'খুকুর মতো শক্ত চরিত্র করতে আমার সুবিধে হয়েছিল কারণ আমার ঐরকম একজন নিজের পিসি ছিলেন। তাঁকে আমি ছোট থেকেই দেখেছি।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 22 June 2025 14:36
গতকাল ২১ জুন বিশ্ব সঙ্গীত দিবসের দিনেই প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী জয়শ্রী দাশগুপ্ত। মডার্ন হাই স্কুলে বিখ্যাত অভিনেত্রী অপর্ণা সেনের সহপাঠী ছিলেন জয়শ্রী। দু'জনের বন্ধুত্ব ছোট্টবেলা থেকে শেষদিন অবধি অব্যাহত থাকল। সত্যি তাঁরা হাত ধরেছিলেন চিরদিন বন্ধু হয়ে থাকবেন বলেই। রবীন্দ্রনাথের গানে জয়শ্রীর দখল শুরু থেকেই ছিল। প্রাণের বন্ধু রিনার হাত ধরেই জয়শ্রী লাইম লাইটে চলে আসেন ২০০০ সালে। অপর্ণা সেনের 'পারমিতার একদিন' ছবিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'হৃদয় আমার প্রকাশ হল' গানটিকে শুধুমাত্র একটি তানপুরা সহযোগে গেয়ে, জয়শ্রী দাশগুপ্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অন্য উচ্চতায়। গানটি ছিল নবাগতা অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্তর লিপে। 'পারমিতার একদিন' ছবির থেকে শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (রজত কমল) লাভ করেন জয়শ্রী। অন্যদিকে পর্দায় প্রথম অভিনয় করেই সোহিনী পান শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার। এরপরেই ঋতুপর্ণ ঘোষের 'তিতলি' ছবিতে অপর্ণা সেনের লিপে 'চোখের জলের লাগল জোয়ার' জয়শ্রীর কণ্ঠে সমাদৃত হয়েছিল। 'দ্য ওয়াল'-এ জয়শ্রী দাশগুপ্তর স্মৃতিচারণায় 'পারমিতার একদিন' ছবির 'খুকু' সোহিনী সেনগুপ্ত।

সোহিনী বললেন 'খুব কষ্ট হল শুনে। এত নীরবে হঠাৎ করে উনি চলে গেলেন। অপর্ণা সেন, সোহাগ সেন আর জয়শ্রী দাশগুপ্ত তিনজনেই খুব বন্ধু ছিলেন। তখন মঞ্চে আমি অভিনয় করলেও, আমার প্রথম সিনেমায় আসা অপর্ণা সেনের হাত ধরেই। আমার রিনা মাসি। পারমিতার একদিনের খুকু। রিনা মাসির সূত্রেই জয়শ্রী দাশগুপ্তর সঙ্গে আলাপ হয়। আমি কিন্তু শুধু গানটায় লিপ দিইনি। জয়শ্রী দাশগুপ্তর বাড়ি আমি 'হৃদয় আমার প্রকাশ হল' গানটা শিখতে যেতাম। রিনা মাসিই আমায় পাঠাতেন শিখতে। আমি নিজের গলায় গানটা তুলে গাইতাম। ক্যামেরায় কিন্তু গলা দেখলে বোঝা যায় অভিনেত্রী নিজে গানটা গাইছেন, নাকি শুধু লিপে মুখ নাড়াচ্ছেন। বাস্তব করতে গানটা আমি নিজের কণ্ঠে গাইতাম। জয়শ্রীদি যেভাবে গেয়েছিলেন আমিও সেই ভাবেই গানটা গাইতে তুলেছিলাম। উনি খুব ভালবেসে আমায় শিখিয়েছিলেন। তারপর তো গানটা ছবিতে শুনে প্রতিটি দর্শক খুব প্রশংসা করেছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন যে গানটা আমি নিজেই গেয়েছি। কিন্তু সেটা নয়। গানটা জয়শ্রী দির গাওয়া। গানটার দৃশ্যটাই বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আইকনিক হয়ে আছে।'
