কলকাতায় রুপোর দামে বড় উল্লম্ফন, এক কেজি পৌঁছল ২.৬৫ লক্ষ টাকায়। কেন বাড়ছে রুপোর দাম, বাজারের প্রভাব, বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ জানুন বিস্তারিত প্রতিবেদনে।

শেষ আপডেট: 24 February 2026 12:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো : কলকাতায় আজ রুপোর দামে এক বিশাল চমক দেখা গেছে। এক ধাক্কায় এক কেজি রুপোর দাম ২.৬৫ লক্ষ টাকায় পৌঁছে গিয়েছে, যা সাধারণ মানুষ এবং বিনিয়োগকারী—উভয়কেই বিস্মিত করেছে। গত কয়েকদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে রূপার মূল্য ঊর্ধ্বমুখী ছিল, কিন্তু আজকের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন উৎসবের মরসুমের আগে নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে।
কলকাতায় রুপোর দামে নতুন রেকর্ড
আজকের দিনে কলকাতায় রুপোর দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছে এক চমকপ্রদ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। প্রতি কেজি রুপোর দর ২.৬৫ লক্ষ টাকা ছুঁয়েছে, যা অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। গত কয়েকদিন ধরেই এই মূল্যবান ধাতুর দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, তবে আজকের এই বৃদ্ধি বাজারের পূর্ববর্তী সমস্ত হিসাব-নিকাশ কার্যত বদলে দিয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কলকাতায় প্রতি কেজি রুপোর বাটের দাম ছিল ২,৬২,৮৫০ টাকা এবং খুচরো রুপোর প্রতি কেজির দাম ছিল ২,৬২,৯৫০ টাকা। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ খুচরো রুপোর দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২,৬৫,৪০০ টাকা প্রতি কেজি। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এই দর ২,৬৮,৯৭০ টাকাতেও পৌঁছে গেছে। এই অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ ক্রেতা উভয়কেই বিস্মিত করেছে।
গত কয়েকদিনে রুপোর দামে উল্লেখযোগ্য উত্থান স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে। একদিকে যখন সোনার দাম প্রায় প্রতি দশ গ্রামে দেড় লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে গেছে, তখন রুপোর এই রেকর্ড বৃদ্ধি বাজারের সামগ্রিক গতিপথকে আরও জটিল করে তুলেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু কলকাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাই-সহ দেশের অন্যান্য প্রধান শহরগুলিতেও রুপার দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। খুচরো ও পাইকারি—উভয় বাজারেই এই ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা দৈনন্দিন কেনাকাটা থেকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণ আজকের রূপার দামের এই উত্থানের পেছনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
কেন বাড়ছে আজকের রুপোর দাম?
আজকের রুপোর দামের লাগামছাড়া বৃদ্ধির পেছনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, শিল্পক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং বিনিয়োগকারীদের মনোভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা:
বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যেমন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সোনা ও রুপার মতো মূল্যবান ধাতুকে ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শেয়ারবাজার বা অন্যান্য বিনিয়োগ ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই তাদের মূলধন নিরাপদ ধাতুর দিকে সরিয়ে আনেন। পাশাপাশি মার্কিন ডলারের দুর্বলতাও মূল্যবান ধাতুর দাম বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
শিল্পক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চাহিদা:
রুপা কেবল গহনা তৈরির ধাতু নয়, শিল্পক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV), ইলেকট্রনিক্স এবং চিকিৎসা সরঞ্জামসহ আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পে রুপার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। রুপা সোনা ও তামার তুলনায় উন্নত বিদ্যুৎ পরিবাহিতা সম্পন্ন হওয়ায় এই শিল্পগুলির জন্য এটি অপরিহার্য উপাদান। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রুপার ব্যবহারও বাড়ছে, যা এর দামের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি:
সোনার দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর ফলে অনেক বিনিয়োগকারী এখন রুপোকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে দেখছেন। যারা সোনার মতো উচ্চমূল্যের ধাতুতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে পারছেন না, তারা রুপার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে রুপার ইটিএফ (ETF) এবং অন্যান্য ডিজিটাল বিনিয়োগ মাধ্যমেও চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরবরাহের ঘাটতি:
