বাংলাদেশে পরিবর্তনের ভোটে মুখোমুখি বিএনপি ও জামাত। কিন্তু নির্বাচনে না থেকেও ফলাফলের সঙ্গে জড়িয়ে ইউনুস ও শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ।

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 11 February 2026 22:49
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবার সকাল সাতটা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। চলবে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত। একই সঙ্গে হবে জুলাই সনদের উপর গণভোট। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মহম্মদ সানাউল্লাহ বুধবার বলেছেন ‘এখনও পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। যে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো না ঘটলে আরও ভাল হতো। সেই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, অতীতের যে কোনও সময়ের চেয়ে আমরা ভাল অবস্থায় আছি।’
বাংলাদেশ সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে বৃহস্পতিবার ২৯৯টি তে ভোট গ্রহণ করা হবে। শেরপুরের একটি আসনের প্রার্থীর মৃত্যুতে নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছে।
ভোট গ্রহণ এবং গণনার কাজ শান্তিপূর্ণ করতে প্রায় ১০ লাখ নিরাপত্তা বাহিনী বৃহস্পতিবার ময়দানে থাকবে। বাংলাদেশ পুলিশ ছাড়াও সেনাবাহিনী, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি, বিশেষ বাহিনী র্যাব, আনসার এবং দেশটির উপকূল রক্ষী বাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। প্রশাসনের দাবি, বাংলাদেশে অতীতে কোন নির্বাচনে এত বেশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। বিএনপি এবং জামায়েত ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে নানা সময় সংশয় প্রকাশ করলেও শেষ প্রহরে তারা মোটের উপর সন্তোষ প্রকাশ করেছে। যদিও বিএনপি এবং জামাত দু'পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং অর্থাৎ রিগিং ছাপ্পা সহ নানা ধরনের কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরই গণনা শুরু হবে। এবার চূড়ান্ত ফল আসতে সময় বেশি লাগবে গণভোটের কারণে। একইসঙ্গে দুটি ব্যালট গোনা হবে। নির্বাচন কমিশন আভাস দিয়েছে বৃহস্পতিবার বেশি রাতেই স্পষ্ট হয়ে যেতে পারে বিএনপি নাকি জামাত জোট সরকার গড়বে। এখনও পর্যন্ত ত্রিশঙ্কু সংসদ হওয়ার কোন সম্ভাবনা কোন মহল থেকেই আভাস দেওয়া হয়নি। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বহু কেন্দ্রে এ ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই। তুল্য মূল্য বিচারে জামাতে তুলনায় বিএনপি অনেক বেশি আসনে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। তবে ভোটের দিন অর্থাৎ ফাইনাল ম্যাচে কোন দলের কর্মী বাহিনী কতটা তৎপরতা দেখাতে পারবে এবং নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসন কী ভূমিকা নেবে তার ওপর নির্ভর করছে অনেক ভোটের ফলাফলের অনেক অঙ্ক।
এবারের নির্বাচনের অনেকগুলি তাৎপর্যপূর্ণ দিক রয়েছে। ২০২৪ এর ৫ অগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তিন দিনের মাথায় অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মহম্মদ ইউনুস। তাঁকে প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। সেই সরকারের দেড় মাসের মাথায় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছিল। সেদিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতোই মোহাম্মদ ইউনুসের সরকারও একটি অদলীয় সরকার। প্রায় ১৮ বছর পর বাংলাদেশে ফের একটি অদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
এই নির্বাচনে আওয়ামী লিগ না থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি এবং জামায়েতী ইসলামীর মধ্যে। যে দল দুটি কুড়ি বছর আগে বাংলাদেশে জোট সরকার পরিচালনা করেছে। বিভিন্ন জনমত সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, পুরনো মিত্র বিএনপি এবং জামাতের মধ্যে লড়াইয়ে প্রথম দলটি এগিয়ে আছে। একাধিক জনমত সমীক্ষায় বলা হয়েছে তারেক জিয়াকে অধিকাংশ মানুষ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেতে চান। বিএনপি'র মত বড় দল না হলেও এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কেউ খাটো করে দেখছে না কোনও মহল। ইসলামপন্থী দলটি যদি সরকার গড়ার সুযোগ নাও পায় তারা শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ সংসদের অভ্যন্তরে একটা বড় পরিবর্তন সম্ভব করে তুলতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়লাভ করেছিল। পরবর্তীকালে তাদের আসুন এবং ভোটের হার অনেকটাই কমে যায়। ২০২৪ এর আগে বেশ কয়েক বছর আদালতের রায়ে দলটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। ওই বছরই শেখ হাসিনা সরকার বিদায় নেওয়ার আগে জামায়াতে ইসলামীকে ফের নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর জামাত জোর কদমে তাদের সংগঠন ও জনসমর্থন বাড়িয়েছে। এবারের ভোটে তাদের সেই সমর্থনের প্রতিফলন ঘটবে বলে ওয়াকিবহালমহল মনে করছে।
বিস্তর পরিবর্তন আছে বিএনপিতেও। লন্ডনে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে বিএনপির কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান তথা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক রহমান গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন। এর পাঁচ দিনের মাথায় প্রয়াত হন খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের ভোটের ময়দান যখন সরগরম তখন খালেদার মৃত্যু তারেক রহমান ও বিএনপি'র জন্য ছিল বড় ধাক্কা। এই নির্বাচন ব্যক্তির তারেক রহমানের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এই প্রথম বাংলাদেশে কোনও নির্বাচনে অংশ নিতে চলেছেন। সেই সঙ্গে দলকেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক। তিনি দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। একাধিক জনমত সমীক্ষায় বলা হয়েছে এই নির্বাচনের পর একক শক্তিতে সরকার গড়বে বিএনপি এবং প্রধানমন্ত্রী হবেন তারেক রহমান। জামাইয়ে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোট কাউকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী বলে ঘোষণা করেনি। তবে অনুমান করা যায় সেই সুযোগ এলে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। ঢাকা থেকে নির্বাচনে লড়ছেন জামায়াতের শরিক মাত্র কয়েক মাস বয়সি দল জাতীয় নাগরিক পার্টির নাহিদ ইসলাম। তিনি জয়ী হলে এবং জামাতে সরকার গড়ার সুযোগ এলে নাহিদ মন্ত্রী হতে পারেন। জামাতের নেতারা এই তরুণকে প্রধানমন্ত্রী করার কথাও নানা সময় বলেছেন।
