বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি (Bangladesh heritage Tangail) বুননের কৌশলকে ‘ইন্ট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করল ইউনেস্কো (UNESCO recognition)।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 9 December 2025 20:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঢাকার (Dhaka) বুননশিল্পীদের পাড়ায় দিনের পর দিন একই ছন্দ। তাঁত চালানোর শব্দ, কখনও দ্রুত বা কখনও ধীর, আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবিরাম হাত চলছে কারিগরদের। রঙিন তুলো ও সুতোর সুতোয় বুনে জন্ম নেয় টাঙ্গাইল শাড়ি (Tangail saree), যা শুধু একটি পোশাক নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি উজ্জ্বল প্রতীক।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি (Bangladesh heritage Tangail) বুননের কৌশলকে ‘ইন্ট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করল ইউনেস্কো (UNESCO recognition)। মনোয়ন ঘোষণার পর থেকেই বুননশিল্পীদের আশা আরও জোরদার হয়েছিল যে, এইবার মিলতে পারে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি (International recognition), যা তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে নতুন পথ দেখাতে পারে। সেই পথেই হাঁটল ইউনেস্কো।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা দলনেতা এবং ইউনেস্কো সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত খন্দকার এম তালহা জানিয়েছেন, ''এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য একটি অসামান্য গৌরবের বিষয়। দীর্ঘ দুই শতকের অধিক সময় ধরে টাঙ্গাইলের তাঁতিদের অনবদ্য শিল্প কর্মের বৈশ্বিক স্বীকৃতি এটি। টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের সকল নারীদের নিত্য পরিধেয় যা এই শাড়ি বুনন শিল্পের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পিছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।''

সুখবর আসার মুহূর্তে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ ও তার সহকর্মীরা
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় জেলা টাঙ্গাইলের নামে নাম পাওয়া এই শাড়ি বহু শতাব্দী ধরে বাঙালি ঐতিহ্যের অংশ। উৎসব, বিয়েবাড়ি কিংবা যে কোনও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইল শাড়ির নিজস্ব মর্যাদা আছে ভারত-বাংলাদেশ - দুই দেশেই। এই শাড়ির পরিচিতি শুধু এর নকশা বা রং নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বিশাল বুননসম্প্রদায়ের জীবনজীবিকা।
প্রসঙ্গত, টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য জিআই ট্যাগ পেয়েছে ভারত। এই স্বীকৃতির ফলে ভারতের সঙ্গে কি সমস্যা তৈরি হতে পারে? তার উত্তরে ভারতের নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মহাম্মদ রিয়াজ হামিদুল্লাহ জানান, ''এই নিবন্ধন আন্তর্জাতিক হয়েছে যেখানে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েই সদস্য। তাই আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এই নিবন্ধনের কাছে সম্পূর্ণ বৈধতা রয়েছে। এছাড়া উভয় দেশের নারীদের কাছে শাড়ি একটি জনপ্রিয় পরিধেয়। তাই এই নিবন্ধন শাড়ি অনুগ্রাহী সকল নারীকে তার প্রিয় পোশাক নিয়ে গর্ববোধ করার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।''
#UNESCO just inscribed traditional art of #Saree weaving, in Tangail Bangladesh, as a living heritage of humanity.
A moment for all weavers to celebrate,
for millions of #women in #Bangladesh #India to rejoice over the treasured Tangail in wardrobe!@UNESCO #handloom #textiles pic.twitter.com/QBDTRJ7I7d— Riaz Hamidullah (@hamidullah_riaz) December 9, 2025
টাঙ্গাইল শাড়ির প্রতিটি পোশাকই তৈরি হয় সূক্ষ্ম নৈপুণ্যে। স্থানীয় সংস্কৃতি-প্রসূত নকশা, জ্যামিতিক মোটিফ আর মাটি-জল-ঋতুর ইঙ্গিতবাহী প্যাটার্নে সাজানো থাকে এর শরীর। কারিগররা সাধারণত সুতোর রং তৈরি করা থেকে শুরু করে তাঁতে বুনন, ডিজাইন তোলা - সবটাই নিজেরা করেন। মহিলারা সুতোকাটা ও নানা প্রস্তুতিমূলক কাজে যুক্ত থাকেন। এক কথায়, এটা একটা সমবায়ী শিল্প, যেখানে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হাত লাগে।
কিন্তু এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজ দাঁড়িয়ে রয়েছে কঠিন বাস্তবতার মুখে। কাঁচামালের দাম লাগামছাড়া, বাজারে মেশিনে বোনা সস্তা শাড়ির বাড়তি চাপ - সব মিলিয়ে টাঙ্গাইলের তাঁতিদের আয় ক্রমেই কমছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এই বংশপরম্পরায় চলা শিল্পে নতুন প্রজন্ম আগ্রহ দেখাচ্ছে না। পরিবারে তাঁতি-কাজের ঐতিহ্য ধরে রাখার বদলে তারা অন্য পেশার সন্ধানে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
তাই ইউনেস্কোর স্বীকৃতি তাঁদের কাছে শুধু সম্মানের নয়, অস্তিত্ব বাঁচানোরও আশ্বাস। তাঁতিদের বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য তালিকায় স্থান পাওয়ায় এই শিল্পের প্রতি দেশ-বিদেশে আকর্ষণ বাড়বে, নতুন করে বাজার তৈরি হবে, আর পরবর্তী প্রজন্মও হয়তো তাঁদের পুরনো শিল্পকে ধরে রাখার মতো সুরক্ষা ও সম্মান পাবে।
টাঙ্গাইল শাড়ি শুধু একটি পোশাক নয় - এটা একটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, আর এক সম্প্রদায়ের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি।