একসময় বক্সিং ডে মানে ছিল দান-খয়রাতের বাক্স। আজ সেই জায়গা নিয়েছে স্টেডিয়ামের গেট আর টিভি স্ক্রিন।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 26 December 2025 13:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘বক্সিং ডে’। নামটা শুনে অনেকেরই প্রথমে মনে হয় মুষ্টিযুদ্ধ বা ‘বক্সিং’ খেলার সঙ্গে এর যোগ আছে। আদতে তা নয়। শব্দবন্ধের উৎস ‘বক্স’ থেকে এলেও, তা খেলাধুলোর নয়—উপহার আর দানের বাক্স! ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডে বড়লোক পরিবারে কাজ করা পরিচারকদের বড়দিনে ছুটি জুটত না। ২৬ ডিসেম্বর তাঁদের দেওয়া হত ‘ক্রিসমাস বক্স’—টাকা, বোনাস কিংবা খাবারভর্তি উপহারে ভরা।
পাশাপাশি গির্জাগুলিতে বড়দিনের সময়ে দরিদ্রদের জন্য যে দানবাক্স রাখা হত, সেটিও খোলা হত ২৬ ডিসেম্বরেই—সেন্ট স্টিফেনের স্মৃতিতে। এমনকি ডাকপিয়ন, দুধওয়ালা, কসাইয়ের মতো হরেক পেশাজীবীরাও বছরের শেষে এই দিনে পেতেন ‘ক্রিসমাস বক্স’। সেই থেকে ধীরে ধীরে এই রীতির নামই হয়ে যায় ‘বক্সিং ডে’। যা ১৮৭১ সালে ব্রিটেনে সরকারি ছুটির স্বীকৃতি পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্র বদলেছে। আজ ২৬ ডিসেম্বর মানে কেনাকাটার হিড়িকের পাশাপাশি ভরা স্টেডিয়াম… দুনিয়াজোড়া ক্রীড়া-উৎসব! হয়ে উঠেছে ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ক্রীড়াদিবস। কীভাবে? কেন? আসুক, জেনে নেওয়া যাক।
বক্সিং ডে টেস্ট: মেলবোর্নে বছরের সবচেয়ে বড় ক্রিকেটমঞ্চ
বক্সিং ডে-র বলতেই সবার আগে মনে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন। এমসিজি-তে নামে মানুষের ঢল। নব্বই হাজার দর্শক—২৬ ডিসেম্বর নেহাত ব্যতিক্রম নয়, এটাই নিয়ম।
এদিনের ম্যাচ শুধু ক্রিকেট নয়, অস্ট্রেলিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। ১৯৮০ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ২৬ ডিসেম্বর এই টেস্ট হচ্ছে। অ্যাশেজ থাকলে উত্তেজনা দ্বিগুণ। সকালের প্রথম বল থেকেই বোঝা যায়—সাধারণ টেস্ট নয়। এখানে নামা মানে সম্মান, স্মৃতি আর ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া।
আরও একটা দিক: এই ম্যাচে ইদানীং ‘মুলাঘ মেডেল’ দেওয়া হয়—১৮৬৮ সালের আদিবাসী অস্ট্রেলীয় দলের স্মরণে। অর্থাৎ খেলাটা শুধু বর্তমান নয়, অতীত আর ভবিষ্যৎকে জুড়ে দেয়।
ফুটবলের উৎসব: কনকনে ঠান্ডা, স্কার্ফ আর গোলের উৎসব
ইংল্যান্ডে ‘বক্সিং ডে’ মানেই ফুটবল। এই প্রথা উনিশ শতকের। তখন কাছাকাছি শহরের দলগুলোর ম্যাচ রাখা হত, যাতে যাতায়াত সহজ হয়। আজ সময় বদলেছে, কিন্তু অভ্যাস বদলায়নি। ১৯৬৩ সালের ‘বক্সিং ডে’ কিংবদন্তি—১০টা ম্যাচে ৬৬টা গোল! আজকাল সূচি একটু হালকা, খেলোয়াড়দের বিশ্রামের কথা ভাবা হয়। তবু ছবিটা একই—নতুন কেনা স্কার্ফ, ঠান্ডা হাওয়া, মাঠমুখো সমর্থক। বক্সিং ডে-র ফুটবল মানে শুধু লিগ পয়েন্ট নয়। পারিবারিক অভ্যাস, প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি।
ঘোড়দৌড় আর নোনা হাওয়া: মাঠ ছাড়িয়ে রোমাঞ্চ
সব খেলা মাঠে নয়। ইংল্যান্ডে বক্সিং ডে মানেই ষষ্ঠ জর্জের স্মরণে ঘোড়দৌড় (King George VI Chase)। ১৯৩৭ থেকে চলছে এই রেস। তিন মাইলের কঠিন ট্র্যাক, শীতের ভেজা মাটি—এখানে জেতা মানে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ।
পৃথিবীর আর এক প্রান্তে, ঠিক একই দিনে শুরু হয় প্রমোদতরীর প্রতিযোগিতা (Sydney to Hobart Yacht Race)। ১৯৪৫ সাল থেকে চলা এই ৬২৮ নটিক্যাল মাইলের যাত্রা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন নৌ-দৌড়গুলোর একটি। সিডনি হারবার থেকে যাত্রা শুরু, সামনে ভয়ংকর ব্যাস স্ট্রেইট। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের লড়াই—লাইভ টিভিতে চোখ ফেরানো মুশকিল।
কেন ২৬ ডিসেম্বরেই এত খেলা?
আড়ালে সাধারণ যুক্তি: এই দিনটায় বেশিরভাগ মানুষ কাজ থেকে ছুটি পান। পরিবার একসঙ্গে থাকে। সবাই কিছু দেখতে চায়। খেলাধুলো সেই শূন্যস্থানটা ভরাট করে। পাশাপাশি মানসিক দিকটাও গুরুত্বপূর্ণ। একদিন বসে থাকা, খাওয়াদাওয়ার পর মানুষ চায় গতি, শব্দ, নাটক! বক্সিং ডে-র খেলা ঠিক সেটাই দেয়। তাই মেলবোর্নের সকালের ক্রিকেট, লন্ডনের বিকেলের ফুটবল, সিডনির সমুদ্রযাত্রা—সব মিলিয়ে দিনটা পায় একটা নির্দিষ্ট ছন্দ।
আজকের দিনে ডিজিটাল সম্প্রচারে এই অভ্যাস আরও ছড়িয়েছে। নিউ ইয়র্কে বসে মেলবোর্নের টেস্ট, টোকিওতে বসে ইংল্যান্ডের দৌড়—বক্সিং ডে এখন আর লোকাল নয়, পুরোপুরি গ্লোবাল!
শেষ কথা
একসময় বক্সিং ডে মানে ছিল দান-খয়রাতের বাক্স। আজ সেই জায়গা নিয়েছে স্টেডিয়ামের গেট আর টিভি স্ক্রিন। ২৬ ডিসেম্বর এখন বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ক্রীড়াদিবস—যেদিন খেলা শুধু বিনোদন নয়, একটা সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতির টানেই, বছর ঘুরে আবার অপেক্ষা—পরের বক্সিং ডে-র জন্য।