জয় নিজে বর্তমানে মার্কিন প্রবাসী। মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করে দেওয়ায় জয়কে আমেরিকার নাগরিকত্ব নিতে হয়েছে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 4 February 2026 10:33
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের (BNP chairman Tareq Rahman) ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মাদক চোরাচালানের অভিযোগে আমেরিকার জেলে বন্দি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর (Nicolas Maduro) প্রসঙ্গ টানলেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় (Sajib Wazed Joy, son of Sheikh Hasina)। বাংলাদেশ বিষয়ে এক আলোচনা সভায় ভাষণে জয় ইঙ্গিত করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলে তারেক রহমানের পরিণতি হতে পারে মাদুরোর মতো। জয়ের কথায়, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্তর নথিপত্র আমেরিকার হাতে আছে। তাদের কথামতো না চললে তারেক রহমানের পরিণতিও মাদুরোর মত হওয়া অসম্ভব নয়। প্রসঙ্গত হাসিনা পুত্র জয় এই প্রথম সরাসরি বিএনপির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম করে তাঁকে আক্রমণ শানান। মনে করা হচ্ছে খালেদা জিয়ার পুত্র এবং বয়সে তাঁর তুলনায় অনেক ছোট হওয়ায় তারেক রহমানকে এখনও আক্রমণের পথে হাঁটেননি শেখ হাসিনা। আওয়ামী লিগ যেটি সচেতনভাবেই এই ব্যাপারে তাঁর পুত্রকে এগিয়ে দিলেন বলে অনেকেই মনে করছেন।
জয় বলেন, বিএনপির প্রধান তারেক রহমান এফবিআই (FBI) এজেন্টের দেওয়া সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ডিত হয়েছিলেন, যিনি নিজে বাংলাদেশে এসে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। সুতরাং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তা সত্ত্বেও তারা কোনও পদক্ষেপ করেনি। জয় বলেন, এটি তাদের মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন্য এটি একটি আদর্শ পরিস্থিতি। এমন একজন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রাখা যাকে তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন এবং যখন খুশি গ্রেফতার করে নিজেদের কারাগারে নিয়ে যেতে পারবেন। ফলে তিনি কখনোই মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে কিছু করার সাহস পাবেন না।'

জয়ের কথায়, আমেরিকার হাতে একটি কার্ড হিসেবে রয়েছে তারেকের দুনীতি। মার্কিন আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের যেকোনো দেশের যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে (এমনকি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও) চার্জ গঠন করার ক্ষমতা রাখে। তারা পানামা এবং অতি সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও এমনটা করেছে। আমি এখানে বিতর্ক করছি না যে তারা এটা পাওয়ার যোগ্য কি না, কিন্তু সত্য হলো যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এটা করতে পারে।
তিনি বলেন, কিছুদিন আগ পর্যন্তও বিএনপি গণভোটের বিরোধিতা করে আসছিল। প্রতিনিধিত্ব ছাড়া গণভোট আয়োজন করা আসলে সংবিধান পরিবর্তনের একটি মহড়া মাত্র। আমাদের সংবিধানে বর্তমানে গণভোটের কোনও সুযোগ নেই। আমাদের আদালত রায় দিয়েছে যে, ১৯৮০ এবং ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরশাসকরা যে গণভোট আয়োজন করেছিল, তা ছিল অসাংবিধানিক। অথচ বর্তমান সরকার আবারও সেই গণভোট আয়োজনের চেষ্টা করছে, যদিও সংবিধানে এর কোনও বিধান নেই। কারণ, সংবিধান পরিবর্তনের বৈধতা পাওয়ার এটিই তাদের একমাত্র পথ। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সংবিধান সংশোধনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে কোনও একক দলের পক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ আসন জেতা প্রায় অসম্ভব। আর এই বাস্তবতায় এখানে একটি ঝুঁকি রয়েছে।
