ছবির নেশা পেয়ে বসার আগে ভারতে এসেছেন দু’বার--১৯৮৯ সালের নেহরু কাপ এবং ১৯৯৬ বিশ্বকাপ খেলতে। তখন থেকেই এদেশে বসে ছবি আঁকার অদম্য টান।

জ্যাক রাসেল
শেষ আপডেট: 17 July 2025 17:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা সময় তিনি উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে স্লেজিং করতেন। চোখে আঁটা সানগ্লাস। ঘন, পুরু গোঁফ। মাথার টুপিটা উদ্ভট। ততোধিক উদ্ভট ব্যাটিং স্ট্যান্স।
মেঘে মেঘে বেলা বেড়েছে। মাথার ঝাঁকড়া চুল উধাও। দু’চোখের ব্রিটিশ আগ্রাসন স্তিমিত। এখন তিনি উইকেটরক্ষক নন, দাঁড়ান ক্যানভাসের সামনে। হাতে তুলে। এঁকে চলেন ছবি। একের পর এক। লন্ডনের অভিজাত রাইডার স্ট্রিটে যে কোনও দিন গেলেই চোখে পড়বে আত্মনিমগ্ন এক শিল্পী। রং-তুলিতে মজে থাকলেও পূর্বাশ্রমের দায়বদ্ধতা যিনি ভোলেননি।
জ্যাক রাসেল (Jack Russell), প্রাক্তন ইংল্যান্ড খেলোয়াড়, আজ ‘ফুল টাইম পেইন্টার’ হয়েও ছবির বক্তব্যবিষয়ে তুলে ধরেন পুরনো দিনের ক্রিকেটার, ছেড়ে আসা সময়ের রূপ-রস-বর্ণ। একদা শচীন-আজহার-কুম্বলের বিরুদ্ধে খেলা এক বিস্ময়প্রতিভা এখন পেশাদার চিত্রশিল্পী (Painter)। যিনি নিজেই স্বীকার করছেন, ‘ক্রিকেট খেলে যত টাকা পেয়েছি, ছবি এঁকে তার চেয়েও বেশি রোজগার করি!’
যদিও অর্থই সর্বস্ব নয়। জ্যাকের কথায়, ‘ছবি আমার আসক্তি, ভালোবাসা। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত আঁকি। এটাই আমার পেশা, জীবন!’ প্রায় ৩৫-৩৬ বছর ধরে তিনি তুলি হাতে। খেলোয়াড়জীবন থেকেও, সময়ের বিচারে, যা দীর্ঘমেয়াদী জার্নি।
১৯৮৮ থেকে ১৯৯৮—এক দশক জুড়ে রাসেল ইংল্যান্ডের জার্সিতে (England Cricket Team) খেলেছেন ৫৪টি টেস্ট এবং ৪০টি ওয়ান ডে। কিন্তু ক্রিকেটজীবন যতই ঘটনাবহুল হোক না কেন, তাঁর চেতনার রঙে পান্না সবুজ হয়ে উঠেছে সাদা ক্যানভাসে। ক্রিকেটের যে-পর্বে তিনি বেঁচেছেন, সেই সময় বর্ণময় জ্যাকের তুলির আঁচড়ে।
প্রতি বছর নিয়ম করে একজন ঐতিহাসিক ক্রিকেটারের ছবি আঁকেন। গত বছর ফুটিয়েছিলেন অ্যাসেজ-খ্যাত ডগলাস জার্ডিনকে। আর এবছর তুলে ধরেছেন রঞ্জিত সিংয়ের প্রতিকৃতি—প্রথম ভারতীয় যিনি ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট খেলেছেন। সময়জ্ঞান নিখুঁত। টিম ইন্ডিয়া যখন ইংল্যান্ডে, খেলছে পাঁচ টেস্টের সিরিজ, তখন ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম পুরোধা-পুরুষকে ছবির বিষয়বস্তু করাটা এক দিক থেকে অনিবার্য, অবধারিত!
