এবারের নির্বাচনে সবেচেয়ে লক্ষণীয় দিক হল, বস্তুত এই প্রথম ভোটারদের মন-মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। দীর্ঘদন কোনও একটি দলকে সমর্থন জানিয়ে আসা দলও এবার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে পার্টির প্রতীক নয়, বিবেচনায় রেখেছেন প্রার্থীকে।

শেষ আপডেট: 11 February 2026 12:18
আগামীকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে বহু প্রতিক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন (Bangladesh Election 2026) ও গণভোট হতে যাচ্ছে। বিএনপি (BNP) ও জামায়াতে ইসলামি-সহ (Jamaat-E-Ishlami) ৫১টি রাজনৈতিক দলের মোট দু হাজার ৩৪ জন লড়াইয়ের ময়দানে আছেন। তাদের মধ্যে ২৭৫জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ভোটার ১২ কোটির বেশি। তাদের কত শতাংশ কাল বুথে হাজির হবেন তা নিয়ে জল্পনা আছে।

নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা আওয়ামী লিগ (Awami Leauge) ভোট বয়কটের ডাক দেওয়ায় ভোট প্রদানের হার নিয়ে সংশয় আছে। যদিও সব দলই হাসিনার দলের ভোটারদের সমর্থন চেয়ে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছে। সেই কারণেই আওয়ামী লিগ ও শেখ হাসিনাকে (Sheikh Hasina) আক্রমণ করতে গিয়ে সব দলই সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। নির্বাচনের দিন ঘোষণার আগে যে উচ্চগ্রামে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানানো হয়েছিল প্রচারের ময়দানে তা দেখা যায়নি। বস্তুত সব দলই জানে জয়-পরাজয়ে অন্যতম নির্ধারক ভূমিক পালন করতে পারে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা দলটির ভোটারেরাই। তবে এবারের নির্বাচনে সবেচেয়ে লক্ষণীয় দিক হল, বস্তুত এই প্রথম ভোটারদের মন-মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। দীর্ঘদন কোনও একটি দলকে সমর্থন জানিয়ে আসা দলও এবার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে পার্টির প্রতীক নয়, বিবেচনায় রেখেছেন প্রার্থীকে।
ভোট নিয়ে ঢাকায় গত দু’দিন বহু সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউই স্পষ্ট করে বলেননি ভোট কাকে দেবেন। প্রত্যেকের কাছেই জানতে চেয়েছিলাম, কোন কোন বিবেচনায় তারা ভোট দেবেন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, বিএনপি, জামাতের বাঁধা ভোটারদেরও অনেকেই বলেছেন, তারা প্রার্থীর নানা দিক বিবেচনায় রাখছেন। যেমন দুর্নীতি, চাঁদাবাজি করা প্রার্থীদের ব্যাপারে মানুষ সতর্ক। আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পর বিএনপির তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মীদের অনেকের বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ উঠেছিল। এই ধরনের অভিযোগে পার্টি প্রায় ছয় হাজার জনকে বহিষ্কার করেছে। তারপরও প্রার্থীদের অনেকের বিরুদ্ধে এলাকার মানুষের ক্ষোভের কারণ চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেটরাজ চালানোর অভিযোগ। ঘটনাচক্রে এই অভিযোগ জামাত-সহ অন্য পার্টির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে কম। জামাতের কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে অতিমাত্রায় ধর্মের তাস খেলার অভিযোগ আছে। এই দলের কোনও কোনও প্রার্থী ও নেতা প্রকাশ্যেই বলেছেন, জামাতকে ভোট দিলে জান্নাতে যাওয়া নিশ্চিত। জান্নাতের টিকিট পেতে জামাতকে ভোট দেওয়ার প্রচার নিয়ে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে দলটি।
নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার এই প্রবণতা নিয়ে সবচেয়ে চিন্তিত ময়দানের মূল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামাত। বিএনপির ২৯১ প্রার্থীর মধ্যে ৭৫ জনের বিরুদ্ধে দলেরই বিক্ষুব্ধরা স্বতন্ত্র বা নির্দল হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপির একদা আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার মতো দলের পরিচিত, প্রভাবশালী নেত্রীও আছেন।
দলদাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নিজের বিচার-বিবেচনায় ভোট দিতে ভোটারদের এই মন-মানসিকতার প্রবণতার কারণ কী? ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দা আওয়ামী লিগের এক স্থানীয় নেতা মানছেন, ভোটারদের এই ভাবনার পিছনে তাদের ১৬ বছরের অপশাসনের প্রভাব আছে। ওই নেতার কথায় আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে ইউনুস সরকার এবং বিএনপি-জামাত-সহ বিরোধী দলগুলি যে সব অভিযোগ তুলেছে তারমধ্যে দুর্নীতির বিষয়ে কোনও বিতর্কে অবকাশ নেই। দলের মন্ত্রী, সাংসদেরা তো বটেই, জেলা-উপজেলা স্তরের নেতারাও দেদার টাকা কামিয়েছেন। তোলাবাজিতে মানুষ অতীষ্ট ছিল। ওই নেতার কথায়, গুম খুন, আয়নাঘর, ভোটে কারচুপির অভিযোগে অনেক অতিরঞ্জন আছে বটে। তবে গণঅভ্যুত্থানের সময় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অখ্যাত ছাত্রদের ডাকে সাড়া দিয়ে যে পথে নেমেছিল তার পিছনে প্রধান কারণ ছিল আওয়ামী লিগ নেতাদের সীমাহীন দুর্নীতি। যা মানুষ দিনের পর দিন প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু দল ব্যবস্থা নেয়নি। বিরোধী শূন্য একতরফা ভোটের সুযোগ নিয়ে একের পর এক নির্বাচনে জনবিচ্ছিন্ন নেতারা সাংসদ, মন্ত্রী, উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন।
বিএনপির এক নেতা একান্তে মানছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাঁদের দলের তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মীদের অনাচার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার পার্টির সঙ্গে বিএনপি-কে এক বন্ধনীতে বসিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া, অতীতে, বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দল ক্ষমতায় থাকার সময় বিএনপির নেত-কর্মীদের বিরুদ্ধেও লুটতরাজ, বেআইনি পথে অর্থ উপার্জনের অভিযোগ ছিল। এই অনাচার ঠেকাতে ভোটারদের অনেকে এবার নিজের অস্ত্র প্রয়োগ করতে চান প্রার্থীর ভাল-মন্দ বিবেচনা করে ভোট দেবেন তারা। ওই নেতার কথায় জুলাই আন্দোলনকারীরা নিজেদের মধ্যে বিবাদ করে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির ক’জন জিতবেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে তরুণ ও যুব সমাজের উত্থাপিত বিষয়গুলি মানুষের মনে এখন অবস্থান করছে। দুর্নীতি এমন একটি ইস্যু যে কোনও দল তা থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু মানুষ মুক্তি চায়। ফলে এবারের ভোটে ধানের শীষ কিংবা দাড়িপাল্লা, কোনওটাই শেষ কথা বলবে না।
পশ্চিমবঙ্গের মতো বাংলাদেশেও ভোট মানে হিংসার উৎসব। এবার ভোট ও গণভোটের বিজ্ঞপ্তি জারির পর থেকে বিগত ৬১ দিনে ২০৭টি হিংসার ঘটনা ঘটেছে গোটা বাংলাদেশে। মারা গিয়েছেন ১৭ জন। আহত হয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ। যদিও সরকারের দাবি, রাজনৈতিক হত্যার বলি হয়েছেন মাত্র পাঁচজন। ভোটের দিন এবং ভোট পরবর্তী কয়েকদিন দেশ হিংসাংমুক্ত রাখাই প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের কাছে চ্যালেঞ্জ।
ঢাকার প্রবীণ সাংবাদিকদের একাংশ নির্বাচনী হিংসার প্রশ্নে শেখ হাসিনার জমানার তিনটি নির্বাচনকে খুব একটা বিবেচনায় নিতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, হাসিনার সময়ে হওয়া নির্বাচনগুলি ছিল একতরফা। ফলে সংঘাত-সংঘর্ষের সম্ভাবনা এমনীতেই কম ছিল। তারমধ্যেই ২০১৪-র নির্বাচনে বিজ্ঞপ্তি জারির পর থেকে ৫৩জন ভোটের বলি হয়েছিলেন। সেদিক থেকে অতীতের বহু নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটে হিংসা, হত্যা কম বলেই মনে করছেন দীর্ঘদিন বাংলাদেশের ভোট কভার করার অভিজ্ঞতা থাকা সাংবাদিকেরা। মহম্মদ ইউনুসও মঙ্গলবার জাতীর উদ্দেশে ভাষণে বলেছেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারণা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ হয়েছে, যা সম্মিলিত দায়িত্ববোধের ফল। তবে কয়েকটি সহিংস ঘটনায় প্রাণহানিতে তিনি গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গণতন্ত্রের পথে কোনও প্রাণ ঝরে যাওয়া কখনওই গ্রহণযোগ্য নয়।
হিংসার সঙ্গেই থাকে অর্থ শক্তির দাপট। এবারও বিএনপি এবং জামাত পরস্পরের মধ্যে টাকা দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগ তুলেছে। বিএনপি'র বর্ষীয়ান নেতা ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ইঙ্গিত করেছেন, জামাত ভোটারদের উপহার বিলি করছে। জামাতও বিএনপির বিরুদ্ধে একই অভিযোগের সরব। তবে দেদার টাকা ছড়ানোর অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক আছে। সমাজ মাধ্যমে প্রচুর ভিডিও ঘুরছে। প্রশাসনের দাবি এর অধিকাংশই এআই দিয়ে তৈরি। ঢাকার সাংবাদিকদের একাংশ বলছেন, টাকার খেলা আছে। তবে অতীতের মত ব্যাপক নয়।