জন্মসূত্রে পাকিস্তানি হায়দার আলি এখন আরব ক্রিকেট টিমের পোস্টার বয়! দল বাংলাদেশকে পরাস্ত করে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। জিতেছে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজ!

হায়দার আলি
শেষ আপডেট: 29 May 2025 18:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জীবন হায়দার আলিকে সবকিছু দেখিয়েছে।
পরিবারের অমতে দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলতে পারেননি, টাকার অভাবে হোটেল বয়ের কাজ করেছেন, রাতে রোজগার, দিনে প্র্যাকটিস। এরপর মারাত্মক দুর্ঘটনা। কোনওমতে প্রাণে বাঁচেন। কিন্তু দেশ ছাড়তে হয়। বিদেশে গিয়েও বেচেছেন ফল। তবে হাতে টাকা এসেছে—বাবার কাছে হাত পাততে পারেননি!
এতকিছুর অন্তিম ফলশ্রুতি: বিশ্বক্রিকেটে সম্প্রতি ঝড় তোলা আরব আমিরশাহীর তারকা ক্রিকেটারের তকমা লাভ। যিনি একা হাতে ‘বামন’ দলকে উচ্চাশার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
জন্মসূত্রে পাকিস্তানি হায়দার আলি এখন আরব ক্রিকেট টিমের পোস্টার বয়! দল বাংলাদেশকে পরাস্ত করে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। জিতেছে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজ!
ক্রিকেটের সিঁড়ি ভেঙে ধাপে ধাপে উঠে এলেন কীভাবে?
প্রশ্নের জবাবে হায়দারের স্পষ্ট জবাব, ‘আমার জন্ম পাকিস্তানের ছোট্ট গ্রাম কামালিয়া আজমত শাহ-য়। গ্রামে কোনও খেলার মাঠ, নেট, প্র্যাকটিসের বন্দোবস্ত কিচ্ছু ছিল না। তার উপর কাকা ছিলেন কড়া ধাঁচের মানুষ৷ তিনি সাফ জানান, খেলা চলবে না। শুধু ক্রিকেট নয়। যে কোনও খেলাই বন্ধ৷ অন্তত, ম্যাট্রিক পর্যন্ত তো নয়ই!’
এরপর কী হল? হায়দারের উত্তর, ‘গ্র্যাজুয়েশনের পর আমি লাহোর চলে যাই৷ ভর্তি হই লুধিয়ানা জিমখানা ক্লাবে৷ আখতার মুমতাজের ছত্রচ্ছায়ায়৷ দিন কাটত প্র্যাকটিসে। রাত জীবনসংগ্রামে।’
কীভাবে টিঁকে থাকার লড়াই চালান? হায়দার জানান, তিনি রাতে ওয়েটারের কাজ বেছে নেন। দিন তুলে রাখতেন জিমে ঘামঝরানো ট্রেনিং আর প্র্যাকটিসের জন্য। আর রাতে হোটেলে খাবার বাড়ার কাজ৷ মজার কথা, কষ্টেরও, যে এতকিছু করে চলেছেন হায়দার। অথচ পরিবারের কেউ কিছুই জানতেন না! কাউকে সামান্যতম সংকেত পর্যন্ত দেননি!
ভালই চলছিল সবকিছু। যন্ত্রণা ছিল। দু:খ ছিল৷ কিন্তু স্বপ্নের পথে, নিজেকে ক্রিকেটার হিসেবে তৈরির রাস্তায় ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছিলেন হায়দার!
ঠিক তখনই ছন্দপতন। হানা দেয় কোভিড৷ হোটেল, রেস্তোরাঁ বন্ধ৷ কাজ হারান হায়দার। কিন্তু বেঁচে থাকতে পেট চালাতে হবে যে! তাই বাধ্য হয়ে ফল বেচার কাজ বেছে নেন।
কিন্তু এতকিছুর পর, এহেন ভাগ্য বিপর্যয় সত্ত্বেও ক্রিকেট ছাড়েননি হায়দার আলি৷ লড়ে চলেন, খেটে যান উদয়াস্ত৷
শুনতে অবাক লাগতে পারে। কিন্তু একদিন, দু'দিন নয়৷ টানা চার বছর ফলবিক্রেতার কাজ করেন হায়দার আলি।
কিন্তু এতকিছু পেরিয়েও চরম দু:স্বপ্নের ধেয়ে আসা বোধ হয় বাকি ছিল৷ একদিন গাড়ির মাথায় চড়ে ফলের ঝাঁকি নিয়ে চলেছেন হায়দার। এমন সময় হেলে পড়ে গাড়ি৷ আর টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যান হায়দার৷
শুধু গাড়ি থেকে নয়৷ তখন চলছিলেন ব্রিজের উপর দিয়ে। তিরিশ ফুট উঁচু ব্রিজ। গাড়ির ছাদ থেকে সোজা ব্রিজের নীচে পড়ে ভয়ংকর আহত হন হায়দার৷ কাঁধ, পা, নাকের হাড়—সবকিছু ভেঙে যায়। ক্রিকেট তো দূর অস্ত, হাসপাতাল থেকে হেঁটে বাড়ি যেতে পারবেন কি না, এই নিয়েও সংশয়!
কিন্তু উঠে দাঁড়ান হায়দার। হেঁটে যান। বাড়ি। সেখান থেকে নেটে৷ বাড়ির লোকজন, আত্মীয়স্বজন সকলে বারণ করে। বিরক্ত হয়৷ ঝামেলা, অশান্তিও লেগে থাকে৷ কিন্তু কোনওকিছুই হায়দারকে টলাতে পারেনি।
জীবনের সেই অন্ধকার পর্ব স্মরণ করে হায়দারের উপলব্ধি, ‘আমায় কঠোর পরিশ্রম করতেই হত। আর বিশ্বাস রাখতে হত, ঈশ্বর এই পরিশ্রমের ফল দেবেন! পকেটে এক দিরাম ভরে আমি আরবে উড়ে যাই৷ চোখে জল। কিন্তু বুকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন!’
এই স্বপ্ন বৃথা যায়নি। নতুন দেশে যেন পুনর্জন্ম পেয়েছেন হায়দার। ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে হাত পাকিয়েছেন। নেট প্র্যাকটিসে নিংড়ে দিয়েছেন। প্রতিদান: জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেওয়ার সুযোগ!
নতু৷ জীবন ফিরে পেয়ে কী বলছেন হায়দার? হাসিমুখে একটাই জবাব দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘আমি জানতাম ঈশ্বর আমায় সময় দেবেন। কারণ তিনি নিজেই বলেছেন: তুমি কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যাও৷ ফল আমার হাতে ছেড়ে দাও।’