অফার এল বিক্রম চরিত্রে। গল্পে মমতা শঙ্করের পালিত পুত্র এবং রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের নিজের সন্তান ছিল বিক্রম। যার বাবার চরিত্রে সন্তু কাকু।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 19 June 2025 18:39
'আজকাল পরশু একদিন
সময়ের সমুদ্রে মিশে যায়
ইঁট-কাঠ-পাথরের পাঁজরে ইতিহাস ফিসফিস কথা কয়
দিন বদলায় রং বদলায়
মন তবু খোঁজে
জন্মভূমি.... '
সন্ধে সাড়ে ছ'টা বাজলেই প্রতি ঘরে ঘরে টেলিভিশনে বেজে উঠত 'জন্মভূমি' ধারাবাহিকের এই টাইটেল গান। ইন্দর সেনের পরিচালনায় এই সিরিয়ালেই অভিনয় করে প্রথম জনপ্রিয়তা পান অভিনেতা ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়। নবাগত অভিনেতার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন কিংবদন্তি পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। শতবর্ষ পার করা পরিচালকের জন্মদিনে সেই সময়ের কথা 'দ্য ওয়াল' আড্ডায় ভাগ করে নিলেন ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়।

'অগ্নীশ্বর', 'ধন্যি মেয়ে','মৌচাক','নিশিপদ্ম' একাধিক কালজয়ী ছবির পরিচালক ছিলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়,যাঁকে ঢুলুবাবু বলে ডাকা হত। সেই পরিচালকের ফোন পেয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ভাস্বর, মুগ্ধতার সেই রেশ এত বছর পরও থেকে গেছে ,ভোলেননি অভিনেতা।
ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় ইন্ডাস্ট্রির ঢুলুবাবুর জন্মদিনে দ্য ওয়ালকে জানালেন 'আমি যখন জন্মভূমি শুরু করি সেটা হচ্ছে ২০০২ সাল। আমি ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলাম ১৯৯৮ সালে। 'জন্মভূমি'র আগে রাজকুমার সন্তোষীর 'দ্য লেজেন্ড অফ ভগত সিং' করেছি ২০০১ এ। ২০০২ তে রিলিজ করে ভগত সিং। জন্মভূমিতে তখন গল্পে নতুন প্রজন্ম আসছিল। তার আগে তো সন্তু মুখোপাধ্যায়, মমতা শঙ্কর, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের ট্র্যাকটা চলছিল। আমি কিন্তু সেই সময় থেকেই বহুবার 'জন্মভূমি' সিরিয়ালে অভিনয়ের জন্য অডিশন দিয়েছিলাম। অডিশনে দেখা হত কতখানি মুখস্থ ডায়লগ বলতে পারছি সেইটা। আমার যেহেতু সাংঘাতিক মুখস্থ ক্ষমতা তাই কোনও বারই ফেল করতাম না। কিন্তু কাস্টিং আমার হতো না। কখনও আমি শুনতাম বড্ড রোগা, কখনও শুনতাম বয়সের তুলনায় ছোট লাগছে। কিন্তু কোনও ছোট রোলেও সুযোগ পেতাম না। তারপর যখন বম্বেতে ভগত সিং করে এলাম। তখন আমার দর বাড়ল বাংলায়। অফার এল বিক্রম চরিত্রে। গল্পে মমতা শঙ্করের পালিত পুত্র এবং রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের নিজের সন্তান ছিল বিক্রম। যার বাবার চরিত্রে সন্তু কাকু।'

সন্তু মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রের নাম ছিল রতিকান্ত চৌধুরী, ময়নাগড়ের জমিদার। তাঁর বড় বউ পদ্মাবতীর রোলে মমতা শঙ্কর আর এদিকে রতিকান্তর মন বাঁধা পড়েছে পিয়ারি বাঈ রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের আঁচলে। জমিদার কন্যা পদ্মাবতী তাই নিজের সংসার ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যান। পিয়ারি-রতিকান্তর অবৈধ সন্তান বিক্রমকে পালিত পুত্র রূপে মানুষ করেন পদ্মাবতী মমতা। এই বিক্রমের চরিত্রে ভাস্বর অভিনয় করে পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রতিটি ঘরে-ঘরে।
ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে বললেন 'যেদিন প্রথম সম্প্রচারিত হয় আমার পর্ব তার পরদিন আমি বাসে করে শ্যুটিংয়ে যাব তাই বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি । তখন আমার গাড়ি ছিল না। আমি লক্ষ করেছিলাম 'জন্মভূমি' কী জিনিস। হেন লোক ছিল না যে আমায় চেনেনি। সবাই 'বিক্রম' 'বিক্রম' বলে ছুটে আসছে, হাত মেলাচ্ছে। তো 'জন্মভূমি' চলাকালীন তো আমি তরুণ মজুমদারের 'আলো' ছবি করেছিলাম। তখন তো আর মোবাইল ছিল না কারও। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রশ্নই নেই। যা ছিল ল্যান্ডলাইন ফোন। আমাদের 'জন্মভূমি'র শ্যুটিং ফ্লোরের অফিসেও একটা ল্যান্ডলাইন ফোন ছিল। সেখানে একটা ফোন আসে। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এক ভদ্রলোক। তাঁর নাম রাজীব ব্যানার্জ। আমার এখনও মনে আছে তিনি আমাকে বললেন 'পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাইছেন! উনি থাকেন টালিগঞ্জেই টেকনিশিয়ান স্টুডিওর পাশে।'
আমি তো অবাক! অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় কেন আমায় ডাকবেন!'

তারপর কী ঘটল ভাস্বরের সঙ্গে? অভিনেতা দ্য ওয়াল আড্ডায় জানালেন 'আমার এখনও মনে আছে যে উনি একটা খাটে বসেছিলেন। বোধহয় সময়টা শীতকাল ছিল, ওঁর গায়ে চাদর জড়ানো ছিল। আমি গেলাম প্রণাম করলাম এবং উনি আমাকে ভীষণ আদর করে বললেন ' 'জন্মভূমি' দেখছি তুমি বিক্রম চরিত্র ভীষণ ভাল করছ। আমি তোমায় আশীর্বাদ করছি অনেক বড় হউ। তোমার ভাল হোক।'
তখন তো এত ক্যামেরা মোবাইল ছিল না যে পটাপট ছবি তুলে নেব! এখন মনে হয় অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার একটা ছবি থাকলে কী না ভাল হত! সেটা আমার কাছে ঐশ্বরিক আশীর্বাদ হয়ে থাকত।

তবে ঐ টুকু সাক্ষাৎ আমার জীবনে সারা জীবন মনে থাকবে। ওঁর বাড়িতে ১০ মিনিট ছিলাম কিন্তু আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, যে মানুষটা 'ধন্যি মেয়ে', 'মৌচাক' বানিয়েছেন তিনি আমার কাজের প্রশংসা করছেন।বেশ কিছু বছর পরে, যখন ইটিভি বাংলায় 'অতি উত্তম' সিরিজ হত। সেখানে 'মৌচাক' ছবির রিমেক টেলিফিল্মে আমি রঞ্জিত মল্লিকের রোলটায় অভিনয় করেছিলাম। আমার দাদা উত্তমকুমার চরিত্রে ছিলেন কুণাল মিত্র। আমার সেই কাজও শুনেছিলাম উনি দেখেছিলেন। যা বড় প্রাপ্তি।'