Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
UCL: চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ চারে পিএসজি-আতলেতিকো, ছিটকে গেল বার্সা-লিভারপুল‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?১৮০ নাবালিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোষণ! মোবাইলে মিলল ৩৫০ অশ্লীল ভিডিও, ধৃতের রয়েছে রাজনৈতিক যোগ ৩৩ বছর পর মুখোমুখি ইজরায়েল-লেবানন! ওয়াশিংটনের বৈঠকে কি মিলবে যুদ্ধবিরতির সমাধান?ইউরোপের আদালতে ‘গোপনীয়তা’ কবচ পেলেন নীরব মোদী, জটিল হচ্ছে পলাতক ব্যবসায়ীর প্রত্যর্পণ-লড়াইইরানের সঙ্গে সংঘাত এবার শেষের পথে? ইঙ্গিত ভ্যান্সের কথায়, দ্বিতীয় বৈঠকের আগে বড় দাবি ট্রাম্পেরওIPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?

নেপাল আর বাংলাদেশ এক নয়, বললই না আওয়ামী লিগ, হাসিনার দলের প্রধান সংকট রাজনেতিক প্রজ্ঞা

ধৌলী এক্সপ্রেসে নেপালের পর্যটকদের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল সংবাদমাধ্যমে তখন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের একটি রিপোর্ট নিয়ে চর্চা চলছিল। 

নেপাল আর বাংলাদেশ এক নয়, বললই না আওয়ামী লিগ, হাসিনার দলের প্রধান সংকট রাজনেতিক প্রজ্ঞা

নিশান্ত চৌধুরী

শেষ আপডেট: 12 September 2025 16:49

অমল সরকার

মাস কয়েক আগে পুরী-হাওড়া ধৌলী এক্সপ্রেসে আমার সঙ্গে নেপালের একদল পর্যটকের আলাপ হয়েছিল। তাঁরা জগন্নাথ দর্শন এবং সমুদ্র দেখা, এই জোড়া উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। ইদানীং ধৌলী এক্সপ্রেসে যাতায়াত কী যন্ত্রণাদায়ক আমার জানা ছিল না। সময়ের কোনও মা-বাপ নেই। নেপালি সহযাত্রীদের একজন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, 'তবু তো আপনারা গোটা দেশ ট্রেনে করে ঘুরতে পারেন। আগামী একশো বছরেও আমাদের দেশে এমন ট্রেন পরিষেবা মিলবে কিনা সন্দেহও। আমাদের দেশে রেলপথ নেই বললেই চলে।'

কথায় কথায় তাঁদের একজন বলেন, গণঅভ্যুত্থানটা ভুল জায়গায় হয়েছে। ঢাকা নয়, ওটা আগে কাঠমান্ডুতে হওয়ার দরকার ছিল। আজ নেপালের অভ্যুত্থানকারী তরুণ সমাজ যে কথা বলছে সেদিন নেপালের প্রৌঢ়, বৃদ্ধ পর্যটকদের মুখেও সেই কথাই শুনেছিলাম। ২০১৫-তে আমাদের এই পার্শ্ববর্তী দেশটি ভয়াবহ ভূমিকম্পে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। নেপালের মানুষের দারিদ্র্য তখন অন্য একভাবে সামনে এসেছিল। ভূমিকম্প বিধ্বস্ত দেশটিতে শত শত প্রাইভেট বিমাম নেমেছিল অন্তসত্ত্বা নেপালি মহিলাদের তুলে নিয়ে যেতে। তাদের গর্ভে তখন ইউরোপ আমেরিকার বিত্তবানদের সন্তান। জড়ায়ু ভাড়া দেওয়া দারিদ্র্যপীড়িত নেপালের মহিলাদের রোজগারের একটা উপায়। সেই ভূমিকম্পের আগে  নেপাল সফরে কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কলকাতার বিমান ধরতে গিয়ে দেখি এয়ারপোর্টে তিল ধারনের জায়গা নেই। ১৪-১৫ থেকে ২০ ২২ বছর বয়সি তরুণদের ভিড়। তারা চাকরির সন্ধানে বিদেশে যাচ্ছে। অধিকাংশে স্কুলের গণ্ডিও পেরোয়নি। তাদের ইমিগ্রেশনের কাগজপত্র তৈরি করে দিতে বিমানবন্দরের ভিতরেই কিছু লোক চেয়ার টেবিল নিয়ে বসে পড়েছে। পরিযায়ী শ্রমিক হতে বিদেশে পাড়ি দিতে চলা সেই নেপালি তরুণদের ভিড় সামলে সামনে এগনো যাচ্ছিল না। কলকাতার বিমান মিস হওয়ার জোগার হয়েছিল।