বিশেষ ভাবে সক্ষম এক মেয়ের চরিত্র ছিল 'খুকু'। এমন কত মেয়েই তো ঘরে ঘরে থাকে। তাঁদের মায়েদের কী কষ্ট, কী যন্ত্রণা জীবনভর ভোগ করতে হয়, তা অপর্ণা সেন সনকা চরিত্রে তুলে ধরেছিলেন। ডাউন সিনড্রোমে ভোগা খুকুদের নীরব কান্না উঠে আসে সোহিনী সেনগুপ্তর বিরল অভিনয়ে।
সোহিনী সেনগুপ্ত বলেন 'খুকুর মতো শক্ত চরিত্র করতে আমার সুবিধে হয়েছিল কারণ আমার ঐরকম একজন নিজের পিসি ছিলেন। তাঁকে আমি ছোট থেকেই দেখেছি। যিনি গান গাইবার সময় একদম স্বাভাবিক থাকতেন। ঠিক সেটাই আমি করেছিলাম ছবিতে। আর রিনা মাসি আমাকে বলেই দিয়েছিলেন, এদের এমন এক একটা সুপ্ত গুণ খুব সহজাত ভাবেই থাকে। যেখানে তারা অক্ষম হয় না। খুকুও অজান্তেই অত ভাল গাইত। রিনা মাসি নিজেও খুব ভাল লিপ দিতে পারতেন। এই রবীন্দ্রসংগীতে লিপ দেওয়া রিনা মাসি আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। '
সোহিনী একটু নস্টালজিক হয়ে বললেন 'আমার এখনও মনে আছে শটটা। স্থির হয়ে রিনা মাসি আমাকে গাইতে বলেছিলেন গানটা। সেই প্রথম আমি শ্যুটিংয়ের অত জোরালো আলোর সামনে বসেছিলাম। আমার মুখে ডানদিকটা জোরালো আলো পড়ে প্রচন্ড জ্বালা করছিল। কিন্তু আমি এতটাই বিভর ছিলাম, সেসব কিছু বাধা হয়ে দাঁড়াইনি। জানলার পাশে বসে তানপুরা নিয়ে শটটা দিয়েছিলাম। ঐ অভিজ্ঞতাটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। বিউটিফুল আর্টিস্টিক এক্সপেরিয়েন্স।'
'তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়' গানটিও জয়শ্রী দাশগুপ্তর কণ্ঠে এই ছবিতে ব্যবহার করেন অপর্ণা সেন। যখন পারমিতা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত দ্বিতীয় বিবাহ করে শাশুড়ি সনকাকে ছেড়ে, শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তখন এই গানটি ব্যবহার করা হয়। খুকুর কোলে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদছেন সনকা। বৌমা হারানো নয় সনকা পারমিতার প্রস্থানে বন্ধুও হারালো। সোহিনী বললেন ' 'তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়', 'বিপুল তরঙ্গ রে' ছবির সব কটা গানই আমি জয়শ্রীদির কাছে শিখেছিলাম। আমার ওঁর কাছে গানগুলো শিখতে ভাল লাগছিল বলেই সব কটাই শিখে নিই। অনেকদিন ধরেই উনি আমাকে গান শিখিয়েছিলেন। উনি এত ভাল গাইতেন, যা অসাধারণ। গান তো শুধু ব্যাকরণ মেনেই হয় না। মনটাও লাগে। জয়শ্রীদির গানে সেই ভাবটা অসাধারণ ছিল। আর অপর্ণা সেনের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় আমার বড় প্রাপ্তি। রিনা মাসির প্রতি সেই মাতৃস্থানিয় ভালবাসাটা আমার আজও রয়ে গেছে।'
২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'পারমিতার একদিন' আজ ২৫ টি বসন্ত পেরিয়েও দর্শকমনে একই রকমের মাস্টারপিস ছবি হয়ে আছে। এখানেই অপর্ণা ম্যাজিক।
