ওসমান হাদির মৃত্যুর পর উত্তাল ঢাকায় সংবাদমাধ্যমে হামলা ও অগ্নিসংযোগ। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে আটকে পড়া প্রায় ৩০ জন সাংবাদিককে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করল বাংলাদেশ সেনা।

সংবাদমাধ্যমের অফিসে আগুন
শেষ আপডেট: 19 December 2025 10:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঢাকার বৃহস্পতিবারের রাতটা হঠাৎ করেই বদলে গেল। আগুনের লেলিহান শিখা, কালো ধোঁয়া আর আতঙ্কে কাঁপতে থাকা সাংবাদিকদের আর্তচিৎকার-সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজধানী (Dhaka) যেন আবার অশান্ত রাজনীতির কেন্দ্রে। ৩২ বছরের যুবনেতা শরিফ ওসমান হাদির (Sharif Osman Hadi) মৃত্যুর পর নতুন করে জ্বলে উঠল দেশ।
এদিন গভীর রাতে ওসমান হাদির সমর্থকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে। সেই বিক্ষোভের নিশানায় পড়ে দেশের দুই প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো (Prothom Alo) এবং দ্য ডেইলি স্টার (The Daily Star)।
ঘটনার শুরু রাত প্রায় ১১টা নাগাদ। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, কয়েকশো বিক্ষোভকারী স্লোগান দিতে দিতে প্রথম আলো অফিসের সামনে জড়ো হয়। প্রথমে ভাঙচুর, তারপর আগুন। অল্প সময়ের মধ্যেই গোটা অফিস চত্বরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যরাতের দিকে একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয় দ্য ডেইলি স্টার-এর কারওয়ান বাজার (Kawran Bazar) অফিসে। বাইরে থেকে ফোন করে সতর্ক করা হয়েছিল-ভিড় এগোচ্ছে। কিন্তু তার আগেই হামলাকারীরা ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোর ও প্রথম তলায় ঢুকে ভাঙচুর চালায় এবং আগুন লাগিয়ে দেয়।
ভবনের ভিতরে আটকে পড়েন নাইট শিফটে কাজ করা সাংবাদিকরা। ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়া দায় হয়ে ওঠে। দ্য ডেইলি স্টার-এর সাংবাদিক জাইমা ইসলাম (Zyma Islam) তখন ফেসবুকে লেখেন, “আমি আর শ্বাস নিতে পারছি না। চারদিকে ধোঁয়া। আমি ভিতরে আটকে আছি। তোমরা আমাকে মেরে ফেলছ।” সেই পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ ছড়ায় গোটা সাংবাদিক মহলে।
প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই ছাদে উঠে যান। চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে উদ্ধারকাজ। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনা (Bangladesh Army) ও দমকল বাহিনী (Fire Service)-এর যৌথ অভিযানে অন্তত ২৫ জন সাংবাদিককে নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়। রাত প্রায় ২টো নাগাদ আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও, উত্তেজিত ভিড়ের জন্য উদ্ধার কাজ শেষ হতে আরও বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়।
এক দ্য ডেইলি স্টার কর্মী মাহমুদ হাসান (Mahmud Hasan) সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “সবাইকে নিরাপদ জায়গায় সরানো গেছে। বাংলাদেশ সেনা ও ফায়ার সার্ভিসকে ধন্যবাদ।” তিনি বিশেষভাবে এক সেনা মেজরের সাহসিকতার প্রশংসা করেন, যাঁর নেতৃত্বে পুরো উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন হয়। তুলনা টানা হয় জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্র ‘মেজর রানা’ (Major Rana)-র সঙ্গে, যাঁকে সৃষ্টি করেছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন (Kazi Anwar Hossain)।
ঘটনার পরপরই দ্য ডেইলি স্টার অফিসের সামনে সেনা মোতায়েন করা হয়। তবে উত্তেজনার আঁচ ততক্ষণে আরও ছড়িয়ে পড়েছে। সম্পাদক পরিষদের (Editors’ Council) সভাপতি ও নিউ এজ (New Age) পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির (Nurul Kabir)-কে হেনস্থা করার ঘটনাও সামনে আসে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল উত্তেজিত জনতা তাঁর চুল টেনে ধরে মারধর করছে। সাংবাদিক সমাজে এই ছবি প্রবল ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-কেন এই হামলা? প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টার, দুই সংবাদমাধ্যমই মহম্মদ ইউনুস (Muhammad Yunus) ও তাঁর অন্তর্বর্তী সরকারের (Interim Government) প্রতি তুলনামূলক সহানুভূতিশীল বলেই পরিচিত। তা সত্ত্বেও কেন তাদের টার্গেট করা হল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রশাসনের তরফে নির্দিষ্ট কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি।
ওসমান হাদির মৃত্যু ঘিরে ক্ষোভ, হতাশা আর রাজনৈতিক উত্তেজনা-সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আবার এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে। সংবাদমাধ্যমের ওপর এই সরাসরি হামলা শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার (Press Freedom) প্রশ্নই তুলছে না, গোটা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও বড় আশঙ্কা তৈরি করছে। ঢাকার সেই রাত তাই শুধু আগুনের নয়, ভয় আর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নে ভরা এক দীর্ঘ অন্ধকারের নাম।