ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হাদির। টানা সাত দিনের জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে কী কী ঘটেছিল ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়কের সঙ্গে?

ওসমান হাদি (ছবি- ফেসবুক)
শেষ আপডেট: 19 December 2025 08:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঢাকা উত্তাল। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি (Osman Hadi) গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর টানা সাত দিনের জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষ পর্যন্ত থামল সিঙ্গাপুরে। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টা নাগাদ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর। এই সাত দিনে শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাচেষ্টার তদন্তই এগোয়নি, একের পর এক ঘটনায় নড়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও রাজপথ।
১২ ডিসেম্বর
ঘটনার সূত্রপাত ১২ ডিসেম্বর। শুক্রবার জুমার নমাজের পর ঢাকার পুরানা পল্টনের (Purana Paltan) বক্স কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাচ্ছিলেন ওসমান। সঙ্গে ছিলেন এক পরিচিত। ফকিরাপুল দিক থেকে বিজয়নগরের দিকে যাওয়ার সময় পিছন থেকে একটি মোটরসাইকেল তাঁদের অনুসরণ করে। বেলা ঠিক ২টা ২৪ মিনিটে চলন্ত রিকশার পাশ ঘেঁষে মোটর সাইকেলের পেছনে বসে থাকা ব্যক্তি খুব কাছ থেকে গুলি চালায়। কানে ঢুকে মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে যায় গুলি। ফাঁকা রাস্তায় মুহূর্তেই দুষ্কৃতীরা চম্পট দেয় বাইক নিয়ে।
রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (Dhaka Medical College Hospital)। সেখানকার পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। লাইফ সাপোর্টে রাখতে হবে। প্রাথমিক অস্ত্রোপচারের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই স্থানান্তর করা হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে (Evercare Hospital)।
ওসমান হাদির ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানী-সহ বিভিন্ন জেলায় শুরু হয় বিক্ষোভ-মিছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন এই হামলা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস (Muhammad Yunus) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেন।
১৩ ডিসেম্বর
পরদিন, ১৩ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ (DMP) জানায়, হামলাকারী হিসেবে একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁর নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ওরফে রাহুল। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের (Chhatra League) নেতা ছিলেন তিনি। র্যাব জানায়, অতীতে অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার হয়ে জামিনে মুক্ত ছিলেন। তাঁকে ধরিয়ে দিতে ঘোষণা করা হয় ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ (Operation Devil Hunt Phase-2) শুরু হচ্ছে।
১৪ ডিসেম্বর
তদন্ত যত এগোয়, ততই ভয়ংকর চিত্র সামনে আসে। ১৪ ডিসেম্বর জানানো হয়, পরিকল্পিতভাবে কয়েক মাস ধরে রেকি চালিয়ে হামলা করা হয়েছে। গুলি চালায় ফয়সাল, বাইক চালাচ্ছিল আলমগীর শেখ-যুবলীগ (Jubo League) ঘনিষ্ঠ। তাঁদের সঙ্গে ছিল আরেক সহযোগী জাকির। হামলার পর পালানোর ছকও আগে থেকেই তৈরি ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, ১২ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁরা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত (Haluaghat Border) পেরিয়ে ভারতে পালান।
এদিকে একের পর এক গ্রেফতার শুরু হয়। মোটরসাইকেলের কথিত মালিক মো. আবদুল হান্নান, ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা সবাই আটক হন। পরে মানব পাচারে সহায়তার অভিযোগে ধরা হয় সঞ্জয় চিসিম ও সিমিরন দিওকে। অস্ত্র উদ্ধার হয় নরসিংদীর (Narsingdi) বিল এলাকা থেকে।
১৫ ডিসেম্বর
১৫ ডিসেম্বর আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে করে ওসমান হাদিকে নিয়ে যাওয়া হয় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (Hazrat Shahjalal International Airport)। সেখান থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর। দেশজুড়ে তখন উৎকণ্ঠা। শহিদ মিনারে সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশ হয়। রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্যে একটাই সুর—এই হামলা বিচ্ছিন্ন নয়।
১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর
১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে আসে উদ্বেগজনক খবর। আরও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন, কিন্তু শরীর সাড়া দিচ্ছে না। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণন (Vivian Balakrishnan) নিজে হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নেন। ফোনে অধ্যাপক ইউনুসকে জানান, অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক।
১৮ ডিসেম্বর
১৮ ডিসেম্বর সব জল্পনার অবসান। রাতে জানানো হয়, ওসমান হাদি আর নেই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধাদের চোখে যিনি ছিলেন অকুতোভয় লড়াকু, তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে ঢাকায়। একই সঙ্গে নতুন করে জ্বলে ওঠে ক্ষোভ, প্রশ্ন আর অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ বুঝে নেয়-এ শুধু একজন নেতার মৃত্যু নয়, এর অভিঘাত আরও গভীর।