ফের ব্যর্থতা। আর অবধারিতভাবে চক্রবৎ ফের কামব্যাক! হেডিংলে টেস্ট কি এই পর্যায়ক্রমিক আলো-আঁধারেরই কোনও এক পর্যায়?

ঋষভ পন্থ
শেষ আপডেট: 29 June 2025 12:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘সবাই নিজেকে দেখানোর জন্য কাজ করে। আমি পরিশ্রম করি আড়ালে থাকতে!’
পাঁচ বছর আগে দুনিয়া যখন অন্তরীণ, লকডাউন চলছে, কোভিডের থাবা ক্রমশ প্রশস্ত হচ্ছে, তখন নিজের হোয়াটসঅ্যাপে এমনই ‘স্টেটাস’ দিয়েছিলেন ঋষভ পন্থ। ঘরবন্দি, কবে বাইরে বেরোবেন তার ঠিক নেই। জাতীয় দলে ঠাঁই পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা। ততদিনে টিমের বাইরে।
ভাগ্যের চাকা যদিও ঘুরল। ঘোরালেন তিনি নিজেই। ক্রিকেট-অনুসন্ধিৎসুদের মনে থাকবে ২০২০ সালের অস্ট্রেলিয়া সফর। সেখানে জায়গা পান ঋষভ। সিডনি ও ব্রিসব্রেনে খেলেন দু’দুটো আত্মবিশ্বাসী ইনিংস! ঐতিহাসিক সাফল্য পায় তরুণ টিম ইন্ডিয়া ব্রিগেড, লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে ডাকাবুকো ঋষভের মারকাটারি পারফরম্যান্স।
কাট টু। ২০২৫। এবারও চর্চার কেন্দ্রে হোয়াটসঅ্যাপ। তবে কোনও টকঝালমিষ্টি স্টেটাসের জন্য, এবার অ্যাপটাই আনইনস্টল করে দিয়েছেন ঋষভ। মার্চ মাসের কথা। মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে ফিরেছেন। জীবনের বিপন্নতা কেটেছে। কিন্তু কেরিয়ারের আকাশে ফের অনিশ্চয়তার মেঘ। তাই নিজেকে গুছিয়ে নিতে, বাইরের সরগরম দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফের মূলস্রোতে ফিরে আসতে শুধু হোয়াটসঅ্যাপ ওড়ানো নয়, মোবাইল ফোনও দিনের বেশিরভাগ সময় সুইচড অফ রাখতে শুরু করেন ঋষভ।
হেডিংলে টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি কি সেই বিযুক্তির সুফল? ভাগ্যের চাকা চিরস্থায়ীভাবে ঘুরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত রাজকীয় সামারসল্ট? অনুরাগীরা এর উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলবেন। মনে করাতে চাইবেন আইপিএলের অন্তিম ইনিংসের চোখধাঁধানো শতরান। কিন্তু নিন্দুক-সমালোচকরা আলোচনায় আনবেন আইপিএলে বাকি সমস্ত ম্যাচের পারফরম্যান্স, টি-২০ বিশ্বকাপে হতাশা, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে দলে জায়গা না পাওয়া!
খুব বেশিদিন না। মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে ফের দুনিয়া ওলোটপালট ঋষভের। যেমনটা আজীবন হয়ে আসছে। এই রোদ, এই বৃষ্টি। এই আলো, এই অন্ধকার। এই সেঞ্চুরি হাঁকানো, এই শূন্যতে আউট হয়ে ফেরা! কোনওকিছুই স্থায়ী নয়। ক্ষণিকের জন্য এসে ফের ফিরে যাওয়া। কেরিয়ারের শুরুর দিন থেকে সাফল্য-ব্যর্থতা—দুই’ই ঋষভ পন্থকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে।
কাছ থেকে দেখেছেন যাঁরা, তাঁদেরই একজন দেবেন্দ্র শর্মা। দিল্লির সনেট ক্লাবে একদা তাঁর হাতেই গড়েপিটে তৈরি হয়েছেন ঋষভ। দেবেন্দ্রর চোখে, বর্ডার-গাভাসকার ট্রফিতে মেলবোর্ন টেস্টে বোকার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলে আউট হওয়ার পর পরিস্থিতি ঋষভের হাত থেকে বেরিয়ে যায়। সিডনিতে পরের টেস্টে দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৪০ ও ৬১ (৩৩ বলে) করলেও ক্রিকেট সমর্থক ও বিশেষজ্ঞ—দু’পক্ষই ‘কামব্যাকে’র তকমা দিতে দ্বিধাগ্রস্ত। কারণ, ততদিনে সকলে এটুকু বুঝে গিয়েছে, ফের কবে ফর্ম-ছাড়া হবেন ঋষভ, পরের ইনিংসে কী করবেন—খাতা না করে সাজঘরে ফিরবেন না শতরান করবেন—এর কোনও নিশ্চয়তা নেই!
