জয়তিলক আগেই উঠেছে… চেজমাস্টারের মুকুটটাও কি এবার পরতে চলেছেন তরুণ ব্যাটার?

তিলক বর্মা
শেষ আপডেট: 29 September 2025 10:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জমানা বদলায়, পালটে যায় কুর্সি। উত্তরাধিকারের খোঁজ চলে। এমন নায়ক, যিনি হাল ধরতে জানেন। পথ হারালে আলোর রেখা ধরে এগিয়ে যাওয়ার চিহ্নগুলো পরপর বুনে যেতে পারেন।
দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় ক্রিকেটে (Team India) এই কাজটা করে এসেছেন একজন। তাঁর নাম বিরাট কোহলি (Virat Kohli)। একাধারে ‘রানমেশিন’, তদুপরি ‘চেজমাস্টার'। একই অঙ্গে এই দুটি গুণ খুব একটা চোখে পড়ে না। টিম ইন্ডিয়ার হয়ে একটা লম্বা সময় আঁধারপথের পথের পথিক হয়ে এসেছেন বিরাট। বিশেষত, হাইভোল্টেজ ম্যাচে, দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে দল যখন রান তাড়া করছে, আচমকা উইকেট হারিয়ে বিপদে, তখন পরিত্রাতা হয়ে উঠেছেন।
এখন তিনি কেরিয়ারের উপান্তে। প্রস্থানের উপযুক্ত সময় আর আসরের খোঁজে। আর সেই পটভূমিতেই দুবাইয়ের ময়দানে লেখা হল পালাবদলের বার্তা। নি:শব্দে। ইঙ্গিতে। ঘটনাবহুল ম্যাচ, নাটকীয় লড়াই, বিতর্কিত সমাপ্তি। সবকিছু ছাপিয়ে বিশুদ্ধ ক্রিকেটের নিরিখে আজ শুধুমাত্র একজনকে নিয়েই কথা হওয়া উচিত৷ তিনি তিলক বর্মা (Tilak Varma)। চলতি টুর্নামেন্টে দুরন্ত খেলেছেন। ধারাবাহিক। আস্থাভাজন৷ বিশ্বস্ত। তবু অভিষেক শর্মার আতসবাজির রোশনাইয়ে কিছুটা ঢাকা পড়ে যান। ফাইনালে তরুণ ওপেনার ফিরে যেতেই দল যখন তিন উইকেট হারিয়ে নড়বড়ে অবস্থায়, তখনই ব্যাটন হাতে তুলে নিয়ে জাত চেনালেন তিলক। লিখলেন ইতিহাস। আগ্রাসী মেজাজেই খেললেন। তবু শরীরী ভাষায় এতটুকু বোঝার উপায় নেই! বিরাটের তুলনা টানার এটাও যথেষ্ট কারণ বটে।
বয়স মাত্র ২৩। তবু আর সবাইকে টেক্কা দিয়ে গতকাল রবিবার দুবাইয়ের আলোভরা আকাশে ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন নায়ক তিলক। এশিয়া কাপ ফাইনালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত যখন মাত্র ২০ রানে হারিয়েছে তিন উইকেট, তখন মাঠে নেমে এলেন হায়দরাবাদের অনামা ছেলেটি। চাপের মুখে ভেঙে না পড়ে উলটে গড়লেন নজির! অপরাজিত ৬৯ রানের ঝোড় ইনিংস। আর তাতেই ভারত পেল নবম এশিয়া কাপ শিরোপা।
তিলকের গল্প নিছক ক্রিকেটীয় নয়। এ এক বাস্তব বাস্তব জীবনের কাহিনি। যে জীবন রূঢ়। কর্কশ। চড়াই আর উতরাইয়ে ভরা। বাবা নাম্বুরি নাগারাজু। পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। দিনরাত খাটুনি, এক টানা ২৪ ঘণ্টার শিফটে কাজ করেও সংসারে অভাব মেটানো কঠিন ছিল। মা গায়ত্রী দেবী সামলাতেন ঘর। টাকা-পয়সা কম, কিন্তু ছেলের স্বপ্ন থামাতে চাননি তাঁরা। হায়দরাবাদের গলিতে টেনিস বল হাতে ঘামঝরানো বিকেলগুলোই একদিন নিয়ে আসে বাইশ গজের ডাক।
