গতবার বাজেটের পরপরই ছিল বিহার বিধানসভা নির্বাচন। তাই স্বাভাবিকভাবেই নীতীশ কুমারের রাজ্যের জন্য ঢালাও বরাদ্দ করা হয়েছিল বাজেটে।

মোদী অ্যান্ড কোং এবার ভোটের দিকে তাকিয়ে কী মোওয়া ছুড়ে দেন, সেই প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছেন রাজ্যবাসী।
শেষ আপডেট: 31 January 2026 14:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গতবার বাজেটের পরপরই ছিল বিহার বিধানসভা নির্বাচন। তাই স্বাভাবিকভাবেই নীতীশ কুমারের রাজ্যের জন্য ঢালাও বরাদ্দ করা হয়েছিল বাজেটে। এবারও কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের লোকসভায় টানা নবমবারের মতো পেশ করতে চলা বাজেটে (Union Budget 2026) নজর থাকবে ভোটকেন্দ্রিক রাজ্যগুলির দিকে। যার মধ্যে সবথেকে বেশি নজর থাকবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস শাসিত পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) দিকে। কারণ, একের পর এক ভোটে এই রাজ্যকে টার্গেট করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ সহ বিজেপির তাবড় নেতারা প্রচার চালিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু, সুফল ফলেনি। ফলে মোদী অ্যান্ড কোং এবার ভোটের দিকে তাকিয়ে কী মোওয়া ছুড়ে দেন, সেই প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছেন রাজ্যবাসী।
চলতি বছরেই পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল, পুদুচেরি ও অসমে বিধানসভা নির্বাচন। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, কেরল ও তামিলনাড়ু হল মোদী বিরোধী জোট ইন্ডিয়া শরিকদের দখলে। এবং এই তিনটি রাজ্যেই স্বাধীনতার পর থেকে কোনওদিন বিজেপি সরকার গঠন করতে পারেনি। ফলে এই ভোটমুখী রাজ্যগুলির দিকে বাজেটে বিশেষ নজর থাকবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল। বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে এই রাজ্যগুলির জন্য কী ঘোষণা আসে, সেদিকেই তাকিয়ে সবাই।
ভোটমুখী রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম এই রাজ্য। সাম্প্রতিক কয়েকটি বাজেটেই রাজ্যটির জন্য উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেখা গিয়েছে, বিশেষ করে সড়ক, জাতীয় সড়ক ও শহুরে পরিবহণ প্রকল্পে। কলকাতা-শিলিগুড়ি অর্থনৈতিক করিডর, জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ, মেট্রো রেল প্রকল্প এবং বন্দরের সঙ্গে যুক্ত পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো ঘোষণাগুলি ইতিমধ্যেই গুরুত্ব পেয়েছে।
রেল খাতেও পশ্চিমবঙ্গ বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। চলতি মাসের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মালদহ টাউন স্টেশন থেকে ভারতের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেনের (হাওড়া-গুয়াহাটি/কামাখ্যা) উদ্বোধন করেন। একই দিনে ভার্চুয়ালি গুয়াহাটি-হাওড়া রিটার্ন সার্ভিসও চালু হয়, যার ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের মধ্যে দীর্ঘ দূরত্বের রেল যোগাযোগ আরও মজবুত হয়েছে। কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, রাজ্যের রেল প্রকল্পগুলির লক্ষ্য মূলত যাত্রী পরিষেবার মান উন্নত করা এবং পরিবহণ দক্ষতা বাড়ানো। ‘অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের’-এর আওতায় পশ্চিমবঙ্গের ১০১টি রেল স্টেশন নতুন করে সাজানো হচ্ছে। রাজ্যে রেল পরিকাঠামোয় মোট বরাদ্দ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে, রেল মন্ত্রক সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা ও নদীয়া জেলায় চারটি নতুন রেললাইন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। শুক্রবার পূর্ব রেলের এক আধিকারিক জানান, এই প্রকল্পগুলির মোট দৈর্ঘ্য ৫৩ কিলোমিটারেরও বেশি। যে চারটি লাইনের অনুমোদন মিলেছে, সেগুলি হল—
