আইসিসির সমীকরণ জটিল। একদিকে আর্থিক ক্ষতির ভয়, অন্যদিকে সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক চাপ।

আমিনুল ইসলাম
শেষ আপডেট: 8 February 2026 15:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিনকয়েক আগেই পাকিস্তান অধিনায়ক সলমন আলি আঘা বাংলাদেশিদের ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন। মুস্তাফিজুররা বিশ্বকাপ খেলছে না বলে গলায় ঝরে পড়েছিল একরাশ হতাশা-যন্ত্রণা। দাদাদের এহেন সমানুভূতিতে অবশ্য ততটা ডাল গলেনি৷ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পিসিবি-র সামগ্রিক অবস্থানে কিঞ্চিৎ উষ্মাই প্রকাশ করে। পাকিস্তান বাংলাদেশের মতো গোটা টুর্নামেন্ট বয়কট করেনি। স্রেফ সংহতি জানিয়ে ভারত-ম্যাচে না খেলার অভিপ্রায় জানিয়েই ক্ষান্ত থেকেছে!
আইসিসির বৈঠকের ঠিক আগে কেন লাহোরে বিসিবি প্রধান?
এই আবহে আচমকা লাহোরে হাজির বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল (Aminul Islam Bulbul)। সময়টা মোটেই কাকতালীয় নয়। রবিবার সন্ধ্যায় অনলাইনে (জুম-কলে) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (International Cricket Council) জরুরি বৈঠক বসার কথা—যেখানে আলোচনার কেন্দ্রে পাকিস্তানের ভারত ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত। ঠিক তার আগে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নকভির (Mohsin Naqvi) সঙ্গে সরাসরি বৈঠক সারতে বুলবুলের এই সফর, কূটনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই ধরা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, আইসিসি চাইছে যে কোনওভাবে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি সূচি অনুযায়ী হোক। কারণ এই একটি ম্যাচের উপর কার্যত পুরো টি-২০ বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ভারসাম্য দাঁড়িয়ে। ব্রডকাস্টিং রাইটস থেকে স্পনসরশিপ—সব হিসেবের কেন্দ্রে এই ‘মহারণ’। সেই জায়গায় পাকিস্তানের অনড় অবস্থান আইসিসির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ।
বাংলাদেশ নেই, তবু কেন আলোচনায় ঢাকাকে টানা হচ্ছে?
প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বকাপ থেকেই বাদ পড়া বাংলাদেশ কেন এই আলোচনার অংশ? উত্তরটা আর্থিক ও কৌশলগত—দু’দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দল খেলছে না ঠিকই, কিন্তু আইসিসির সামগ্রিক আয়ে যদি ধাক্কা লাগে, তার প্রভাব পড়বে ভবিষ্যতের বরাদ্দে। সদস্য দেশ হিসেবে বিসিবিও সেই ক্ষতির ভাগ পাবে। কাজেই ঢাকার স্বার্থ শুধু এই টুর্নামেন্টে আটকে নেই, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেই জড়িয়ে।
এ কারণেই পিসিবি চাইছে বাংলাদেশকে পাশে রেখে একটি যৌথ অবস্থান তৈরি করতে। বার্তাটা পরিষ্কার—এটা শুধু পাকিস্তানের একক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ‘নীতিগত প্রতিবাদ’। আইসিসির উপর চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে এই চতুর সমীকরণ।
রাজনীতি বনাম ক্রিকেট: সংঘাত কতদূর যেতে পারে?
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল (Asif Nazrul) প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান। ফেসবুকে তাঁর পোস্টে বার্তা ছিল, ঢাকার অবস্থানকে সমর্থন করায় ইসলামাবাদের প্রতি তাঁরা কৃতজ্ঞ। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনুসের (Muhammad Yunus) প্রশাসনে নজরুল কার্যত ক্রীড়ামন্ত্রীর ভূমিকায়। ফলে এই বক্তব্য নিছক ব্যক্তিগত মত নয়, রাষ্ট্রীয় অবস্থানের প্রতিফলন।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (Shehbaz Sharif) সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে খেলতে বসা ‘রাজনীতির বাইরে খেলাধুলা’-র নীতির পরিপন্থী। তাঁর নির্দেশেই পিসিবি ভারত ম্যাচ বয়কটের পথে হেঁটেছে।
শেষ কথা: আইসিসির সামনে কঠিন অঙ্ক
সব মিলিয়ে আইসিসির সমীকরণ জটিল। একদিকে আর্থিক ক্ষতির ভয়, অন্যদিকে সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক চাপ। লাহোরে বিসিবি প্রধানের উপস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, এই সংকট আর শুধুই ক্রিকেটীয় নয়—কার্যত কূটনৈতিক দাবাখেলা। প্রশ্ন একটাই: শেষ পর্যন্ত কি আইসিসি চাপ সামলে পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে মাঠে নামাতে পারবে, নাকি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণই যাবে হারিয়ে? উত্তর মিলবে খুব শিগগির। কিন্তু ততক্ষণ ‘দাদা’-‘ভাই’-এর এই সমীকরণ বিশ্বক্রিকেটের যন্ত্রণা আর কৌতূহল যুগপৎ বাড়াবে।