ট ক্রিকেটে এমনধারা উইকেট নতুন নয়। কখনও ব্যাটিং স্বর্গ, কখনও সিমারদের স্বপ্ন, কখনও আবার ধুলোয় ঘুরে যাওয়া টার্নিং ট্র্যাক। বৈচিত্র্যই টেস্টের প্রাণ। এখানে পিচই ক্যানভাস, খেলোয়াড়রা শিল্পী। কোনও ক্যানভাসে জলরঙ মানায়, কোনওটায় তেলরঙ। সমস্ত পর্দা একরকম হলেই কি শিল্প সমৃদ্ধ হয়?
এই ম্যাচে সেরা দুই ব্যক্তিগত ইনিংস এসেছে ট্র্যাভিস হেড (Travis Head) এবং হ্যারি ব্রুকের (Harry Brook) ব্যাট থেকে। অর্থাৎ, চ্যালেঞ্জ থাকলেও ঠিকঠাক ব্যাটিং অসম্ভব ছিল না। আসলে ফারাক গড়ে দিয়েছে ভুলের সংখ্যা। অস্ট্রেলিয়া বেশি ভুল করেছে, ইংল্যান্ড কম। ফল তাই ইংরেজদের দিকে হেলেছে।
বিনোদন মানে শুধু দীর্ঘসূত্রতা নয়
টেস্ট ক্রিকেটে বিনোদনের সংজ্ঞা একরকম নয়। কেউ ভালোবাসে ধৈর্যের লড়াই, কেউ পছন্দ করে দ্রুত ওঠানামা। বক্সিং ডে টেস্টে টানটান উত্তেজনা ছিল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। ইংল্যান্ড সমর্থকদের কথা ভাবুন—অস্ট্রেলিয়ায় টানা ১৮টি টেস্টে জয়হীন থাকার পর এই সাফল্য! তাঁদের কাছে এটা ভরপুর বিনোদন নয়? গ্যালারিতে হাজার হাজার ইংরেজ সমর্থক গান গেয়েছেন, পতাকা নেড়েছেন। বেন স্টোকস (Ben Stokes) আর জো রুটের (Joe Root) উচ্ছ্বাসে যে আবেগ দেখা গেছে, তা কোনও ‘খাটো টেস্টে’র নয়। লড়াইয়ে ছিল বিনোদন, ছিল ক্যাথারসিস, ছিল দীর্ঘ যন্ত্রণার পর মুক্তির উল্লাস।
আট বছর আগে এই মাঠেই ইংল্যান্ড অ্যাশেজ হোয়াইটওয়াশ এড়িয়েছিল। তখন পিচ মৃত—সাকুল্যে ২৪ উইকেট পড়েছিল পাঁচ দিনে। অ্যালাস্টার কুকের (Alastair Cook) অপরাজিত ২৪৪ হয়ে ওঠে ধৈর্যের প্রতীক, যদিও ম্যাচ নিস্তেজ। সেটাও টেস্ট, এটাও টেস্ট। দুটোই চরম প্রান্ত, দুটোই ইতিহাসের অংশীদার।
টেস্ট ক্রিকেট অ্যাডাপ্টেশনের খেলা
টেস্ট মানেই কন্ডিশন পড়া, নিজেকে বদলানো, নতুন সমাধান খোঁজা। এই ম্যাচে ইংল্যান্ড সেটা দক্ষতায় করেছে। ব্রাইডন কার্স (Brydon Carse) নতুন ভূমিকায় বল হাতে প্রভাব ফেলেছেন। জশ টাং (Josh Tongue) হয়ে উঠেছেন সিরিজের চমক। ব্যাট হাতে জ্যাকব বেথেল (Jacob Bethell) প্রমাণ করেছেন কেন তাঁকে দলে রাখাটা জরুরি। এমসিজির সাফল্য হয়তো সিরিজের মোড় ঘোরায়নি। হয়তো কোচের ভবিষ্যৎও নিশ্চিত করেনি। কিন্তু একটা ভিত্তি দিয়েছে। অ্যাশেজের ‘ডেড রাবারে’ ইংল্যান্ডের স্মরণীয় পারফরম্যান্সের তালিকায় ১৯৯৮, ২০০৩-এর পাশে জায়গা করে নেবে মেলবোর্ন ২০২৫।
আসলে দু’দিনে শেষ হওয়া মানেই টেস্ট ক্রিকেটের অপমৃত্যু নয়। বরং এটাই প্রমাণ করে, এই ফরম্যাট কতটা বহুমাত্রিক। কখনও ধৈর্যের মহাকাব্য, কখনও তীব্র, টানটান নাটক। টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই—কোনওকিছুই একরৈখিক নয়। আর যারা এই দু’দিন মাঠে বা টিভির সামনে ছিলেন, তাঁরা জানেন—এই ম্যাচ থ্রিলারের চাইতে এতচুল কম বিনোদন জোগায়নি।