বহুযুগ আর দেখার উপায় নেই ' অসময়'। সত্তর দশকের শেষভাগের ছবি, খুব বেশিদিনের কথা নয়। তাহলে কেন এমন একটি বিখ্যাত আলোচিত প্রশংসিত ছবি লুপ্ত হয়ে গেল?

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 22 June 2025 17:52
বাংলা সাহিত্যে এক অসামান্য সৃৃষ্টি বিমল করের 'অসময়' ৷ বিমল কর 'অসময়' উপন্যাসের জন্য ১৯৭৫ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। যে উপন্যাস সেসময় সাড়া ফেলে দেয়। ১৯৭৬ সালে বিমল করের ' অসময়' উপন্যাস নিয়ে একই নামে ছবি তৈরি করেন পরিচালক ইন্দর সেন। অপর্ণা সেন-স্বরূপ দত্ত অভিনীত সেই 'অসময়' ছবি আজও বাংলা ছবির ইতিহাসে মাইলফলক। যেমন ছবির কাহিনি, তেমন পরিচালনা এবং বক্সঅফিস ও পুরস্কারেও ছবিটি সমৃদ্ধ হয়েছিল। অথচ 'অসময়' ছবি আজ বিস্মৃতির আড়ালে। এ প্রজন্ম দেখার সুযোগ পায়নি এই ছবি। আর কি কখনও দেখা যাবে বিমল করের উপন্যাসের এমন সার্থক চলচ্চিত্রায়ণ?
আজ অভিনেতা স্বরূপ দত্তর জন্মদিন। 'অসময়' ছবিতে তিনিই ছিলেন নায়ক এবং প্রযোজক।

পরিচালক ইন্দর সেন দ্য ওয়ালকে জানালেন 'অসময়' উপন্যাসটা পড়ে তো খুব ভাল লেগেছিল। তারপর আমি বিমল করের সঙ্গে দেখা করি ওঁর কর্মস্থলে একটি সংবাদপত্রের অফিসে। ওঁকে যখন বলি আপনার লেখা এই উপন্যাস নিয়ে ছবি করতে চাই সেটা শুনে উনি খুব খুশি হয়েছিলেন। তারপর আমি বিমল কর মহাশয়ের সল্টলেকের বাড়িতেও গিয়েছিলাম কথাবার্তা বলতে। ছবি করার অনুমতি দিলেন উনি। শ্যুটিং শুরু করলাম অপর্ণা সেন, অনিল চ্যাটার্জি, স্বরূপ দত্ত সবাইকে নিয়ে। 'অসময়'-এর প্রিমিয়ারে বিমল কর-কে ছবি দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। উনি এসেওছিলেন এবং ছবি দেখে ওঁর খুব ভাল লেগেছে সেটা জানিয়েওছিলেন আমায়। সাহিত্য আর ছবিতে তফাত খুব একটা ছিলনা আর যেটুকু পরিবর্তন দরকার সেটা নিয়ে ওঁর কোনও আপত্তি ছিলনা। বিমল কর শুধু ভাল সাহিত্যিকই নন, খুব খোলা মনের মানুষ ছিলেন।" 'অসময়' ছবিতে কাস্টিং হয়েছিল উপন্যাস ধরেই। মোহিনী অপর্ণা সেন, জ্যাঠামশাই অনিল চট্টোপাধ্যায়, অবিন স্বরূপ দত্ত, শচীপতি দীপঙ্কর দে, আয়না মহুয়া রায়চৌধুরী, সুহাস কল্যাণ চ্যাটার্জি এছাড়াও ছিলেন পার্থ মুখোপাধ্যায়, কণিকা মজুমদার, চিন্ময় রায় প্রমুখ। সংগীত পরিচালনা আনন্দ শংকর। ছবিতে ব্যবহার হয়েছিল বেশ ক'টি নজরুলগীতি ও দ্বিজেন্দ্রগীতি। কন্ঠশিল্পী মান্না দে, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, শিপ্রা বসু, অনুপ ঘোষাল ও স্বকন্ঠে চিন্ময় রায়। প্রতিমার গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।'
বিএফজেএ সহ তৎকালীন বিভিন্ন পুরস্কারে ছবিটি বিবিধ বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছিল। অপর্ণা সেনও পেয়েছিলেন পুরস্কার অভিনেত্রী রূপে যতটা মনে করতে পারলেন পরিচালক।

তবে বহুযুগ আর দেখার উপায় নেই ' অসময়'। সত্তর দশকের শেষভাগের ছবি, খুব বেশিদিনের কথা নয়। তাহলে কেন এমন একটি বিখ্যাত আলোচিত প্রশংসিত ছবি লুপ্ত হয়ে গেল?
পরিচালক ইন্দর সেন সব রহস্যের পর্দা উন্মোচন করে দিয়ে বললেন, "আসল ঘটনাটা হল ছবিটার প্রোডিউসার ছিলেন স্বরূপ দত্ত। ইউকো ব্যাঙ্কের থেকে লোন নিয়ে ছবিটা করা হয়েছিল। ইউকো ব্যাঙ্ক গাড়ি, বাসের জন্য যেভাবে লোন দিত সিনেমা বানানোর জন্য সেভাবেই লোন দিত। পরে শুনেছিলাম উনি সেই টাকাটা শোধ করতে পারেননি। তাই ইউকো ব্যাঙ্ক ছবিটা বাজেয়াপ্ত করে নেয়। সেই কারণেই ছবিটার আর কোনও কপি নেই। প্রযোজক স্বরূপ দত্ত টাকা পরেও আর দিতে পারেননি। এবার আমার পক্ষেও অত টাকা দেওয়া সম্ভব ছিলনা। দূরদর্শনে একবার দেখিয়েছিল ছবিটা ১৯৭৮ সালে। ওদের কাছে যদি কপি থাকে কোনও খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। যদিও থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
আরেকটা সম্ভাবনা আছে। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভারতবর্ষে যত ছবি হয় সবার একটা করে প্রিন্ট পাঠানো হয়। এখন মনে নেই পাঠিয়েছিল কিনা 'অসময়'-এর প্রিন্ট। পুনেতে খোঁজ করলে পেলেও পাওয়া যেতে পারে। ছবির প্রিন্ট পরিচালকদের কাছে থাকে না। প্রযোজকদের ব্যাপার বেশিরভাগ। তো কপি বাজেয়াপ্ত হবার কারণেই মূলত ছবিটা দেখার সুযোগ নেই বললেই চলে। আমার পরিচালিত অনেক ছবি হারিয়ে গেছে, তাই লোকে আমাকে আজকাল 'জন্মভূমি' সিরিয়ালের পরিচালক বলেই চেনে! এটা যেমন ভালো লাগার, তেমন আফসোসও।"

বিমল করের কাহিনি অবলম্বনে 'বসন্ত বিলাপ' ও 'যদুবংশ' ছবির নায়িকাও অপর্ণা সেন। সে দুটি ছবি যদিও পাওয়া যায়। অপর্ণা সেনও তাঁর হারিয়ে যাওয়া ছবিগুলি নিয়ে হতাশ। দূরদর্শনের অবহেলায় হারিয়ে গেছে অপর্ণা সেন পরিচালিত 'পিকনিক' টেলিফিল্ম। যারা সত্তর দশকে দেখেছেন 'অসময়' ছবিটি তাঁদের চোখে আজও লেগে আছে অপর্ণা সেনের মোহিনীমায়া।
প্রয়াত স্বরূপ দত্তর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হলেও তিনিও অন্ধকারে রয়েছেন 'অসময়' ছবির প্রিন্ট সম্পর্কে।