মঙ্গলবার রাতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস ঘোষণা করেছেন, নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি সাংসদদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেবেন। কোনও কোনও মহলের খবর, বিএনপি অথবা জামাত যে দলই সরকার গ্রুপ না কেন মহম্মদ ইউনুসকে তারা রাষ্ট্রপতি করতে পারে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন আগেই ঘোষণা করে রেখেছেন নির্বাচনের পর নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে তিনি বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে মহম্মদ ইউনুসের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনও সুযোগ ছিল না। তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আসতেও রাজি নন বলে তাঁর প্রধান প্রেস সচিব শফিকুল আলম একাধিকবার জানিয়েছেন। তবে নির্বাচনে না থাকলেও ভোটের ফলাফলের সঙ্গে মহম্মদ ইউনুসের ভাগ্য জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের সংবিধান এবং প্রশাসনে তিনি যে মৌলিক সংস্কারগুলি করতে চান সেগুলির ওপরেই অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। আগামীকাল বাংলাদেশের ভোটাররা তাই বুথে গিয়ে দুটি ব্যালটে ভোট দেবেন। গণভোটের ব্যালটে চারটি বিষয়ের উপরে মানুষকে 'হ্যাঁ' অথবা 'না'-তে টিক দিতে বলা হয়েছে। 'হ্যাঁ' ভোট জয়ী হলে জাতীয় সংসদ গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধনী গুলি পাস হয়ে যাবে। কোন কারণে সংসদ সেই কাজে ব্যর্থ হলে ধরে নেওয়া হবে সংশোধনীগুলি গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সংসদে উচ্চকক্ষ চালু করা, একটানা দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র শব্দ দুটি বাতিলের সুপারিশ রয়েছে। এই গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে। দেশবাসীকে 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে ভোট দিতে আর্জি জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। কারণ 'হ্যাঁ' ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলে ইউনুসের নির্ধারিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে সেটা হবে প্রধান উপদেষ্টার জন্য বড় ধাক্কা। ধাক্কা খাবে বিএনপি এবং জামাতও। কোন কারণে 'না'-এর পক্ষে বেশি ভোট পড়লে পরোক্ষে তাতে জয়ী হবে নির্বাচনী ময়দানে না থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লিগ। যদিও একাধিক সূত্রের খবর, গণভোটে 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে অন্তত ৬০ শতাংশ ভোটদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এক প্রশাসনিক কর্তার কথায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সরকারের কোন স্বার্থ জড়িয়ে নেই। রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তারা নিজেদের শক্তিতে ভোট পাওয়া এবং সরকার গড়া নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। সরকার গণভোটের বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী। কারণ, গণভোটের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে বাংলাদেশ যেমন আছে তেমনি থাকবে নাকি সংবিধান, সংসদ, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল সংবিধানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন সাধন করতে হলে গণভোটে 'হ্যাঁ' এর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়া জরুরি। ওয়াকিবলে মহলের মতে এখানেই এই নির্বাচনে প্রার্থী না হয়েও মহম্মদ ইউনুস এবং আওয়ামী লিগ ও দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ জড়িয়ে।
নির্বাচনী লড়াইয়ে না থাকা আওয়ামী লিগের ভাগ্য আরও একটি বিষয়ে জুড়ি আছে। শেখ হাসিনা তাঁর দলের ভোটারদের এই নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লিগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সহ দলটির প্রথম সারির নেতাদের বড় অংশ দেশের বাইরে। দেশে থাকা নেতারাও আত্মগোপন করে আছেন। ফলে ভোট বয়কটের ডাক সফল করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে আলোচনা আছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব আশাবাদী তাদের সমর্থকেরা বুথে যাবেন না। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন বলে দলেরই একাংশ মনে করেন। একাধিক জনমত সমীক্ষাতেও দেখা গিয়েছে আওয়ামী লিগের ভোটারদের অনেকেই এবার বিএনপি এবং কেউ কেউ জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে পারেন। এলাকায় শান্তিতে বসবাস করার জন্যও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কেউ কেউ এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ইতিমধ্যে নানা মহল থেকে আভাস পাওয়া গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের হার কী হয় নির্বাচনী লড়াইয়ে না থেকেও তার ওপর নির্ভর করবে আওয়ামী লিগ তথা শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎও। ভোটের হার উল্লেখযোগ্য কম হলে আওয়ামী লিগ দাবি করতে পারবে নির্বাচনে না থেকেও নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারল। অন্যদিকে ভোটের হার স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি হলে তা হবে আওয়ামী লিগের জন্য নতুন এক বিপর্যয়। অতীতের মত সেই বিপর্যয় তারা কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা ভবিষ্যতেই তা বলবে।