রেল সূত্রের দাবি, কৌশলগতভাবে এই প্রকল্পগুলি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় যোগাযোগ আরও মজবুত করবে এবং জাতীয় নিরাপত্তাও জোরদার হবে। পাশাপাশি, এই নতুন লাইন চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে এবং দ্রুত ও সস্তা পরিবহণের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকরাও উপকৃত হবেন। সব মিলিয়ে, আসন্ন বাজেটে এবার রেল ও পরিকাঠামো খাতে আরও বড় কোনও ঘোষণা আসে কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
কলকাতার রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা কেন্দ্রের কাছে দাবি জানিয়েছেন, আসন্ন বাজেটে আবাসন নীতিকে ঢেলে সাজা হোক, বর্তমান জমির দাম ও নির্মাণ খরচের বাস্তবতা মাথায় রেখে। শিল্প মহলের মতে, বাড়ির দাম বাড়লেও নীতিগত কাঠামো এখনও অনেকাংশেই পুরনো রয়ে গিয়েছে। ডেভেলপারদের মূল দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে, গৃহঋণের উপর করছাড় বাড়ানো, মধ্যবিত্তের নাগালে সাশ্রয়ী আবাসন, বহুদিনের ঝুলে থাকা নিয়মবিধির সংশোধন এবং নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটে জিএসটি কাঠামোর যুক্তিসঙ্গত সংস্কার।
শিল্পপতিদের বক্তব্য, সাশ্রয়ী বাড়ির দামের ঊর্ধ্বসীমা (price cap) নতুন করে নির্ধারণ না করলে এই প্রকল্পগুলির বাস্তবতা নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি নির্মীয়মাণ সম্পত্তিতে জিএসটির হার ও ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের জটিলতা ক্রেতাদের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। CREDAI ওয়েস্ট বেঙ্গলের সভাপতি সুশীল মোহতা বলেন,
আমরা এমন সংস্কার চাই, যা আজকের বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই। জমি ও নির্মাণ খরচ বেড়েছে বহুগুণ, কিন্তু নীতিগত কাঠামো সেই অনুযায়ী বদলায়নি। তাঁর মতে, অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ হলে এবং কর কাঠামো যুক্তিসঙ্গত হলে মধ্যবিত্ত ও মধ্য-উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের মধ্যে চাহিদা অনেকটাই বাড়বে। বিশেষ করে মধ্যআয়ের বাজারকে চাঙ্গা করতে বাজেট বড় ভূমিকা নিতে পারে।
সুতরাং, এই বাজেটই হতে পারে রাজ্য বিজেপির এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভোটের হাতিয়ার। অন্যদিকে, রাজ্য যদি বাজেটে বঞ্চিত হয়, তাহলে তৃণমূলের প্রচারের খুঁটি জোরদার হবে। রাজ্যের আমজনতারও মেজাজ বিগড়ে যাবে ভোটের আগে। তাই উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ পর্যন্ত নির্মলা সীতারামনের বাজেট ল্যাপটপে লেখা থাকবে একথা হলফ করেই বলা যায়। সব মিলিয়ে দার্জিলিংয়ের চা শিল্প, দিনাজপুরের ধান-সবজি চাষ, মালদহের আম, পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার হস্তশিল্প, নদীয়ার মৃৎশিল্প, মুর্শিদাবাদের রেশম থেকে মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার মৎস্যজীবীদের উন্নয়নে দরাজ বরাদ্দ ঘোষণা হতে পারে। তার মধ্যে সবার উপরে থাকার সম্ভাবনা রেল প্রকল্প, বিশেষ করে মেট্রো প্রকল্পগুলি। অসমাপ্ত মেট্রো রেল প্রকল্প শেষ করার বিরাট বরাদ্দ ও নয়া মেট্রো প্রকল্প ঘোষণার দিকেই মুখিয়ে রয়েছে বাঙালি।