কার্যত সেই আশঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হয়। ওয়ান ডে টিম থেকে বাদ পড়েন। প্রায় ২৭ কোটিতে লখনউ সুপার জায়ান্টসে যোগ দিলেও দুঃস্বপ্নের আইপিএলের সাক্ষী থাকেন ঋষভ পন্থ।
ফের ব্যর্থতা। আর অবধারিতভাবে চক্রবৎ ফের কামব্যাক! হেডিংলে টেস্ট কি এই পর্যায়ক্রমিক আলো-আঁধারেরই কোনও এক পর্যায়?
মানতে রাজি নন সোহম দেশাই, টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচ। জানিয়েছেন, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দলে না জায়গা না পেয়ে যেভাবে প্র্যাকটিস শুরু করেন ঋষভ, তাকে সাদা বাংলায় ‘আত্মপীড়ন’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কঠোর অনুশীলন, লাগাতার ব্যাটিং করে চলা, টেকনিকের গোড়ায় গলদ মেরামত—যার একটা ফলশ্রুতি হাতে ফোস্কা, অন্যটা সেঞ্চুরিতে সাজানো সামারসল্ট!
দেশাইয়ের কথায়, ‘রাত-দিন ধরে কঠোরভাবে প্র্যাকটিস চালাত ঋষভ। ফাঁকা থাকত যখন, আমায় জিমে টেনে নিয়ে যেত। ওয়ার্কলোড কি ক্লান্তি—কোনও কিছুর পরোয়া নেই। মুখে শুধু একটাই কথা—নিজেকে তৈরি রাখতে হবে।’
সম্প্রতি আর অশ্বিন তাঁর পডকাস্টে জানান, ঋষভের আক্রমণাত্মক খেলার পাশপাশি রক্ষণে জোর দেওয়া উচিত। হেডিংলেতে তার কিছুটা লক্ষণ ফুটে উঠেছে। যার কৃতিত্ব অনেকটাই প্রাপ্য দেবেন্দ্র শর্মার। পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্তসংঘর্ষ চলাকালীন যখন মরশুমের মাঝপথে বন্ধ থাকে আইপিএল, তখন ছেলেবেলার কোচের দ্বারস্থ হন ঋষভ। দেবেন্দ্রর কথায়, ‘ও যখন আমায় ফোন করল, তখন কঠোর অনুশীলনের কথা বারবার বলে যাচ্ছিল। আমি লখনউ সুপার জায়ন্টসের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে আপলোড করা এমন বেশ কিছু ভিডিও দেখেওছিলাম। সেটা দেখে ঋষভকে জানাই, ডিফেন্স আরও মজবুত করতে হবে। এটা নিয়ে কাজ করার জায়গা রয়েছে। ওকে শরীর-ঘেঁষা শট খেলার ও টেকনিকে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিই।’
এরই ফলশ্রুতি হেডিংলের জোড়া শতরান। যদিও তাতে সন্তুষ্ট নন অশ্বিনের মতো প্রাক্তনী। ঋষভকে কাছ থেকে দেখেছেন। জানেন, শক্তি ও দুর্বলতার অ-আ-ক-খ। শতরানকে দ্বিশতরান করার, ভাল ইনিংসকে খুব ভাল করার ক্ষমতা রাখেন টিম ইন্ডিয়ার উইকেটরক্ষক। স্বভাবদত্ত আক্রমণাত্মক ইনিংসের পাশাপাশি টেস্টের উপযোগী বড় ইনিংস খেলার দিকে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেবেন্দ্রও।
ইংল্যান্ড সফরে বুমরাহ খেলবেন আর দুটি টেস্ট। টিমের বোলিং ইউনিট আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছে। লোয়ার অর্ডার রান করতে ব্যর্থ। এই পরিস্থিতিতে স্রেফ রোশনাই জ্বালিয়েই নিভে যাবেন না ঋষভ, আলো বিকিরিত হবে আরও প্রবলভাবে, অনেকক্ষণ ধরে—আশায় অনুরাগীরা।