জয় নিজে বর্তমানে মার্কিন প্রবাসী। মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করে দেওয়ায় জয়কে আমেরিকার নাগরিকত্ব নিতে হয়েছে। তাই ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০০৬-০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়। তিনি জেলে ছিলেন। সেই সময়েই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলায় সাক্ষ্য দিতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এসবিআইয়ের গোয়েন্দা কর্তারা ঢাকার আদালতে হাজিরা দেন। এরপর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক। সেখানে ১৭ বছর রাজনীতি আশ্রয় ছিলেন বিএনপি নেতা। হাসিনা পুত্র বিএনপি চেয়ারম্যানকে আসন্ন গণভোট নিয়েও আক্রমণ শানান। তিনি বলেন, 'আমরা দেখেছি, তারেক রহমান এবং বিএনপি মাসের পর মাস এই গণভোটের বিরুদ্ধে সরব ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিন আগে দলটি সম্পূর্ণ উল্টো অবস্থান নিয়েছে এবং গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অথচ কিছুদিন আগেও তারা তাদের ভোটারদের 'না' ভোট দিতে বলছিল। এখন তারেক রহমান হঠাৎ করেই 'হ্যাঁ' ভোটের ঘোষণা দিলেন।
জয় বলেন, 'এখন তারেক রহমানকে বাংলাদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের নির্দেশ মেনে চলতে হচ্ছে, কারণ প্রধানমন্ত্রী হলেও তাঁকে তাই করতে হবে। যদি তিনি তা না করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলি সামনে আনতে পারে; তারা চাইলেই তাঁকে বাংলাদেশ থেকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে কারাগারে বন্দি করতে পারে।
ভার্চুয়াল ভাষণে জামাতে ইসলামী প্রসঙ্গে অনেক কথা বলেছেন হাসিনা পুত্র। তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের কোনও শক্তিশালী জনভিত্তি নেই। সব আসনে মিলিয়ে তাদের ভোট মাত্র ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ। হাতেগোনা কয়েকটি আসনে তাদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। যদি আওয়ামী লিগকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হতো, তবে জামায়াত ওই ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। এমনকি আওয়ামী লিগ নির্বাচনে না থাকলেও তাদের ভোটের হার প্রায় ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ সব দল অংশ নিলে তারা বড়জোর ১৫টি আসন পেতে পারত।
জয়ের কথায়, এই কারণেই জামায়াত সমর্থিত বর্তমান সরকারের জন্য আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ করাটা অত্যন্ত জরুরি ছিল। নিরপেক্ষ সংস্থাগুলির পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির জনপ্রিয়তা খুব একটা বাড়ছে না। বিএনপির ভোট ২০ শতাংশে আটকে আছে, আর জামায়াতের ভোট ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ এই দুই দল মিলে মোট ভোটের ৪০ শতাংশ। দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ হয় এখনও সিদ্ধান্তহীন অথবা সাম্প্রতিক জরিপগুলিতে অন্তত ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ বলতে ভয় পাচ্ছে তারা কাকে ভোট দেবে। কেন তারা বলতে ভয় পাচ্ছে? কারণ দেশে এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে, কেউ যদি বলে সে আওয়ামী লিগকে ভোট দিতে চায়, তবে তার ওপর হামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জয়ের দাবি, এমন ভয়ের পরিবেশেও ১১ শতাংশ মানুষ বলছে তারা আওয়ামী লিগকে ভোট দেবে। ঠিক এই কারণেই এই সরকারের জন্য দেশের বৃহত্তম প্রগতিশীল দলটিকে নিষিদ্ধ করাটা জরুরি ছিল। কারণ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লিগ জিতে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা ছিল। তারা সেই ঝুঁকি নিতে চায়নি। তাই জামায়াত আশা করছে যে, নির্বাচন যদি কিছুটা কারচুপি করা যায়, তবেই তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে।'
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন হাসিনা পুত্র। তিনি বলেন,
'বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই সরকার পোস্টাল ব্যালট বা ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, অতীতে কেন বাংলাদেশে পোস্টাল ব্যালটের অনুমতি দেওয়া হয়নি? কারণ অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এই ভোটগুলি যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন। এই ভোটগুলি কোথায় গেল, কে পূরণ করল এবং কারা ফেরত পাঠাল—সে বিষয়ে আপনার কোনও ধারণাই থাকবে না।
ইতিমধ্যেই ইন্টারনেটে অনেক ভিডিও সামনে এসেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, হাজার হাজার পোস্টাল ব্যালট (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা) একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী খুলে গণভোটের পক্ষে 'হ্যাঁ' লিখে পূরণ করছে। এটাই এখনকার বাস্তবতা। নির্বাচনের দিন যদি আপনি সরাসরি ব্যালট বাক্স ভর্তি করেন, তবে তা সাংবাদিকদের চোখে পড়ে যাবে। কিন্তু পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে বিদেশি পর্যবেক্ষক বা সাংবাদিকদের দেখার কোনও সুযোগ নেই; তারা শুধু নির্বাচন কমিশনের ক্যামেরা দেখতে পান।'
জয় বলেছেন, জামায়াত ক্ষমতায় আসুক বা না আসুক, আওয়ামী লিগ এবং অন্যান্য প্রগতিশীল দলগুলি মাঠের বাইরে থাকায় জামায়াত এমন এক বিশাল সুবিধা পেতে যাচ্ছে যা তারা অন্য কোনওভাবে পেত না। যেখানে তাদের সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০টি আসন পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন তারা তাদের প্রকৃত জনপ্রিয়তার চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য পেতে যাচ্ছে।'
জয় বলেন, 'আপনারা সম্প্রতি শুনেছেন যে জামায়াত প্রধান নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। অতীতেও তারা বারবার এমনটা করেছে। তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রই হল জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। মানুষ প্রায়ই বুঝতে ভুল করে; মুসলমান হিসেবে আমরা মডারেট বা মধ্যপন্থী। যখন আমরা রাজনৈতিক দল গঠন করি, তখন আমরা উদারপন্থী বা রক্ষণশীল রাজনৈতিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে করি। আমরা অন্যান্য দেশের মতোই ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করি না। আপনি নিজেকে 'ধর্মীয় দল' হিসেবে তখনই পরিচয় দেন, যখন আপনার লক্ষ্য থাকে ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
আপনারা দেখেছেন, জামায়াত সমর্থিত এই সরকার ইতিমধ্যে জঙ্গিদের মুক্তি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরিচিত আল-কায়েদা সদস্যরা এখন এই সরকারের অধীনে বাংলাদেশে অবাধে বিচরণ করছে। এমনকি লস্কর-ই-তৈবার কমান্ডারদের বাংলাদেশের জনসভায় বক্তব্য দিতে দেখা গেছে।'
সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ভারতের নিরাপত্তাও নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, 'ভারতের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বিএনপি ক্ষমতায় আসুক বা না আসুক, জামায়াতে ইসলামী বাইরে থেকে বড় প্রভাব বিস্তার করতে যাচ্ছে। বিএনপি সরকার হবে মার্কিন দূতাবাসের একটি পুতুল সরকার। এর ফলে জামায়াত তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে অবাধ সুযোগ পাবে। ভারতের জন্য তার পূর্ব সীমান্ত নিয়ে এটি অত্যন্ত গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। ভারত সরকারের অনেকেই হয়তো মনে করছেন তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাস্তবে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।'
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই আসন্ন নির্বাচনকে এখনই 'অবাধ ও সুষ্ঠু নয়' বলে প্রত্যাখ্যান করা। শুধু আওয়ামী লিগ নিষিদ্ধ বলেই নয়, বরং সব প্রগতিশীল দলই এখন কার্যত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে। এটি কোনও নির্বাচন নয়। এটি স্রেফ একটি সাজানো নাটক। যদি আপনারা এই নাটকটি হতে দেন এবং সময় থাকতে এর বিরুদ্ধে আওয়াজ না তোলেন, তবে তারা এটি সম্পন্ন করে ফেলবে। এর ফলে বাংলাদেশ একটি 'রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত' সরকার পাবে। এরপর বাংলাদেশের ভাগ্যে কী ঘটবে তা অত্যন্ত অস্পষ্ট। এই অবস্থা কতদিন চলবে তা অনুমান করাও অসম্ভব।'
