ইতিহাস বলছে, ১৮১৪ সালে সেন্ট জনস উড এলাকায় যখন লর্ডস তৈরি হচ্ছে, তখন মাঠের জমিটির প্রাকৃতিক ঢালু চরিত্র বজায় রাখা হয়। তাকে বদলানো হয়নি। এরপর অনেক বার মাঠ সংস্কার হলেও, এই ঢাল ঢাল-ই থেকেছে। কেটেছেঁটে, মেপেজুপে সমতল হয়নি।

লর্ডসের ময়দান
শেষ আপডেট: 10 July 2025 14:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কিছু বিশেষণে কালের আঁচড় পড়ে না। তাকে অতিরঞ্জও বলা যায় না। লর্ডসকে যে লোকে ‘ক্রিকেটের মক্কা’ বলে, তাতে এতটুকু খাদ নেই। ঐতিহাসিক মাহাত্ম্যকে দূরে রেখেও এটা বলাই যায়: এমন কাঠের কারুকাজ সমৃদ্ধ আইকনিক প্যাভিলিয়ন, সবুজ ঘাসে ছাওয়া আউটফিল্ড, অন্যতম প্রাচীন ক্রিকেট লাইব্রেরি লর্ডসকে আর পাঁচটা ময়দান থেকে আলাদা করে তুলেছে।
আলাদা করেছে ঢাল-ও। ক্রিকেটের ভাষায়, ‘দ্য আইকনিক স্লোপ’। ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, লর্ডসের মূল খেলার চত্বরের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত অর্থাৎ প্যাভিলিয়ন এন্ড থেকে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের নার্সারি এন্ড পর্যন্ত মাঠটি হেলে রয়েছে। এই ঢালের পার্থক্য প্রায় ২.৫ মিটার বা ৮ ফুট ২ ইঞ্চি।
ইতিহাস বলছে, ১৮১৪ সালে সেন্ট জনস উড এলাকায় যখন লর্ডস তৈরি হচ্ছে, তখন মাঠের জমিটির প্রাকৃতিক ঢালু চরিত্র বজায় রাখা হয়। তাকে বদলানো হয়নি। এরপর অনেক বার মাঠ সংস্কার হলেও, এই ঢাল ঢাল-ই থেকেছে। কেটেছেঁটে, মেপেজুপে সমতল হয়নি।
এর কারণ মূলত দুটো। প্রথমত, একে ভেঙে মাঠ সমান করতে গেলে খরচ বিপুল। দ্বিতীয়ত, এত বছর ধরে লর্ডসের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা ঢালের গুরুত্ব এতটাই যে, তাকে যেমনকার তেমনই রাখার পক্ষে মত দেন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ।
ক্রিকেটের দৃষ্টিতেও এই ঢাল খেলোয়াড় বাছাই ও রণকৌশলের উপর বড় প্রভাব ফেলেছে। সিম বোলাররা এর কারণে পান বাড়তি সুইং। স্পিনারদের লাইন-লেন্থ সামান্য ভুলচুক মানেই বল ‘বাই’ হিসেবে বাইরে চলে যেতে পারে।
প্যাভিলিয়ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসে বল করলে ডেলিভারি একটু ঢাল বেয়ে নেমে আসে। মানে, নিচের দিকে। এতে ডানহাতি ব্যাটারের শরীর ঘেঁষে বল ঢুকে পড়তে পারে, আর বাঁহাতির দিকে বাইরে বেরিয়ে যায়। তাই এলবিডব্লিউ হওয়ার সুযোগ বাড়ে। গ্লেন ম্যাকগ্রা এই বিষয়টি খুব ভালভাবে কাজে লাগাতেন।
অন্যদিকে, নার্সারি প্রান্ত থেকে বল করলে বোলারকে একটু উঁচুতে উঠে আসতে হয়। বলও তখন ডানহাতির বাইরে চলে যায়, বাঁহাতির দিকে ঢোকে। জসপ্রীত বুমরাহর মতো যাঁদের রানআপে একটা কোণ থাকে, তাঁরা এই প্রান্ত থেকে বল করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ।
ব্যাটারদেরও এসব মাথায় রেখে খেলার সময় টেকনিকে একটু বদল আনতে হয়। কারণ ঢালের জন্য বলের গতি, লাইন-লেংথ সব কিছুতেই হালকা ফারাক পড়ে যায়। বলের গতি ও লাইন বুঝে বাড়তি সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।
এই প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের প্রাক্তন পেসার অ্যাঙ্গাস ফ্রেজার বলেন, ‘নতুন করে মাঠ বানালে কেউ এই রকম ঢাল রাখতেন না। কিন্তু লর্ডসের জমির চরিত্রই এমন—হ্যাম্পস্টেড হিথ থেকে ঢলে এসে তা থেমেছে এই জায়গায়। সেখান থেকেই এই ঢাল।’
অবশ্য, শুধু লর্ডস নয়। ইংল্যান্ডের আরও কিছু মাঠে ঢালের আশ্চর্য উপস্থিতি। যেমন, হেডিংলে। যেখানে কির্কস্টল লেন এন্ড থেকে ঢালু পথে নামতে হয়। ট্রেন্ট ব্রিজেও রয়েছে হালকা স্লোপের ছোঁয়া। তবে লর্ডসের মতো এমন তির্যক এবং টানা ঢাল আর কোথাও নেই।
এমনিতে ক্রিকেটের ময়দান মানেই তা সমতল। সমান আউটফিল্ডে খেলা এখন আবশ্যিক শর্ত। তার মধ্যেও লর্ডসের ঢাল ব্যতিক্রম। অনেকে বলেন, এই ঢাল লর্ডসকে ‘চ্যালেঞ্জিং’করে তুলেছে। অনেকে আবার নজরে, এটা এক ধরনের সীমাবদ্ধতা।