শেষমেশ কাজল আর কাজলের বাবা সোমু মুখোপাধ্যায়ের সাহায্যে আমি দেখা পাই জয়া বচ্চনের। সে সময় করণ জোহরের 'কভি খুশি কভি গম' ছবির শ্যুটিং করছিলেন অমিতাভ বচ্চন-জয়া বচ্চন। কাজলও ছিলেন সেই ছবিতে।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 19 June 2025 19:49
বৃষ্টিস্নাত বিকেলে খবর এল বাংলা সাহিত্যের নবতিপর সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায় পাড়ি দিয়েছেন অমৃতলোকে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী যুগে প্রফুল্ল রায় সেই পরিচালক যাঁর কাহিনি নিয়ে সবথেকে বেশি বাংলা চলচ্চিত্র হয়েছে। সিরিয়ালেও হিট তাঁর লেখা 'কেয়া পাতার নৌকো'। প্রফুল্ল রায়ের কাহিনি নিয়ে 'দেশ' ছবি বানিয়েছিলেন রাজা সেন।
২০০২ সালে 'দেশ' ছবি দিয়েই বহু যুগ পর বাংলা ছবিতে কামব্যাক করেন জয়া ভাদুড়ি বচ্চন। এই ছবি অভিষেক বচ্চনের ডেবিউ বাংলা ছবিও,যা অনেকেই জানেন না। প্রফুল্ল রায়ের প্রয়াণ দিনে স্মৃতিচারণে অতীতের সোনালি গল্প 'দ্য ওয়াল' এ ভাগ করে নিলেন পরিচালক রাজা সেন।

প্রফুল্ল রায়ের সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আজ প্রফুল্লবাবুর চলে যাবার খবর আপনার থেকেই প্রথম পেলাম। থমকে গেলাম। আমাদের খুব প্রিয় সাহিত্যিক। আমি তখন যাদবপুরে থাকতাম, আর উনি ঢাকুরিয়ায় ছিলেন। মাঝেমধ্যেই যেতাম খুব গল্প হত। অত বড় সাহিত্যিক হয়েও খুব সরল, সুন্দর মানুষ ছিলেন। খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। ওঁনার স্ত্রীর সঙ্গেও ভাল আলাপ ছিল। পরবর্তীকালে উনি রানিকুঠির ঐ দিকটায় চলে যান। সেখানেও আমি গেছি। প্রফুল্ল রায়ের কাহিনি নিয়ে আমি দুটো ছবি করেছিলাম 'দেশ' আর 'খাঁচা'। উত্তরবঙ্গে অস্ত্র পাচারের প্রেক্ষাপটে প্রফুল্ল রায়ের গল্প নিয়ে 'দেশ' ছবিটা বানিয়েছিলাম। চিত্রনাট্য লেখার সময় উনি আমাদের সঙ্গে বসতেন, নানা রকম সাজেশন দিতেন। সে এক দারুণ শেখা । সবথেকে বড় কথা কপিরাইটের জন্য উনি খুব সাধারণ পয়সাকড়ি নিতেন। ছবিটা হোক উনি চাইতেন। কপিরাইটের প্রচুর দর কখনও হাঁকেননি। 'দেশ' ছবিতে এতদিন পর জয়া বচ্চন অভিনয় করছেন শুনে উনি খুব খুশি হয়েছিলেন। ছবি রিলিজের সময় প্রিমিয়ার শোতেও উনি এসেছিলেন। 'খাঁচা' ছবিতে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে নিলে ভাল হয় সেটা প্রফুল্ল রায়ই সাজেস্ট করেছিলেন।
'ধন্যি মেয়ে' জয়া বচ্চনকে এত যুগ পর বাংলা ছবি করাতে রাজি করালেন কী ভাবে?
খুব নাটকীয় ভাবে সেটা ঘটেছিল। যেহেতু 'দেশ' নায়িকা প্রধান গল্প সেরকম একজন অভিনেত্রী আমি খুঁজছিলাম। আর জয়া বচ্চনের মতো অভিনেত্রীর প্রতি আমার দুর্বলতা ছিলই। কিন্তু অনেক অ্যাপয়নমেন্ট করেও আমি ওঁনাকে পাচ্ছিলাম না। শেষমেশ কাজল আর কাজলের বাবা সোমু মুখোপাধ্যায়ের সাহায্যে আমি দেখা পাই জয়া বচ্চনের। সে সময় করণ জোহরের 'কভি খুশি কভি গম' ছবির শ্যুটিং করছিলেন অমিতাভ বচ্চন-জয়া বচ্চন। কাজলও ছিলেন সেই ছবিতে। কাজল খবর দেন , ,উনি বলেছেন ,রাজা সেনকে এই ছবির সেটে এসে জয়া বচ্চনের সঙ্গে দেখা করতে। তনুজার স্বামী সোমু মুখোপাধ্যায়ের সাহচর্য তো ছিলই। তখন আমি ফিল্মিস্তান স্টুডিওতে চলে যাই।