মজার বিষয়, চিত্রশিল্প, একুশ শতকে দাঁড়িয়ে যা প্রচার ও প্রসারের জন্য নিপুণ যোগাযোগ জরুরি, তা মানতে নারাজ জ্যাক। ফোনে সাক্ষাৎকার দিতে নারাজ। হোয়াটসঅ্যাপেও তাঁকে পাওয়া যাবে না। কথাচালাচালির রাস্তা ইমেল। আর সামনাসামনি মোলাকাতের জন্য একটাই গন্তব্য: লন্ডনের ক্রিস বিটলস গ্যালারি।
খেলার সময় হ্যাট না খুলে গ্লাভস পরে মাঠে নামতেন। সানগ্লাস পরে ব্যাট করতেন। চোখের পলকে বল ধরার ক্ষমতা তাঁকে ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা উইকেটকিপারের মর্যাদা এনে দিয়েছে। আজও সেই প্যাশন মুছে যায়নি। ‘ক্রিকেট ভালোবাসি, তবে ছবিকে আরও বেশি!’—এই সরল স্বীকারোক্তিতে মিলে যায় তাঁর জীবনের ছন্দ। আঁকা এক একটি ছবির দাম গিয়ে ঠেকেছে ২৫,০০০ পাউন্ড পর্যন্ত। ২০১৯ অ্যাসেজ সিরিজের কিছু কাজ এখন সংগ্রাহকদের সম্পদ।
ছবির নেশা পেয়ে বসার আগে ভারতে এসেছেন দু’বার--১৯৮৯ সালের নেহরু কাপ এবং ১৯৯৬ বিশ্বকাপ খেলতে। তখন থেকেই এদেশে বসে ছবি আঁকার অদম্য টান। ‘ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়ামের একটা এক্সিবিশন ম্যাচে যে ছবি এঁকেছিলাম, সেটা আজও আমার সেরা কাজের একটা!’ অকপট স্বীকারোক্তি রাসেলের। যখনই উপমহাদেশে এসেছেন, দিল্লি-লাহোর-মুম্বইয়ের অলিগলিতে বসে মানুষের মুখ ক্যানভাসে জীবন্ত করেছেন। ইংল্যান্ড জার্সি পরে রাস্তায় বসে ছবি আঁকার জন্য পুলিশের তাড়া খাওয়ার স্মৃতি এখনও ফিকে হয়ে যায়নি। তাই বিনা ভণিতায় মেলে ধরেছেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। বলেছেন, ‘আমার ইচ্ছে করে, জীবনের বাকি দিনগুলো ভারতে বসে ছবি আঁকি!’
গ্লচেস্টারশায়ারে তাঁর সতীর্থ ছিলেন জাভাগল শ্রীনাথ। তাঁকে এখনো মনে পড়ে রাসেলের, ‘খুবই দ্রুতগতি ছিল শ্রীনাথের!’ একইভাবে আজকের ক্রিকেটের হালহকিকতেরও খবর রাখেন তিনি। কালেভদ্রে লর্ডসের গ্যালারিতে ঢুঁ মারেন। আলাদা নজর থাকে উইকেটরক্ষকদের টেকনিকে। নিজের জমানার প্রিয় কিপার ছিলেন অ্যালান নাট ও বব টেলর। ভারতীয়দের মধ্যে সৈয়দ কিরমানি।
আর এখন? রাসেলের পছন্দ দুজন—জেমি স্মিথ ও ঋষভ পন্থ। বলেন, ‘স্মিথ খুব ভাল ব্যাটসম্যান, শরীরটা ভারী হলেও ক্ষিপ্র। অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মতো হিট করতে পারে। আমার বিশ্বাস, ও ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান-উইকেটকিপার হওয়ার ক্ষমতা রাখে।’ পন্থের বিষয়ে, ‘ওকে না দেখে থাকা যায় না। ব্যাটিং হোক বা কিপিং, পন্থ একেবারে বিনোদনের টোটকা! কিছু দুর্দান্ত কাজ করবে, কিছু ভুলও করবে, কিন্তু ওর থেকে চোখ ফেরানো অসম্ভব।’
ব্যাট ছেড়ে ব্রাশ হাতে ধরেছেন রাসেল। মন থেকে ক্রিকেটের শিকড় উপড়ে দিতে পারলেন কই?