সেই ডাক প্রথম শুনতে পেরেছিলেন কোচ সলিম বাইয়াশ। তিলকের প্রতিভায় এতটাই মুগ্ধ হন, যে নিজেই গাড়িতে চড়িয়ে প্র্যাকটিসে নিয়ে যেতেন। পরে সপরিবার একেবারে একাডেমির কাছেই বাড়ি ভাড়া নিয়ে নেন নাম্বুরি। শুরু হয় অনুশীলন। নিবিড় অনুধ্যান। এর সুবাদে গড়ে ওঠে সেই ভিত, যার উপর দাঁড়িয়ে আজ ভারতীয় ক্রিকেট নতুন এক তারার জন্ম দেখছে।
মাত্র ১৬ বছর বয়সেই জায়গা করে নেন হায়দরাবাদের রঞ্জি দলে। ২০১৮-তে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে অভিষেক। ২০২০-তে ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে জায়গা। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০২২ আইপিএল নিলামে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স তাঁকে কিনে নেয় ১ কোটি ৭০ লাখে। প্রথম মরশুমেই ৩৯৭ রান, হয়ে ওঠেন দলের ভরসা। আক্রমণাত্মক অথচ নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিং, চাপে মাথা ঠান্ডা রাখা—তিলকের এই গুণই তাঁকে আলাদা করেছে বাকিদের থেকে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও আসল পরীক্ষা উতরে গিয়েছেন। ২০২৩-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টি-২০ অভিষেকেই রান করেছিলেন ৩৯। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টানা দুটো সেঞ্চুরি—১০৭* আর ১২০*—তাঁকে পরিণত করেছিল বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ঙ্কর ও প্রতিশ্রুতিমান তরুণ ব্যাটসম্যান হিসেবে। ২০২৫ এশিয়া কাপ শুরু হওয়ার সময় তিনি আইসিসির টি-২০ ব্যাটসম্যানদের তালিকায় ছিলেন দুই নম্বরে।
কিন্তু রবিবারের ফাইনালই তিলককে তুলল অন্য এক মঞ্চে। পাকিস্তানের বোলাররা তখন আগুন ঝরাচ্ছেন। ভারতের স্কোরবোর্ডে মাত্র ২০ রান। তিন উইকেট খতম। সেই অবস্থায় সঞ্জু স্যামসন আর শিবম দুবের সঙ্গে জুটি গড়ে এগিয়ে চললেন তিলক। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে স্ট্রাইক ঘোরালেন, সময়মতো চার-ছক্কা হাঁকালেন। শেষ ওভারে হারিস রউফকে উড়িয়ে মারা সেই ছয় শুধু জয়ের সিলমোহর নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন নায়ক তৈরির সদম্ভ ঘোষণাও বটে।
তিলক বর্মা—এক ইলেকট্রিক মিস্ত্রির ছেলে, হায়দরাবাদের গলি থেকে উঠে আসা এক তরুণ—আজ দুবাইয়ের মঞ্চে পাকিস্তান বধ করে এশিয়া কাপ জিতিয়েছেন ভারতকে। তাঁর ব্যাটের জোরেই টিম ইন্ডিয়া পেল নবম শিরোপা। পাশাপাশি লেখা হল পালাবদল, দায়িত্ব হস্তান্তরের অদৃশ্য আলেখ্য!
জয়তিলক আগেই উঠেছে… চেজমাস্টারের মুকুটটাও কি এবার পরতে চলেছেন তরুণ ব্যাটার?