আসন্ন কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭ তৈরি হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকেই সামনে রেখে। ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর স্বপ্নপূরণে একটি ‘জনস্বাস্থ্যমুখী দেশ’ গড়াই মূল উদ্দেশ্য হওয়া দরকার। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে জড়িত এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আগামিকাল অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের প্রস্তাবিত বাজেটে এই বিষয়গুলির উপর জোর দেওয়া উচিত।

কল্পিত ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি করা।
শেষ আপডেট: 31 January 2026 11:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দ্রুত বদলাচ্ছে। বাড়ছে আয়, বাড়ছে বয়স্ক বা প্রবীণ নাগরিকদের জনসংখ্যা, আর সংক্রামক রোগের জায়গা দখল করেছে দীর্ঘস্থায়ী (chronic) অসুখ। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় সরকার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রকের (MoHFW) জন্য বরাদ্দ করেছে ৯৯,৮৫৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। ২০১২-১৩ থেকে ২০২৫-২৬— এই সময়কালে স্বাস্থ্য মন্ত্রকের ব্যয় গড়ে বার্ষিক প্রায় ১২ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই প্রেক্ষিতে আসন্ন কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭ তৈরি হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকেই সামনে রেখে। ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর স্বপ্নপূরণে একটি ‘জনস্বাস্থ্যমুখী দেশ’ গড়াই মূল উদ্দেশ্য হওয়া দরকার। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে জড়িত এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আগামিকাল অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের প্রস্তাবিত বাজেটে এই বিষয়গুলির উপর জোর দেওয়া উচিত।
জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের (NHM) আওতায় এআই ও এমএল-ভিত্তিক প্রকল্প চালুর জন্য বছরে অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার আলাদা বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব উঠছে। যার লক্ষ্য হবে, সরকারি ও বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই অনুমোদিত এআই সমাধান দ্রুত গ্রহণের চেষ্টা ও লক্ষ্যভিত্তিক অনুদান দেওয়া। দেশজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে AI/ML-driven projects বলতে বোঝানো হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ও মেশিন লার্নিং (Machine Learning) প্রযুক্তির ব্যাপক ও মিলেমিশে ব্যবহার।
এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার ভিশন, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) এবং প্রেডিক্টিভ মডেলিংয়ের মতো উন্নত ডিজিটাল টুল। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শহরের অত্যাধুনিক হাসপাতাল ও গ্রামাঞ্চলের অবহেলিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যকার প্রযুক্তিগত ফারাক কমানো। এর মাধ্যমে বড় পরিসরে রোগ নির্ণয় আরও দ্রুত ও নির্ভুল করা, চিকিৎসার মান উন্নত করা এবং প্রশাসনিক কাজকর্মে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। সংক্ষেপে বলা যায়, AI/ML প্রকল্প মানে শুধু নতুন প্রযুক্তি নয়— বরং গোটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও সমান, কার্যকর ও ভবিষ্যৎমুখী করে তোলার একটি কাঠামোগত রূপান্তর।
আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল মিশন (ABDM) বা সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের (MoHFW) অধীনে একটি পৃথক সাইবার সুরক্ষা তহবিল গঠনের প্রয়োজন। যার উদ্দেশ্য হবে, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন (DPDP) আইন ২০২৩ ও ২০২৫ সালের নতুন নিয়মাবলি মেনে চলা।
বিশ্বের সর্বোচ্চ AMR সমস্যাগ্রস্ত দেশগুলির মধ্যে ভারত অন্যতম। WHO-র GLASS রিপোর্ট (২০২৫) অনুযায়ী, ভারতে প্রতি তিনটি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের একটিতে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (NAP-AMR) ২.০ (২০২৫–২৯) বাস্তবায়নে প্রয়োজন পর্যাপ্ত তহবিল। অ্যান্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ডশিপ, দ্রুত রোগ নির্ণয় ও নজরদারি ব্যবস্থার বিস্তারে।
বাজেট ২০২৬-এ NHM-এর অধীনে কেন্দ্রীয় মেডিক্যাল সাপ্লাই ব্যবস্থার জন্য আলাদা তহবিল বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওষুধ, যন্ত্র ও ভোগ্য সামগ্রীর সম্পূর্ণ ট্র্যাকিং, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত অডিট ও সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্ব, এই চারটি ভাগে গড়ে তুলতে হবে নিরাপদ ও স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা।
ভারতের স্বাস্থ্যখাতে মেডিক্যাল ট্যুরিজম ও বিদেশি বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য প্রস্তাব করা হচ্ছে ৫,০০০ কোটি টাকার একটি ‘হেলথকেয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’। এই তহবিল দিয়ে মেডি-সিটি বা বিশেষ স্বাস্থ্য অঞ্চল তৈরি, স্বল্প সুদের ঋণ এবং PPP প্রকল্পে ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং দেওয়া যেতে পারে।
স্বাস্থ্য পরিষেবা যদিও জিএসটি-মুক্ত, কিন্তু চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, ডায়াগনস্টিক কিট, এআই সফটওয়্যার ও টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন হারে জিএসটি ধার্য হওয়ায় চিকিৎসা খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বাজেট ২০২৬-এ এই সমস্ত বিষয়ের জন্য কম ও একক জিএসটি হার চালুর দাবি উঠছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭-এর ইউনিয়ন বাজেট হতে পারে সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা, ডিজিটাল হেলথ ও বায়োটেক উদ্ভাবনের দিকে বড় মোড় নেওয়ার সুযোগ। তবে শুধু বড় অঙ্কের বরাদ্দ নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তবায়নের ক্ষমতা, মাঠপর্যায়ের পরিকাঠামো, AMR নিয়ন্ত্রণে শৃঙ্খলা এবং এমন বিমা কাঠামো যা দৈনন্দিন চিকিৎসা খরচও কভার করে। বিমার আওতায় সংখ্যার চেয়ে বেশি জরুরি দ্রুত ও অধিকাংশ খরচের দাবির দ্রুত নিষ্পত্তি করা— তবেই ‘হেলদি ইন্ডিয়া’ বাস্তবে রূপ পাবে।