ইতিহাসে আজও অমর ১৯৪৮ সালের ‘ইনভিন্সিবলস’ ট্যুর। ব্র্যাডম্যানের শেষ অ্যাসেজ। অপরাজিত থেকে সিরিজ জয়। লন্ডনের ওভালে শেষ ইনিংসে ডনের শূন্য রান—ক্রিকেটের এক চিরকালীন মুহূর্ত।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 11 August 2025 16:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কিছু প্রতিযোগিতা স্রেফ হার-জিতের হিসেবে মাপা মুশকিল। কখনও কখনও তাতে জুড়ে যায় দর্শনের সংঘাত, পীড়িত ও শোষকের রক্তাক্ত ইতিহাস কিংবা দেশভাগের অকথিত-অব্যক্ত ক্ষতচিহ্ন। বাইশ গজের লড়াই হোক, চায় গ্যালারির গর্জন—হিসেবটা আর তিন পয়েন্ট কিংবা খেতাবজয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এমন বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতার রং একটু চড়াদাগের। যেমন, ভারত-পাকিস্তান, বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা লেনিন-ট্রটস্কি। এই বৈরিতা শুধুই আলাদা মতাদর্শ কিংবা বিশ্বাসের নয়, সময়ের চাপা ছাইয়ের তলায় এখনও ফেলে আসা অতীত ক্রোধ হয়ে জ্বলে! অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের রেষারেষিও এমন দ্বন্দ্বের সাক্ষ্য বয়ে চলে। পোশাকি নাম ‘অ্যাসেজ’। যা স্রেফ ক্রিকেট নয়, খেলার ইতিহাসেও অন্যতম দীর্ঘ ও চর্চিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
লড়াইয়ের নামটা এল কীভাবে? আর কেনই বা এই সিরিজ শতক পেরিয়েও এতটা গুরুত্বপূর্ণ? উত্তর খুঁজতে হলে ফিরতে হবে ১৮৮২ সালের শরতে।
সে বছর লন্ডনের ঐতিহাসিক ওভাল ময়দানে মুখোমুখি ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া। তখন টেস্ট ক্রিকেটের ভোরবেলা। আড় ভেঙেছে সবে। লাল বলের দ্বৈরথ বলতে বোঝাত দুই দলের ঢিমেতালের লড়াই। ফলাফল অধিকাংশ সময় বেরত না। ম্যাচ শেষ হত অমীমাংসিত। খেলাটা ছিল বিত্তবানদের মনোরঞ্জনের বিষয়। ফলে তাতে রুদ্ধশ্বাস টক্করের বদলে জৃম্ভনের মাত্রাই বেশি থাকবে—তাতে সন্দেহ কী! ক্রিকেটের হালফ্যাশনের নাটকীয়তা সেভাবে দেখা যেত না।
এমনই নিস্তরঙ্গ খেলায় সেদিন উলটপুরাণ। জমজমাট নাটক। উইলিয়াম মারফি ও ফ্রেড স্পফোর্থের বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ৭ রানে ম্যাচ জিতে নেয়। ইংল্যান্ডের মাটিতে, ইংরেজদের হারানো—তখন অকল্পনীয়। ফলে টলটলে পুকুরে তরঙ্গ ওঠে। গ্যালারিতে বসা দর্শককুল স্তব্ধ। সংবাদপত্রে ছাপা হয় শোকবার্তা। সবচেয়ে বিখ্যাত লেখা প্রকাশ করে ‘দ্য স্পোর্টিং টাইমস’। কালো বর্ডারে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা: ‘ইংরেজ ক্রিকেটের মৃত্যু হয়েছে। দেহকে দাহ করা হবে। তার ভস্ম যাবে অস্ট্রেলিয়ায়!’ এই ‘অ্যাসেজ’ (Ashes) বা ভস্ম—শব্দটাই পরে প্রতীক হয়ে ওঠে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘দ্য অ্যাসেজ’।
দেড় বছর পর, ১৮৮২-৮৩ মরশুমে ইংল্যান্ড যায় অস্ট্রেলিয়া সফরে। সেখানে মেলবোর্নে, এক ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে, ইংরেজ অধিনায়ক আইভো ব্লাইকে উপহার দেওয়া হয় ছোট্ট মাটির পাত্র। তাতে ছাই ভরা। শোনা যায়, সেই ভস্ম নাকি ক্রিকেট বেলের। কারও মতে, ভাঙা স্টাম্পের টুকরো। যাই হোক না কেন, ঐতিহাসিক স্মারকই বিখ্যাত অ্যাসেজ ট্রফি হয়ে ওঠে। যা দখল করতে দু’দেশের ক্রিকেটাররা আজও ময়দানে ঝাঁপায়!
