শিবকে শান্ত করতে তখন নারায়ণ তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীদেহ খন্ড বিখন্ড করে ফেললেন। সতীর দেহখন্ড যেখানে যেখানে পড়ল সেখানেই পরবর্তী যুগে তৈরি হল সতীপীঠ।

'সতীর দেহত্যাগ' । গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 11 June 2025 20:03
জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার দিনেই মহাতীর্থ কালীঘাটে হয় সতী অঙ্গের স্নান উৎসব। দেবী সতীর মাহাত্ম্য ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই সতীপীঠ কালীঘাটের সঙ্গে। সেই কাহিনি নিয়ে ১৯৫৪ সালে মানু সেন বানিয়েছিলেন 'সতীর দেহত্যাগ' ছবি। পরবর্তী কালে ১৯৮০ সালে একই কাহিনি নিয়ে 'দক্ষ যজ্ঞ' ছবিও হয়েছিল।
ছবির গল্প শোনার আগে মূল পৌরাণিক কাহিনিটি জেনে নেওয়া প্রয়োজন। পুরাকালে প্রজাপতি ব্রহ্মার মানসপুত্র রাজা দক্ষ কঠোর তপস্যার দ্বারা মহাশক্তি দুর্গার কৃপালাভ করেন। মহাশক্তির দর্শন পেয়ে তিনি তাঁকে কন্যা রূপে পেতে চান। মহাশক্তি বরদান কালে দক্ষকে বলেন তিনি দক্ষরাজ কন্যা হয়েই জন্মাবেন কিন্তু তাঁকে কখনও অপমান করা যাবে না। কিছুকাল পরে দক্ষ জায়ার কোল আলো করে এল মহাশক্তি। যাঁর নাম হল সতী। সতী ছোট থেকেই শিবের ভক্ত। সতীর যৌবনে দক্ষ স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করলেন। দক্ষর লোভ ছিল ঐশ্বর্যে। তাই তেমন জামাই তিনি আশা করেছিলেন। কিন্তু সতী বরমাল্য দিলেন ভিখিরি নেশাখোর শিবের গলায়। দক্ষ ক্রুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে নারদ তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, মহাশক্তির সেই শর্ত। তাঁকে কখনও অপমান করা যাবে না। দক্ষ খুব বিরক্ত হয়েই সতীকে বিদায় দিলেন শিবগৃহে।

এরপর ঘটল আর এক কান্ড। ভৃগুযজ্ঞে উপস্থিত ছিলেন শিব। তিনি পূজা গ্রহণ করেন। সেখানে দক্ষরাজও আমন্ত্রিত ছিলেন। কিন্তু দক্ষকে জামাতা সে অর্থে কোনও সম্মান দেখালেন না। যার ফলে দক্ষ অপমানে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। ব্রহ্মার বরে দক্ষ হয়েছিলেন সমগ্র পৃথিবীর রাজা। যজ্ঞে শিবকে সবসময় আহুতি দিতে হয় বলে দক্ষ সারা পৃথিবীতে যজ্ঞ করাই বন্ধ করে দিলেন। পৃথিবী রাজের নির্দেশ অমান্য করে কার সাধ্য! এরফলে শিবের কোপে সারা পৃথিবী মরুভূমি হয়ে গেল, দুর্ভিক্ষ, মড়ক উপস্থিত হল। প্রজারা ব্যাকুল হয়ে দক্ষের কাছে যজ্ঞ করার প্রার্থনা জানালেন।
তখন দক্ষ জানালেন তিনি স্বয়ং এক বিরাট যজ্ঞ করবেন কিন্তু শিবকে আবাহন জানাবেন না। বাদ বাকি দেবতারা আমন্ত্রিত ছিলেন। সকলের নিষেধ সত্ত্বেও তিনি শিবহীন যজ্ঞ শুরু করলেন। দক্ষ নারদকে বললেন ত্রিভূবনের সবাইকে বিরাট যজ্ঞে নিমন্ত্রণ করতে, শুধু জামাতা শিব আর কন্যা সতীকে এ কথা না জানাতে। কিন্তু নারদের যা স্বভাব তাই করলেন। সবাইকে নিমন্ত্রণ করতে গিয়ে পরোক্ষ ভাবে তিনি সতীকে জানিয়ে দেন বাবার যজ্ঞের কথা।

সতী ভেবে বসেন বাবা বোধহয় মেয়ে-জামাই ঘরের লোক ভেবে আর নিমন্ত্রণ করেননি। শিবের বারণ সত্ত্বেও সতী চলে যান বিরাট যজ্ঞে। সতী পিতাগৃহে উপস্থিত হয়ে শিবনিন্দা শুনে যজ্ঞের অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিয়ে দেহত্যাগ করলেন। এমন দুঃসংবাদ পেয়ে উন্মাদের মতো ছুটে এলেন মহাদেব। সতীর দেহ কাঁধে তুলে শিব ও তাঁর অনুচরবৃন্দ প্রলয় নৃত্য করে যজ্ঞস্থল লন্ডভন্ড করে দিলেন। দক্ষকে করলেন হত্যা। যার ফলে পৃথিবী যায় যায়। শিবকে শান্ত করতে তখন নারায়ণ তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীদেহ খন্ড বিখন্ড করে ফেললেন। সতীর দেহখন্ড যেখানে যেখানে পড়ল সেখানেই পরবর্তী যুগে তৈরি হল সতীপীঠ। শিব শান্ত হলেন। দক্ষ জায়া প্রসূতির অনুরোধে দক্ষ প্রাণ ফিরে পেলেও যে মুখে তিনি শিবনিন্দা করেছিলেন সেই মুখ আর ফিরে পেলেন না। ছাগমুখ শরীর নিয়ে তাঁকে থাকতে হল। সতীর পায়ের কড়ে আঙ্গুল পড়েছিল গঙ্গা নদীর ধারে। পরে সেখানেই সৃষ্টি হল মহাতীর্থ কালীঘাট মন্দির। এই সতী অঙ্গ জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রার দিন কালীঘাটে স্নান করানো হয় মহাসমারোহে, কিন্তু সঙ্গোপনে।

এই পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে তৈরি হয়েছিল বাংলা ছবি 'সতীর দেহত্যাগ'। সতীর ভূমিকায় দীপ্তি রায়, দক্ষরাজের ভূমিকায় কমল মিত্র, শিবের চরিত্রে রাজা মুখার্জি । কমল মিত্রের কণ্ঠস্বরে দক্ষের দাপট ভীষণ ভাবে ফুটে উঠেছিল। তাঁর খলনায়ক অভিনয়ের জোরেই এই ছবি হিট করে। এছাড়াও ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্তোষ সিংহ, দিলীপ রায়, রাজলক্ষ্মী দেবী,আশা দেবী।

ছবির কাহিনি লিখেছিলেন 'মহালয়া' সম্রাট বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। সুরসংযোজনায় কালীপদ সেন। গীত রচনায় প্রণব রায় ও মোহিনী চৌধুরী।
ছবিটি পাঁচের দশকে এতখানি সাড়া ফেলেছিল যে ভক্তি ভরে জুতো খুলে সিনেমাহলে ঢুকতেন দর্শক।