একদিকে রোহনের নির্ভেজাল সারল্য। অন্যদিকে আফজলের নিখাদ বাস্তববুদ্ধি। এই দুইয়ের টানেই উড়ে যাক বিতর্কের হইচই, হাত না মেলানোর বিষ-বেলুন!

ভারত বনাম পাকিস্তান
শেষ আপডেট: 28 September 2025 19:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাইশ গজে ভারত-পাকিস্তান মানেই উত্তেজনার ঊর্ধ্বগামী পারদ। রাজনৈতিক টানাপড়েন, সীমান্তের খবর, উসকানির ইঙ্গিত—সবই এসে ভিড় জমায় স্টেডিয়ামের গেটের সামনে। থিকথিকে সেই ভিড়!
কিন্তু রবিবার দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের (Dubai International Cricket Stadium) ছবিটা ছিল একেবারে অন্য রকম! এখানে ক্রিকেট মানে উৎসব। খাঁটি আনন্দ। মাঠের বাইরে যেন মেলা বসেছে! নাচে-গানে, স্লোগান-পাল্টা স্লোগানে, ঠাট্টা–মশকরায় মশগুল দু'দেশের তামাম সমর্থক।
সূর্যের তেজ নিভু নিভু হতেই চারপাশ সরগরম। স্থানীয় সময় সন্ধে সড়ে ছ'টায় ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু দুপুর থেকে স্টেডিয়ামের চৌহদ্দি জমজমাট। স্পোর্টস সিটির রাস্তায় একদিকে ভারতীয় পতাকা, অন্যদিকে সবুজের ঢেউ। কিন্তু কারও মুখ গোমড়া নয়, ভুঁরু কোঁচকানো নয়। বরং, চোখেমুখে উল্লাস। মুম্বই থেকে আসা সমর্থকদের গলায় তখন বলিউডি ঢঙে স্লোগান: ‘দু'টাকার চুইংগম, সূর্যভাউ সিংঘম!’ যা কানে আসামাত্র পাশেই দাঁড়ানো পাকিস্তানি ভক্তরা হাসি চেপে রাখতে পারছেন না! এই বলা-না বলা, পারা-না পারার সমীকরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে, ক্রিকেটের আসল স্বাদ, এই কুচুটে আর হুজুগে যুগে দাঁড়িয়েও, এখনও আনন্দে-মিলনে-উদযাপনে আর অবশ্যই উৎসবে! কখনও শত্রুতা-বিচ্ছেদে-বিতর্কে নয়!
শহরের হাওয়া গরম। আর্দ্রতা বিলক্ষণ টের পাওয়া যাচ্ছিল। তবু ভিড়ের উত্তেজনা শান্ত করল একদল পাকিস্তানি ছেলেমেয়ের সোল্লাস গর্জন: ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ!’ পড়শি মুলুকের খুদে সমর্থক রোহন। বাবার হাত ধরে ঢুকছে স্টেডিয়ামের সারিতে। হয়তো প্রথম বার! আবু ধাবি থেকে দেড় ঘণ্টার ট্রাফিক ঠেকিয়ে এসেছে স্রেফ ভারত–পাক লড়াই দেখার জন্য। গায়ে টিম ইন্ডিয়ার নীল জার্সি, মাপের তুলনায় ঢলঢলে। তবু চোখে তীব্র আত্মবিশ্বাস ছলকে উঠল! ধরা পড়ল অকপট ভবিষ্যদ্বাণীতে: ‘আজ বুমরাহ সবাইকে আউট করবে!’ এই উচ্ছ্বাস শিশুসুলভ। কিন্তু অস্থির সময়ে খুব জরুরি এই নিখাদ বিশ্বাসটুকু। খেলার অন্ত:স্তলে রয়েছে যে আবেগ আর ভালবাসা, রোহনের প্রতিটি শব্দ সেই অনুভূতিকে কি ছুঁয়ে যায় না?
আবার গেটেরই অন্য এক কোণে দেখা গেল আফজল আর আমিরকে। দুই ভাই। শারজায় বেড়ে ওঠা। বাবার মুখে গল্প শুনেছে—কীভাবে আটের দশকে, নয়ের জমানায় পাকিস্তান ত্রাস ধরাত। মাঠে দেখাত নিপাট দাপট। তখন ছবিটা একদম অন্যরকম। ভারতীয় দল একের পর এক ম্যাচ হেরে ফিরত। কোনওটা গোহারান! এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। আজ লাগাতার পরাজয়ের কাঁটা বিঁধে চলে। তবু আমির প্রত্যয়ী! বললেন, ‘হ্যাঁ, হেরেছি ঠিকই। কিন্তু তারপরই ভাবি, কাল সোমবার। কাজ আছে, ডেডলাইন আছে। হেরে গেলেও জীবন থেমে থাকবে না!’ আফজলও সুরে সুর মিলিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে জুড়ে দেয়, ‘এই খেলা তো আসলে উৎসব। হার–জিত আসবেই। কিন্তু এখানে সবাই একসঙ্গে আনন্দ করছে। সেটাই বড় কথা!’
একদিকে রোহনের নির্ভেজাল সারল্য। অন্যদিকে আফজলের নিখাদ বাস্তববুদ্ধি। এই দুইয়ের টানেই উড়ে যাক বিতর্কের হইচই, হাত না মেলানোর বিষ-বেলুন! দুবাইয়ের মঞ্চ হয়ে উঠুক নতুন কিছু শুরুয়াতের মঞ্চ। কার্নিভালের উচ্ছিষ্ট নয়, বরং উৎসবের পবিত্র আলো লিখে ফেলুক সুস্থ দ্বৈরথের নয়া ভাষ্য! দুই মুলুক ভেতর থেকে হয়তো এটাই চায়।