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই পাত্র আদতে কোনো সরকারি ট্রফি নয়, ছিল প্রতীকী উপহার মাত্র। অথচ তা-ই পরে হয়ে উঠল ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক ক্রীড়া স্মারকগুলির অন্যতম! আসল মাটির পাত্রটি আপাতত লর্ডসের মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের জাদুঘরে সংরক্ষিত। দুই দলের হাতে যে ট্রফি দেওয়া হয়, তা আদতে প্রতিলিপি।
বস্তুত, উনিশ শতকের আগে থেকেই ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজ মানে ‘অ্যাসেজ’। যদিও আগে তা প্রতি বছর নিয়মিত আয়োজিত হত না। কখনও ইংল্যান্ড সফর করত, কখনও অস্ট্রেলিয়া। জাহাজে যাতায়াত। যেতে-আসতে সপ্তাহ পেরত। অস্ট্রেলিয়ায় অ্যাসেজ মানে গ্রীষ্মের উৎসব। পাঁচ দিনের টেস্ট, মাঠ ভর্তি দর্শক, গ্যালারিতে হলুদ-সবুজ স্রোত। ইংল্যান্ডে অ্যাসেজ এলেই সাদা শার্ট, বিয়ারের মগ, গানের স্রোত—‘জেরুজালেম’ কিংবা ‘স্যুইট ক্যারোলিন’!
আসলে শুধু ক্রিকেটীয় দ্বৈরথ নয়—এই সিরিজ ঔপনিবেশিক সম্পর্কের প্রতিফলন। একসময় অস্ট্রেলিয়া ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। তাদের কাছে ইংল্যান্ডকে হারানো অতীতের গ্লানি কিছুটা হলেও মুছে দেওয়ার সমতুল্য হয়ে দাঁড়ায়।
যদিও দর্শকদের কাছে অ্যাসেজের ইতিহাস মানেই জমজমাট নাটক, স্নায়ুযুদ্ধ, বাঁধিয়ে রাখার মতো মুহূর্ত! যার অন্যতম সাক্ষ্য ‘বডিলাইন’ সিরিজ (১৯৩২-৩৩)। ইংল্যান্ডের ডগলাস জার্ডিনের নেতৃত্বে বোলার হ্যারল্ড লারউড ও বিল ভসের শরীর-নিশানা-করা দ্রুত বলিং। লক্ষ্য ডন ব্র্যাডম্যানকে আটকে দেওয়া। কৌশল সফল হলেও বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও যায় বিগড়ে।
ইতিহাসে আজও অমর ১৯৪৮ সালের ‘ইনভিন্সিবলস’ ট্যুর। ব্র্যাডম্যানের শেষ অ্যাসেজ। অপরাজিত থেকে সিরিজ জয়। লন্ডনের ওভালে শেষ ইনিংসে ডনের শূন্য রান—ক্রিকেটের এক চিরকালীন মুহূর্ত। এরই পালটা ১৯৮১ সালের ‘বথামের অ্যাসেজ’। হেডিংলেতে ইংল্যান্ড ফলো-অন থেকে ফিরে এসে ছিনিয়ে নেয় রুদ্ধশ্বাস জয়! সৌজন্যে ইয়ান বথামের ব্যাটিং আর বব উইলিসের বিধ্বংসী স্পেল। আধুনিক আমলে ২০০৫ সিরিজ অন্যতম সেরা অ্যাসেজ। ফ্লিনটফ, পন্টিং, ম্যাকগ্রা, ওয়ার্ন—দুই শিবিরেই তারকার ছড়াছড়ি! প্রতিটি ম্যাচ টানটান, নাটকীয়। শেষ অবধি সিরিজ জিতে দুই দশকের অস্ট্রেলীয় আধিপত্য ভেঙে দেয় ইংল্যান্ড।
পরিসংখ্যান মতে, ১৮৮২ থেকে আজ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য ছিল, বিশেষত ব্র্যাডম্যান যুগে ও নয়ের দশকে। তবে ইংল্যান্ডও পেয়েছে তাদের সোনালি সময়। ২০০৯ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত তিনটি সিরিজ জয় ব্যতিক্রমী হলেও ফেলে দেওয়ার মতো নয়!
ব্যক্তিগত মাইলস্টোন অর্জনের লিস্টিতে যদিও শীর্ষে অস্ট্রেলিয়া। সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক—স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। সবচেয়ে বেশি উইকেটশিকারী—শেন ওয়ার্ন। ইতিমধ্যে সিরিজের ফরম্যাটও বদলেছে। একসময় ৬ টেস্ট হতো, এখন সাধারণত ৫ ম্যাচের সিরিজ দুই দেশে পালা করে আয়োজিত হয়। যুগের প্রয়োজনে স্বাদ বদলাতে চালু হয়েছে দিন-রাতের টেস্ট।