বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অবিকল মিলে যাচ্ছে ২০০৯–২০১১ সালের আর্থিক মন্দা-পরবর্তী রুপোর দৌড় এবং ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে হান্ট ব্রাদার্সের রূপো দখলের কাহিনির সঙ্গে।

ফাইল ছবি।
শেষ আপডেট: 24 December 2025 15:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আন্তর্জাতিক বাজারে রুপোর দামে যে উল্কা-গতির উত্থান চলছে, তাকে আর সাধারণ ঊর্ধ্বগতি বলা যাচ্ছে না। চলতি বছরে রূপোর দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, আর ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ! বড়দিন বা ক্রিসমাসের আগে রুপো পৌঁছেছে ৭২ ডলারে। রুপোর এই উল্কা উত্থান দেখে অতীতের দুটি বড় বিপর্যয়ের কথা মনে করাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অবিকল মিলে যাচ্ছে ২০০৯–২০১১ সালের আর্থিক মন্দা-পরবর্তী রুপোর দৌড় এবং ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে হান্ট ব্রাদার্সের রূপো দখলের কাহিনির সঙ্গে। প্রশ্ন উঠছে, এ বারও কি পতন অনিবার্য?
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয়ের পর মার্কিন ফেড সুদ নামিয়ে আনে শূন্যের কাছাকাছি। শুরু হয় কিউই (QE), বিপুল আর্থিক ত্রাণ। ফলে বাস্তব সুদের হার নেমে যায় ঋণাত্মকে। ঠিক তখনই রুপোর দাম দু’বছরে লাফিয়ে ওঠে ৮.৫০ ডলার থেকে ৫০ ডলারে—প্রায় ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটে।
এই সময়ে—বাস্তব সুদের হার কমা, ডলারের দুর্বলতা এবং ফিউচার, অপশন বাজারে অতিরিক্ত লিভারেজ, রুপোর দামকে রাতারাতি অগ্নিমূল্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু ২০১১ সালে মোড় ঘোরে। মাত্র ৯ দিনের মধ্যে ৫ বার মার্জিন বাড়ায় CME (শিকাগো মারক্যান্টাইল এক্সচেঞ্জ)। যার নিট ফল-ফিউচার বাজারে জোরালো ‘ডি-লিভারেজিং’। কয়েক সপ্তাহেই রূপোর দাম ৩০ শতাংশ পড়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা হান্ট ব্রাদার্স ও সত্তরের দশকের রুপো বিপর্যয়ের কথাও মনে করাচ্ছে। ১৯৭০-এর দশকে যখন সাধারণ মানুষ সোনা রাখতে পারতেন না, তখন টেক্সাসের ধনী হান্ট পরিবার আশ্রয় নেয় রুপোয়। ১৯৭৩ সালে আউন্সপ্রতি ১.৫০ ডলারে কেনা শুরু করে তারা। ছয় বছরের মধ্যে তাঁদের হাতে জমে ২০ কোটি আউন্সের বেশি রুপো।
কিন্তু ১৯৮০ সালে, CFTC ও CME কড়া নিয়ম জারি করে। চালু হয় ‘সিলভার রুল ৭’, মার্জিনে কেনা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রুপোর দাম জানুয়ারিতে প্রায় ৫০ ডলার ছুঁয়ে মার্চের শেষে নেমে আসে ১০ ডলারে। সুদের হার এক লাফে বাড়িয়ে দেন তৎকালীল ফেড চেয়ারম্যান পল ভলকার। শেষ পর্যন্ত হান্টদের লোকসান হয় ১.১ বিলিয়ন ডলারের বেশি, এবং তারা দেউলিয়া হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুই ইতিহাসেরই কেন্দ্রে একটি শব্দ—লিভারেজ! লিভারেজই উত্থান, লিভারেজেই সর্বনাশ!
বর্তমানে রুপোর বাজারে দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে বিশেষজ্ঞরা কিছু কারণকে যেমন সঙ্গত বলে মনে করছেন তেমন অতীতের দুটি ঘটনার মতো এবারেও রাতারাতি বিপর্যয়ের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কোভিড-পরবর্তী সময়ের মতো মুদ্রানীতি ও রাজকোষ ঘাটতি, খনি উৎপাদন ও রিসাইক্লিং মিলিয়েও বর্তমানে রুপোর চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। কারণ, সৌরবিদ্যুৎ, ইভি, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টারে রূপোর ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। এদিকে রুপোর উৎপাদন সীমিত। ৭০% রূপো আসে অন্য ধাতুর উপজাত হিসেবে। রুপোর দাম বৃদ্ধির পিছনে এসব কারণ যেমন রয়েছে তেমনই কিছু সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অতীতে এমন স্তরের পর বড় সংশোধন এসেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দামের এই ঊর্ধ্বগতির ধারা জারি থাকলে অতীতের মতো নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ অনিবার্য আর তাতেই শুরু হতে পারে হুড়মুড়িয়ে পতন।