ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির অকালমৃত্যু কেন ফের অশান্ত করে তুলল বাংলাদেশকে, রাজনীতি থেকে রাজপথে উত্তাপের নেপথ্যে কী কারণ।

ওসমান হাদি (ছবি- ফেসবুক)
শেষ আপডেট: 19 December 2025 09:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির (Osman Hadi) বৃহস্পতিবার মৃত্যু হয়েছে। ঢাকায় তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল দুষ্কৃতীরা। গুরুতর আহত হওয়ার পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসকদের সর্বাত্মক চেষ্টার পরও শেষরক্ষা হয়নি।
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন এলাকার কালভার্ট রোডে টোটোয় চড়ে যাওয়ার সময়ে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা খুব কাছ থেকে গুলি চালায় ওসমান হাদির মাথায়। প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখান থেকে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের নিউরোসার্জিক্যাল আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়।
আমিও হাদি হব
বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ঢাকার রাস্তায় স্লোগান উঠেছে, ‘আমিও হাদি হব, গুলির মুখে কথা কবো’। রাগে ক্ষোভে বিপুল সংখ্যক মানুষ যেন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। ওসমান হাদিকে নিয়ে আবেগ এমনই।
শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে উঠে আসা এক ব্যতিক্রমী ছাত্রনেতা। বয়সে তরুণ হলেও ২০২৪ সালের ছাত্র অভ্যুত্থানের সময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র হিসেবে রাজপথে, মিছিলে এবং সামাজিক মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠ ছিল স্পষ্ট, ধারালো ও আপসহীন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তাঁর আশপাশের ছাত্র রাজনীতির পরিসরেই ওসমান হাদির উত্থান। প্রথম দিকে তিনি পরিচিত ছিলেন ছাত্র অধিকার, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার এক সংগঠক হিসেবে। ধীরে ধীরে তাঁর নেতৃত্বগুণ ও সংগঠনের ক্ষমতা তাঁকে ছাত্র রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে আসে।
ইনকিলাব মঞ্চ ও জুলাই অভ্যুত্থান
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে যে ছাত্র আন্দোলন ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়, তার অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল ইনকিলাব মঞ্চ। এই প্ল্যাটফর্মটি গড়ে ওঠে মূলত শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজের ক্ষোভকে সংগঠিত করতে। ওসমান হাদি ছিলেন এই মঞ্চের প্রধান কণ্ঠস্বর।
মিছিলে তাঁর স্লোগান, সমাবেশে তাঁর বক্তব্য এবং ক্যামেরার সামনে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘ভয় না পাওয়া নেতা’, আবার সরকারের সমর্থক মহলে তাঁকে দেখা হতো এক ‘বিপজ্জনক উস্কানিদাতা’ হিসেবে।
রাজনীতির মূল স্রোতে প্রবেশের চেষ্টা
ইনকিলাব মঞ্চ ভেঙে দেওয়া হলেও ওসমান হাদি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং তিনি ঘোষণা করেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকার একটি আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়বেন। ঢাকার রাজপথে তাঁর প্রচার শুরু হয়েছিল—ছোট সভা, পথসভা, নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপই ছিল তাঁর রাজনৈতিক কৌশল।
মৃত্যুর পর বাংলাদেশ (Turbulent Bangladesh)
তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই ঢাকার শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, অবস্থান ও প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়। উত্তেজনার মধ্যেই রাতভর একাধিক স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের দপ্তরেও হামলার অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতির জেরে শুক্রবার এই দুই দৈনিক পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি, অনলাইন পরিষেবাও কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
অশান্তির আঁচ ছড়িয়েছে ঢাকার বাইরেও। চট্টগ্রাম, রাজশাহী-সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সহিংস ঘটনার খবর মিলেছে। এমনকি ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ময়মনসিংহের ভালুকায় এক হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগও উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ওসমান হাদির মৃত্যুর পর জাতির উদ্দেশে ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মহম্মদ ইউনুস শোকপ্রকাশ করেন। তিনি জনগণকে ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং অপপ্রচার ও গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ করেন। একইসঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেন তিনি।
ওসমান হাদির অকাল মৃত্যু তাঁকে যেন একটি প্রতীকে পরিণত করেছে। সমর্থকদের চোখে তিনি হয়ে উঠেছেন রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক, আর সমালোচকদের মতে তিনি বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতিরই এক পরিণতি। এও স্পষ্ট যে—ওসমান হাদির জীবন ও মৃত্যু বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি ও তরুণ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।