একটা ক্যান্টিনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। জয়া বচ্চন শ্যুটিং ব্রেকে বেরিয়েছেন যখন তখন আমি সোজা গিয়ে ওঁকে বলি আমি কলকাতার পরিচালক, আপনাকে নিয়ে আবার বাংলা ছবি করতে চাই। প্রফুল্ল রায়ের গল্প। জয়া বচ্চন বললেন আমার নম্বর নিন, ফোনে কথা বলে নেব। আমি তখন বলেছিলাম, এই নম্বরে তো আপনি ফোন ধরবেন না। আদৌ আমার আর কথা হবে না। তখন উনি হেসে ফেলে বলেন এই আমার সেক্রেটারির নাম ওকে বললেই আপনাকে আমার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবে। আমি ওঁর বাড়িতে গিয়ে চিত্রনাট্য শোনালাম উনি রাজি হলেন। কিন্তু বললেন আমার সময় ছাড়া তো ডেট দিতে পারব না। আমি বললাম তাই দিন। আপনার ডেট অনুযায়ী শ্যুটিং করব। এরপর তো উত্তরবঙ্গতে এসে উনি শ্যুটিং করেছিলেন। জয়া বচ্চন থেকে উনি আমার জয়াদি হয়ে গেলেন। কত কম পারিশ্রমিকে জয়া বচ্চন কাজ করেছিলেন। ওঁর এই রূপগুলো এখনকার মানুষ কিন্তু জানেন না।

এই 'দেশ' ছবিতে আপনার হাত ধরেই তো প্রথম বাংলা ছবিতে অভিষেক হয় অমিতাভ-জয়া তনয় অভিষেক বচ্চনের?
হ্যাঁ সত্যি, সেটাও জয়াদির জন্যই সম্ভব হয়েছিল। তখন হিন্দিতে সবেসবে 'রিফিউজি' ছবিতে ডেবিউ করেছেন অভিষেক। উত্তরবঙ্গ থেকেই জয়াদি অভিষেককে ফোন করে বলেন 'রাজার ছবিতে এখানে কাজ করে খুব ভাল লাগছে। এই বাংলা ছবিতে আমার ছেলের চরিত্রেই একটা ছোট রোল আছে। তুই যদি উত্তরবঙ্গে এসে আমার ছেলের চরিত্রেই অভিনয় করিস তাহলে খুব ভাল হয়। বাংলা ছবিতেও তোর কাজ করা হবে।'
জয়াদির আবদারে পুত্র অভিষেক তিনদিনের জন্য এসে আমাদের সঙ্গে উত্তরবঙ্গে শ্যুটিং করে গিয়েছিলেন। সত্যি আমি ভাবিওনি অমিতাভ বচ্চনের মতো স্টারের ছেলে, মা জয়া বচ্চনের কথায় আমার ছবিতে কাজ করতে চলে আসবে।'
'দেশ' ছবিতে সব্যসাচী চক্রবর্তী, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতারাও অভিনয় করেছিলেন। ঋতুপর্ণ ঘোষের 'অন্তরমহল' ছবিতে অভিষেক বচ্চনের নাম হয়তো বেশি চর্চিত হয়। কিন্তু অভিষেকের প্রথম বাংলা ছবি কিন্তু রাজা সেনের 'দেশ' ছবি দিয়েই। প্রফুল্ল রায়ের গল্পের এত জোর ছিল যে কারণে জয়া বচ্চনের মতো খুঁতখুঁতে মানুষও 'দেশ' ছবি করতে এক কথায় রাজি হয়ে যান। আর তারপর তো ইতিহাস।