১৯৭৭ সালে সাপকে তুষ্ট করার কাহিনি নিয়ে দুটি সুপারহিট বাংলা ছবি একসঙ্গে রিলিজ করেছিল। 'বাবা তারকনাথ' আর 'বেহুলা লখিন্দর'।

সুব্রতা কিন্তু মনসাকে ভ্যাম্প বানাননি । গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 5 June 2025 18:37
মনসা দেবীর পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঞ্চনা আর অবহেলার ইতিহাস। নিজের জন্ম পরিচয়ে তিনি পাননি প্রাপ্য সম্মান। এই বঞ্চনা পার করে মনসার পুজো পাওয়ার লড়াইয়ের কাহিনি নিয়েই লেখা হয় 'মনসামঙ্গলকাব্য'। আর সেই মনসার চরিত্রে বাঙালির মনে প্রথম জায়গা করে নেন যে অভিনেত্রী তিনি সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়। একেবারে জ্যান্ত মনসা যেন সুব্রতা। দুর্গা অনেকেই সাজতে পারেন কিন্তু মনসা সেজে লেজেন্ডারি হয়ে উঠতে সুব্রতাই পেরেছেন।
১৯৭৭ সালে সাপকে তুষ্ট করার কাহিনি নিয়ে দুটি সুপারহিট বাংলা ছবি একসঙ্গে রিলিজ করেছিল। 'বাবা তারকনাথ' আর 'বেহুলা লখিন্দর'। সাপকে ঘিরেই দুটি ছবি বিশাল জনপ্রিয়তা পায় সে সময়। বাংলার সমস্ত সিঙ্গল স্ক্রিনে দর্শকের ঢল নেমে গিয়েছিল। 'বাবা তারকনাথ'-এ সন্ধ্যা রায়ের অভিনয় যতখানি দর্শকের মনে দাগ কেটেছিল, ততখানি দাগ কেটেছিল 'বেহুলা লখিন্দর' ছবিতে মনসা সুব্রতা চট্টোপাধ্যায় ও বেহুলা মহুয়া রায়চৌধুরীর অভিনয়। আর দুটি ছবিই রঙিন হয়েছিল, সাদা কালো ছবির যুগে, যে কারণে দর্শক আরও উৎসাহী হয়। মিউজিক্যাল হিটেও দুটি ছবি এগিয়ে চিরকাল।

সুব্রতা কিন্তু মনসাকে ভ্যাম্প বানাননি বরং তাঁর বঞ্চনার কাহিনি ফুটিয়ে তুলে দর্শকের চোখের জল আদায় করে নেন। মনসার আর এক নাম হল 'চ্যাঙমুড়ি কানী'। মনসার উপর একবার শিব আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তখন মনসা শিবকে স্মরণ করিয়ে দেন যে তিনি শিবেরই মানসকন্যা। কিন্তু তবুও শিবের স্ত্রী চণ্ডী মনসার উপর চটে গিয়ে মনসার চোখ শিবের বিল্বপত্র দিয়ে খুঁচিয়ে কানা করে দেন। সেই থেকে মনসার এক চোখ অন্ধ। মনসার আসল নাম পদ্মাবতী হলেও তাঁকে বিদ্রুপ করে বলা হত 'চ্যাঙমুড়ি কানী'।
সুব্রতা চট্টোপাধ্যায় মনসার এক চোখ অন্ধ লুকে দুর্ধর্ষ অভিনয় করেছিলেন। দাপুটে অভিনয় সার্থক হয়েছিল চোখের অমন নিখুঁত সাজের জন্য। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয়, ১৯৭৭ সালে তখন ভারতেই কনট্যাক্ট লেন্স আসেনি। কিন্তু সুব্রতা চট্টোপাধ্যায় ঝুঁকি নিয়ে চোখের ভেতর ঘষা লেন্স পরেছিলেন। সেযুগের অভিনেত্রী হয়েও এতখানি সাহস দেখিয়েছিলেন।
সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা ঝিমলি বন্দ্যোপাধ্যায় আজ মনসা পুজোর দিনে দ্য ওয়ালকে জানালেন
'মা চোখে ঘষা লেন্স পরেছিলেন মনসা সাজতে। ঐ যুগে এখনকার মতো প্রস্থেটিক মেকআপ ছিল না। তাই ঘষা লেন্স চোখের মধ্যে পরে মা অভিনয় করেছিলেন। মা একেবারে আইকনিক হয়ে গেলেন অমন দেবীর সাজে। আমি তখন ছোট তবু মনে আছে 'বাবা তারকনাথ' আর 'বেহুলা লখিন্দর' একসঙ্গেই সব হলে চলছিল। দুটো ছবিতেই জ্যান্ত সাপ নিয়ে শ্যুট করা হয়। সত্যিকারের সাপগুলো দুটো ছবিতেই দিয়েছিলেন বিখ্যাত সর্পবিশেষজ্ঞ দীপক মিত্র। ট্রেনিং দেওয়া জ্যান্ত সাপ নিয়ে শ্যুট হয়েছিল।

মা সর্পদেবী মনসার চরিত্র করলেও জ্যান্ত সাপের সঙ্গে শ্যুটিং করতে ভীষণ ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রযোজক দীনেশ চিত্রমের দীনেশবাবু মাকে সাহস জুগিয়েছিলেন অভিনয় করতে। তারপর তো 'বেহুলা লখিন্দর' ছবি ইতিহাস। চাঁদ সওদাগর হন অভি ভট্টাচার্য, মনসা আমার মা সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়, বেহুলা মহুয়া রায়চৌধুরী, লখিন্দর নবাগত দেবাশিস, আর শিব সতীন্দ্র ভট্টাচার্য। সতীন্দ্র ভট্টাচার্যর সঙ্গে মা পেশাদার মঞ্চে অনেক নাটকও করেছিলেন। আজও যে মনসা পুজো এলে আমার মাকে দেবী মনসা বলে মানুষ মনে রাখছেন সেটাই সবথেকে বড় পাওয়া।'

তবে 'মনসামঙ্গল' অতীতেও বাংলা ছবি হয়েছিল। ১৯৩৪ সালে মুক্তি পায় 'চাঁদ সওদাগর'। অহীন্দ্র চৌধুরী চাঁদ, মনসা দেববালা।
১৯৫৪ তে 'সতী বেহুলা' ছবিতে চাঁদ সওদাগর হন ছবি বিশ্বাস। মনসা অচেনা অভিনেত্রী।
এই দুটি ছবি সেভাবে দাগ কাটতে পারেনি। সংরক্ষণও হয়নি। ১৯৭৭ সালের নাচেগানে সমৃদ্ধ 'বেহুলা লখিন্দর' রঙিন ছবিটি সবার মন জয় করে নেয়। আজও মনসা পুজো এলে টেলিভিশনে এই ছবি দেবেই।