মুজারাবানির গল্প শুধু ক্রিকেটের নয়, হাল না ছাড়া লড়াইয়েরও কাহিনি। জুতো ছাড়া যে ছেলে বল করত, সে-ই একদিন বিশ্বের বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে শক্তিশালী দলকে একা হাতে তুর্কিনাচন নাচাল।

ব্লেসিং মুজারাবানি
শেষ আপডেট: 13 February 2026 18:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছ’ফুট আট ইঞ্চি লম্বা এক তরুণ। শৈশবে পায়ে জুতো ছিল না। অভুক্ত, পেটেও নিয়মিত খাবার জুটত না। সেই ছেলেই আজ টি-২০ বিশ্বকাপে (T20 World Cup) অস্ট্রেলিয়ার (Australia) মতো শক্তিশালী দলকে একা হাতে ধসিয়ে দিলেন। নাম ব্লেসিং মুজারাবানি (Blessing Muzarabani)। বয়স ২৯। জিম্বাবোয়ের (Zimbabwe) এই পেসার এখন আচমকা বিশ্ব ক্রিকেটের আলোচনায়।
কলম্বোয় দিনেদুপুরে ‘ডাকাতি! ‘ডাকাতি’ ছাড়া আর কী-ই বা বলা যেতে পারে! অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে চার উইকেট তুলে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছেন। নতুন বলে মন্থর পিচেও শর্ট ডেলিভারি। যার জালে বন্দি জশ ইংলিস ও টিম ডেভিডের মতো তারকা ব্যাটার! পরে ধীরগতির বলে ম্যাট রেনশকেও ফেরান। শেষলগ্নে মধুরেণ সমাপয়েৎ অ্যাডাম জাম্পার লেগ স্টাম্প উড়িয়ে! ম্যাচ শেষ, পকেটে দু’পয়েন্ট, সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক নজির।
হাইফিল্ডের ছেলের একজোড়া জুতোর স্বপ্ন
হারারির হাইফিল্ড এলাকায় বড় হওয়া। মুজারাবানির পরিবার কোনওদিনই আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিল না। ছোটবেলায় ডায়রিয়া-অপুষ্টি নিত্যসঙ্গী। সাত বছর বয়সে হাতে প্রথম বল তুলে নেন। তারপর একবুক সাহস সম্বল করে ভাইয়ের সঙ্গে তাকাশিঙ্গা ক্রিকেট ক্লাবে (Takashinga Cricket Club) যান। সেদিন পায়ে জুতো ছিল না। পরের দিনও নয়। হারারে স্পোর্টস ক্লাবে (Harare Sports Club) অনুশীলনে এসে দেখতেন, অন্য ছেলেরা গাড়ি আসে, চকচকে জুতো পরে। মুজারাবানি দমে যাননি। খালি পায়ে গরম কংক্রিটে দাঁড়িয়ে বল করছেন। অনেক পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বড়লোক আর গরিব বাচ্চারা একসঙ্গে খেলত। ওদের জুতো দেখে আমারও ইচ্ছে করত। কিন্তু কেনার সামর্থ্য ছিল না। তবু শুধু বল করাতেই মন দিতাম।’
ওখানেই তিনি নজরে পড়েন প্রাক্তন জিম্বাবোয়ে অধিনায়ক তাতেন্দা তাইবুর (Tatenda Taibu)। প্রথমে চুপচাপ, লাজুক বলে সেভাবে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু এক মাস দেখার পর বুঝেছিলেন—এই ছেলের ভিতরে খিদে অফুরান। সে খিদে জীবন বদলানোর, স্বপ্ন দেখার!
লম্বা শরীর, দ্রুত বল
১৫ বছর বয়সে হঠাৎ করেই বেড়ে ওঠেন মুজারাবানি। ছ’ফুট আট ইঞ্চি উচ্চতা। যাকে কাজে লাগিয়ে ছুড়তে থাকেন বিষাক্ত ডেলিভারি… রসদ ভয়ঙ্কর বাউন্স আর তীব্র গতি। ২০১৮ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারে চার উইকেট নিয়ে আলোচনায় আসেন। কিন্তু জিম্বাবোয়ে বিশ্বকাপে উঠতে পারেনি। হতাশা ছিল। তার মধ্যেই আর্থিক সঙ্কটে দেশের ক্রিকেট বোর্ড। বেতন বন্ধ।
সেই সময় ইংল্যান্ডের নর্থ্যাম্পটনশায়ারের (Northamptonshire) সঙ্গে কোলপ্যাক চুক্তি করেন মুজারাবানি। জমে ওঠে সমালোচনা—দেশ ছেড়ে গেলেন কেন? যদিও তাঁর উত্তর ছিল সরল। অকপটে বলে দেন, ‘আমি জানতাম, সুযোগ নষ্ট করলে জীবনের বড় ক্ষতি হবে। তাই এই সিদ্ধান্ত!’ ইংল্যান্ডে প্রথম দিকে চোটে ভুগেছেন। কিন্তু সেখানেই দেখা হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ অলরাউন্ডার জেসন হোল্ডারের (Jason Holder) সঙ্গে। লম্বা শরীর নিয়ে কীভাবে বল করতে হয়, ভ্যারিয়েশন আনতে হয় কীভাবে—শিখেছিলেন তাঁর কাছ থেকে।
ফিরে এসে বদলে যাওয়া বোলার
ব্রেক্সিটের পরে কোলপ্যাক চুক্তি শেষ হয়। দেশে ফেরেন মুজারাবানি। আরও পরিণত। ইয়র্কার, স্লোয়ার বল, শর্ট বল—সব অস্ত্র নিয়ে তৈরি। কলম্বোর আর্দ্র বিকেলে সেই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগালেন। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল।
মুজারাবানির গল্প শুধু ক্রিকেটের নয়, হাল না ছাড়া লড়াইয়েরও কাহিনি। জুতো ছাড়া যে ছেলে বল করত, সে-ই একদিন বিশ্বের বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে শক্তিশালী দলকে একা হাতে তুর্কিনাচন নাচাল। তাইবু একবার বলেছিলেন, ‘যা কিছু ও জীবনে পেয়েছে, তা হারাতে চায় না।’আজ সেই কথাই যেন সত্যি প্রমাণিত হল। পায়ে জুতো থাক বা না থাক—খিদে থাকলেই বড় স্বপ্ন পূরণ হয়। দুরন্ত স্পেলে বুঝিয়ে দিলেন মুজারাবানি।