সিনে যখন গীতা দে ঢুকতেন, তখন অনুপ কুমার মজা করে চেঁচিয়ে সংলাপ বলতেন 'মা দুর্গা আসছেন, ওরফে আমার শাশুড়িমা আসছেন!

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 17 June 2025 15:30
কেউই তাঁকে বুঝতে পারেনি। হয়তো বা বুঝতে চায়নি কেউ। এই ভুল বোঝার বোঝা বইতে বইতে তিনি নিজেই চলে গিয়েছিলেন অকালে। আংটি চাটুজ্জ্যের ভাই, বসন্ত ভবঘুরে, বাউন্ডুলে- নায়ক হওয়ার কোনও গুণ তাঁর নেই। না কন্দর্পকান্তি রূপ, না দীর্ঘ উচ্চতর চেহারা। থাকবার মধ্যে আছে শুধু একটি হৃদয়। সেই হৃদয়বান মানুষটির নাম অনুপ কুমার দাস। পর্দার বাইরেও তিনি বাস্তব জীবনে ছিলেন প্রকৃত পরোপকারী মানুষ। সংসার থেকে সমাজে, অনুপ কুমারের পরোপকারের অজস্র ঘটনা ছড়িয়ে আছে। কেউ মনে রেখেছে, কেউ মনে রাখেনি।
১৯৫১ সালে শিশির ভাদুড়ির শ্রীরঙ্গমে অনুপকুমারের সঙ্গে প্রথম অভিনয় করেন গীতা দে। সে সময় গীতা দেরও অভিনয় জীবনের গোড়ার দিক। মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে গীতা দের খুব ভয় লাগত। তখন অনুপ কুমারই পাশে দাঁড়িয়ে সহ-অভিনেতা হিসেবে তাঁকে ভরসা জুগিয়েছিলেন। দিনের পর দিন, একজন উদীয়মান শিল্পীর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে ভরসা জোগানো কজন শিল্পী এই ইন্ডাস্ট্রিতে করেন? যা সারা জীবন মনে রেখেছিলেন গীতা দে।

এরপর কত ছবিই দু'জনে একসঙ্গে করেছেন। থিয়েটার জীবনে অনুপ কুমার আর গীতা দের স্মরণীয় অভিনয় 'অঘটন' নাটকে। সেখানে গীতা দে অনুপকুমারের দাপুটে শাশুড়ির রোল করতেন।
সিনে যখন গীতা দে ঢুকতেন তখন অনুপ কুমার মজা করে চেঁচিয়ে সংলাপ বলতেন 'মা দুর্গা আসছেন, ওরফে আমার শাশুড়িমা আসছেন!' মজা করে যাই সংলাপ বলুন, গীতা দে-কে কিউটা কিন্তু ঠিক দিয়ে দিতেন অনুপকুমার। এটাও তো পরোপকারী চরিত্রর বড় উদাহরণ। 'অঘটন' নাটক বহু রজনী অতিক্রান্ত নাটক ছিল।
অথচ অভিনয় করতে গিয়ে কত দজ্জাল মহিলার রোলে গীতা দে নিরীহ অনুপ কুমারের উপর অত্যাচার করেছেন, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। সবথেকে সুপারহিট ছবি 'বৌরাণী' তে গীতা দের সেই সংলাপ ভাবুন! 'রঘু! ঐ চাকরটা!' বৃদ্ধ ভৃত্যের ভূমিকায় কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন অনুপ কুমার।
গীতা দে চলচ্চিত্র থেকে মঞ্চে বহু কাজ করলেও টাকা পয়সা বিশেষ জমাতে পারেননি। অভাব অনটনেই কেটেছে সারা জীবন। দুই ছেলে আর এক মেয়ে। এক ছেলে আবার নকশাল করতে গিয়ে মানসিক রোগের শিকার। একবার গীতা দের মেয়ের অ্যাপেনন্ডিক্সের ব্যথা চরমে উঠল। মেয়ের অপারেশন করানোর পয়সা গীতা দের নেই। মেয়ের অবস্থা মরমর। স্টুডিও পাড়ার অনেকজনকে বলেও গীতা দে অপারেশনের টাকার ব্যবস্থা করতে পারলেন না। সে কথা কানে গেল অনুপকুমারের। তিনি দু'বার না ভেবে টাকা দিয়ে গীতা দের পাশে দাঁড়ালেন। প্রাণে বাঁচল গীতা দের মেয়ে। অনুপকুমারের ঋণস্বীকার গীতা দে চিরকাল করেছেন। গীতা দে বলতেন 'আমার মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছিলেন অনুপবাবুই। পরে আমি সে টাকা শোধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই পাশে দাঁড়ানো, সেটা যে কী, তা যে বিপদে পড়েছে সেই জানে।'