তিনি বলেন, আওয়ামী লিগ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে কোথাও হারিয়ে যাবে না। দেশের অন্তত ৪০% মানুষের সমর্থন এখনও এই দলের ওপর রয়েছে। আমরা এমন একটি দল যা মানুষের কাছে প্রগতিশীলতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক। কোটি কোটি ভোটারের মন রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়, এমনকি কয়েক বছর বা দশকেও তা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছর বাংলাদেশ কোন পথে যাবে? আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন জানাচ্ছি—এই নির্বাচনের বিরুদ্ধে এখনই আওয়াজ তুলুন, কারণ হাতে কম সময় আছে।
জয় বলেন, 'ভোটার উপস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তা করা এখন অর্থহীন। কারণ তারা পোস্টাল ব্যালট জালিয়াতি করছে এবং ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশে বর্তমানে এটাই ঘটছে। হাজার হাজার ভুয়া পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে ভোটের হারকে বাড়িয়ে দেখানো হবে এবং এই জালিয়াতির নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।'
হাসিনা পুত্র বলেন, 'আমি আওয়ামী লিগের হয়ে বলছি না, বরং গণতন্ত্রের খাতিরে বলছি—যদি আপনারা মনে করেন মানুষ আওয়ামী লিগকে ভোট দেবে না, তবে দিন না তাদের সেই সুযোগ! আওয়ামী লিগ নির্বাচনে অংশ নিলে আপনাদের কীসের ভয়? আসলে আপনাদের এই ভয়টাই প্রমাণ করে জামায়াতে ইসলামীকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার শেষ চেষ্টা চলছে। এই উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ আগামী পাঁচ থেকে দশ বছর, এমনকি তার চেয়েও বেশি সময় ধরে দেশের ওপর চেপে বসতে পারে।'
হাসিনা পুত্র বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'একদিকে আমাদের একটি দুর্বল সরকার থাকবে যারা বিদেশি শক্তির পুতুল হিসেবে কাজ করবে, আর অন্যদিকে থাকবে জঙ্গিরা। সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হবে এবং দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে। অতীতেও আমরা এমনটা দেখেছি।'
তাঁর দাবি, গত ১৭ বছরের ইতিহাসে সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লিগের আমলেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ছিল। এটিই একমাত্র সময় যখন বাংলাদেশ সন্ত্রাসমুক্ত ছিল। ভারতের ইতিহাসে তাদের পূর্ব সীমান্ত কেবল আওয়ামী লিগ সরকারের ১৭ বছরেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ছিল—বিচ্ছিন্নতাবাদ বা সন্ত্রাসবাদের কোনও ভয় ছিল না। এগুলি কোনও দাবি নয়, এগুলি ঐতিহাসিক সত্য।'
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং জঙ্গিদের নজিরবিহীন উত্থান নিয়ে লেখা একটি বইয়ের আলোচনা সভাঢ় সজীব ওয়াজেদ জয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আসন্ন "প্রহসনমূলক" নির্বাচনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার আবেদন জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, এই নির্বাচন এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে একটি দুর্বল সরকার ক্ষমতায় বসানো যায়, যারা তাদের বিদেশি প্রভু যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত থাকবে। এর ফলে ইতিমধ্যে শক্তিশালী হয়ে ওঠা জঙ্গিদের জন্য আগের চেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লিগের ওপর বিচারবহির্ভূত ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সকল প্রগতিশীল দলকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যা মূলত মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী জামায়াতে ইসলামীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে।