কিছু রিপোর্টে রুপার সরবরাহে ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, খনি থেকে উত্তোলনে সমস্যা এবং মজুত কমে যাওয়ার কারণে ভৌত বাজারে শক্তিশালী চাহিদা বজায় থাকছে, যা দামের ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উৎসব ও বিয়ের মরসুমের প্রভাব:
ভারতের মতো দেশে উৎসব ও বিয়ের মরসুমে সোনা ও রুপার ভৌত চাহিদা ঐতিহ্যগতভাবেই বেড়ে যায়। এই সময়ে গহনা, উপহার ও ধর্মীয় ব্যবহারের জন্য রুপার চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা বাজারে দামের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
সাধারণ মানুষ ও গহনা ব্যবসায়ীদের উপর প্রভাব
আজকের রুপোর দামের এই তীব্র উল্লম্ফন সাধারণ মানুষ এবং গহনা ব্যবসায়ী উভয়ের উপরই গভীর প্রভাব ফেলছে।
সাধারণ ক্রেতাদের উপর চাপ:
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিয়ের মরসুম বা বিভিন্ন শুভ অনুষ্ঠানে গহনা কেনার পরিকল্পনা থাকলে, বর্তমান উচ্চ দাম তাদের বাজেটকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। অনেকেই রুপার গহনা কেনা আপাতত পিছিয়ে দিচ্ছেন অথবা কম ওজনের গহনার দিকে ঝুঁকছেন।
গহনা শিল্পের চ্যালেঞ্জ:
গহনা ব্যবসায়ীরাও এই পরিস্থিতিতে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। রুপার দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে চূড়ান্ত পণ্যের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর জেরে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কলকাতার বহু গহনা বিক্রেতা ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং নতুন ডিজাইন বা বিকল্প ধাতুর দিকে নজর দিচ্ছেন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
যারা আগে থেকেই রুপাতে বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের জন্য বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে লাভজনক। গত দুই দশকে রুপার দর প্রায় ১৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে নতুন বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। স্বল্পমেয়াদে দামের অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে, তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বিনিয়োগ করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতামত ও ভবিষ্যৎ প্রবণতা
বাজার বিশেষজ্ঞরা রুপোর দামের বর্তমান প্রবণতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং শিল্পক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চাহিদা রুপোর দামকে উচ্চস্তরে ধরে রাখতে সহায়তা করবে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের বিশ্বাস, যদি বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস পায়, তাহলে সোনা ও রূপার মতো নিরাপদ আশ্রয়স্থল ধাতুর অনুমানভিত্তিক চাহিদা কিছুটা কমতে পারে, যা দামের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবুও গয়না শিল্প, শিল্পক্ষেত্রের ব্যবহার (বিশেষত রূপা) এবং বার ও কয়েনের মতো ভৌত বিনিয়োগের চাহিদা দামের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রুপার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করবে বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারের সিদ্ধান্ত এবং সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর। কেউ কেউ আগামী ২-৩ মাসে রুপার দামে আরও ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বললেও, অনেকে আবার সম্ভাব্য মূল্য সংশোধনের কথাও সতর্কতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জানিয়েছেন যে সরকার সোনা ও রুপার দামের উপর নজর রাখছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি মূলত মরসুমি এবং পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তা সত্ত্বেও, রুপোর সরবরাহ সীমাবদ্ধতা এবং শিল্পক্ষেত্রে এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে দামের পক্ষে শক্তিশালী সমর্থন জোগাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রুপো এমন একটি সম্পদ যা ধীরে ধীরে সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে, যেখানে ধৈর্য ধরে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদী ওঠানামা চলতে থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে রুপার শক্তিশালী স্তর ধরে রাখার সম্ভাবনা যথেষ্ট রয়েছে।