ভার্চুয়াল বক্তৃতায় সজীব ওয়াজেদ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা এবং এর ফলে বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে তাঁর মা ও দেশের বৃহত্তম দল আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে প্রচারিত একতরফা বয়ান তৈরির বিরোধিতা করে তা খণ্ডন করার চেষ্টা করেন।
তিনি প্রতিটি মৃত্যুর জন্য একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি জানান এবং উল্লেখ করেন যে, মহম্মদ ইউনুসের ইউনুস নেতৃত্বাধীন সরকার একটি প্রহসনের বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় পুলিশ ও আওয়ামী লিগ কর্মীদের হত্যাকারীদের দায়মুক্তি প্রদান করেছে।
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটা কমানোর দাবিতে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন ছিল, তা ছিল একটি ন্যায্য দাবি। অধিকাংশ মানুষই জানেন না যে, আমাদের সরকার কয়েক বছর আগেই কোটা পদ্ধতি বাতিল করেছিল। আমাদের সরকার জনগণের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এবং সঠিক বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছিল। আমরা বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। সে সময় বিরোধী দল, জঙ্গি এবং সিআইএ (সিআইএ) এই সুযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং আন্দোলনকে সহিংস রূপ দেয়। আপনারা দেখেছেন সেখানে অস্ত্রধারী জঙ্গিরা ছিল যারা পুলিশ স্টেশনে হামলা চালিয়েছে।
তিনি বলেন, আদালতে উপস্থাপিত আমার মায়ের অডিও রেকর্ডিংগুলো যদি আপনারা শোনেন, তবে সেখানে সশস্ত্র জঙ্গিদের পুলিশে ওপর হামলা নিয়ে আলোচনা শুনতে পাবেন; এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠেছিল।
জয় বলেন, প্রতিটি মৃত্যুই অত্যন্ত দুঃখজনক। যখন এই ঘটনাগুলো ঘটছিল, আমাদের সরকার কোনো মৃত্যুই চায়নি। এই সহিংসতা জঙ্গিদের দ্বারা শুরু হয়েছিল, সরকারের পক্ষ থেকে নয়।
গত ১৭ মাস ধরে (প্রসঙ্গ অনুযায়ী সময়কাল) একটি অনির্বাচিত সরকার জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতা দখল করে আছে। শুধু তাই নয়, এই সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথম যে কাজগুলো করেছে তার মধ্যে একটি হলো সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের জেল থেকে মুক্তি দেওয়া। এরা সেই সন্ত্রাসী যারা হলি আর্টিজান হামলা, ব্লগার হত্যা এবং মার্কিন দূতাবাসের স্থানীয় কর্মী হত্যার দায়ে দণ্ডিত হয়েছিল। আমাদের সরকার তাদের বিচার করেছিল এবং কারাগারে পাঠিয়েছিল। কিন্তু এই সরকার তাদের মুক্তি দিয়েছে, কারণ এই সরকার ইসলামপন্থী এবং উগ্রবাদীদের দ্বারা সমর্থিত।
আপনারা কি মনে করেন আন্দোলনকারীরা জঙ্গি ছিল? না, আন্দোলনকারীরা জঙ্গি ছিল না। জঙ্গিরা এই আন্দোলনের পেছনে ঢুকে পড়েছিল। তারা টেলিভিশন এবং ফেসবুকে রেকর্ড দিয়ে স্বীকার করেছে যে—আমরা যদি পুলিশ হত্যা না করতাম, স্থাপনা পুড়িয়ে না দিতাম, তবে আমরা সফল হতাম না।
কেন ইউনুসকে জঙ্গিরা সমর্থন দিচ্ছে
ইউনুস এবং বর্তমান সরকার জঙ্গিদের কাছে ঋণী। তাই তারা তাদের দ্বারা সমর্থিত। বর্তমান এই সরকার আসলে একটি জঙ্গি সরকার। তারা সকল সহিংসতার দায় 'মব জাস্টিস' বা গণপিটুনির ওপর চাপিয়ে এড়িয়ে যেতে চায়। ইউনূসের প্রেস সচিব এদের 'প্রেসার গ্রুপ' বা চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করেন। মূলত তারা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মানুষের ওপর হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করে। তারা বিচারকদের হুমকি দেয় যে। তারা বলে,'আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী রায় না দিলে আপনার বাড়ি ঘেরাও করা হবে এবং আপনাকে মারধর করা হবে।' গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে তাদের নীতি হল, 'আমাদের বিরুদ্ধে কথা বললে অফিস পুড়িয়ে দেব।' ২০২৪ সালের আগস্টেই এটি ঘটেছে; বেশ কিছু প্রগতিশীল টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রের অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি অতি সম্প্রতি দুটি বড় দৈনিকের অফিসেও আগুন দেওয়া হয়েছে।
কেন আসন্ন নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ
দেশের অনেক মানুষের মনে এমন একটি স্বস্তি কাজ করতে পারে যে, নির্বাচন হলে অন্তত এই সরকারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা কী? বাস্তবতা হল, তারা (বর্তমান সরকার) সবকিছুর জন্য আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করে। তারা বলে, "আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ করতে হবে কারণ তারা ছাত্র হত্যা করেছে।' আমি এর পূর্ণ দায় নিচ্ছি। আন্দোলনের সময় অনেক নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ এবং শিক্ষার্থী মারা গেছেন। একইভাবে, অনেক পুলিশ সদস্য এবং আমাদের অনেক কর্মীও নিহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের রিপোর্টে, ১৪০০ জন নিহতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই তালিকায় ৫ই আগস্ট থেকে ১৫ অগস্টের মধ্যে নিহত হওয়া শত শত মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে অর্থাৎ আমাদের সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পরবর্তী ১০ দিনের ঘটনা। তারা ছিল আমাদের কর্মী, তারা ছিল আমাদের পুলিশ সদস্য। একটি ঢালাও বিবৃতিতে জাতিসংঘের সেই রিপোর্টে পুলিশ এবং আওয়ামী লিগ কর্মীদের হত্যার দায়ও আওয়ামী লিগের ওপর চাপানো হয়েছে, যখন কি না আওয়ামী লিগ ক্ষমতায় পর্যন্ত ছিল না। পরিস্থিতি কতটা হাস্যকর, এটি তারই প্রমাণ।
তিনি বলেন, অন্যদিকে, আমার মা ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমাদের সরকার প্রতিটি হত্যাকাণ্ড তদন্তের জন্য একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। পুলিশের হাতে মৃত্যু, পুলিশের মৃত্যু, সাধারণ নাগরিক বা দলীয় কর্মী—দলমত নির্বিশেষে সবার মৃত্যুর তদন্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আমাদের সরকার কাউকে কোনো 'ইন্ডেমনিটি' বা দায়মুক্তি দেয়নি। আমরা ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার করেছিলাম।
বিপরীতে, এই বর্তমান সরকার ক্ষমতা নিয়েই একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে, যার মাধ্যমে পুলিশ সদস্য এবং আওয়ামী লিগ কর্মীদের হত্যার সাথে জড়িতদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সেই হত্যাকাণ্ডগুলোকে 'মব জাস্টিস' বা গণপিটুনি বলে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। যারা এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে, তাদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আমরা একটি নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি। আর তারা আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ করেছে।"
হাসিনা পুত্র বলেন, আওয়ামী লিগের ওপর কার্যত একটি নিষেধাজ্ঞা চলছে। তবে বাস্তবে সব প্রগতিশীল দলের ওপরই এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা কাজ করছে। নির্বাচনটি এখন কেবল দুই দলের দৌড়ে পরিণত হয়েছে—বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি তাদের অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেক নেতা এখন কারাগারে। এমনকি অনেক নেতার বাড়িঘরও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের কোনো নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হচ্ছে না, জনসমক্ষে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। সব প্রগতিশীল দলকে দমন করে রাখা হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত একতরফা নির্বাচন। একে আদৌ কোনো নির্বাচন বলা যায় না।
জয় একই সঙ্গে বলেছেন, বিএনপি, যারা দেশের অন্যতম বড় দল। আজ হোক বা কাল, বিএনপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা ছিলই।