ধৌলী এক্সপ্রেসে নেপালের পর্যটকদের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল সংবাদমাধ্যমে তখন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের একটি রিপোর্ট নিয়ে চর্চা চলছিল। মহম্মদ ইউনুস সরকার একটি তদন্ত রিপোর্ট তুলে ধরে দাবি করে শেখ হাসিনার সময়ে কী বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। নেপালি পর্যটকের একজন কর্মসূত্রে বেশ কয়েক মাস বাংলাদেশে ছিলেন। তিনি বলেন,  বাংলাদেশে চুরি, দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। তবে হাসিনা জমানায় কাজও হয়েছে বিপুল। আমার চোখের সামনে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল হয়েছে। কাঠমান্ডুর গণঅভ্যুত্থানের খবরাখবর দেখে আমার নেপালের সেই পর্যটকদের কথা মনে পড়ছে। ষড়যন্ত্র একটা থাকতে পারে। তবে মানুষের মনে যে অসীম ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল তা ওই পর্যটকদের কথাতেও স্পষ্ট ছিল। এইভাবে ক্ষমতার হাত বদলে অবস্থার পরিবর্তন কতটা হবে তা নিয়ে সংশয় বাংলাদেশের চলতি পরিস্থিতির মধ্যেই বিদ্যমান। অভ্যুত্থানে ক্ষমতার হাত বদল হয়ে আমেরিকার একটি পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র। বিগত তেরো মাসে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ নেই। রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রটাই বদলে গিয়েছে। যদিও চুরি-দুর্নীতি, অনাচার আরও মাত্রা ছাড়িয়েছে।

নেপালের ঘটনাবলীর খবরে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম ছিল, 'ঢাকার পুনরাবৃত্তি কাঠমান্ডুতে'। নেপালের রাজধানীর ঘটনাবলী যেভাবে এগিয়েছে তাতে ঢাকা তথা বাংলাদেশের সঙ্গেই মিল বেশি।তাই বলে নেপাল আর বাংলাদেশ এক নয়। শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরেছিলেন ২০০৮-র সাধারণ নির্বাচনে। সেই বছরই নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা। তারপর নেপালে তেরো বার সরকার বদল হয়েছে। এক-দু'জন নেতা তিন চারবার করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

তৃতীয় দূনিয়ার কোনও দেশে ১৬-১৭ বছর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক স্থিরতার জন্য মোটেই বেশি সময় নয়। মূল সমস্যা দুর্নীতি, নেতাদের জনবিচ্ছিন্নতা। এর সঙ্গে দেশটিকে ঘিরে অন্য দেশের অঙ্ক তো আছেই। সস্তায় নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করে সাধারণ নেপালিদের মনে জায়গা তৈরি করেছে চিন৷ পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ভারত বিরোধিতা। নরেন্দ্র মোদীর জমানায় নয়াদিল্লির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হল প্রতিবেশী দেশে ভারত বিরোধিতা রুখতে না পারা।

কিন্তু বাংলাদেশের হাসিনা জমানার সঙ্গে নেপালের ফারাক হল আওয়ামী লিগ সরকারের সময়ে দুর্নীতি, স্বজনপোষণের পাশাপাশি উন্নয়ন, বিশেষ করে অবকাঠামোর উন্নতি সমানতালে হয়েছে। পদ্মা সেতু, ঢাকায় মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর নীচ দিয়ে টানেল ইত্যাদি যেমন হয়েছে, তেমন মাথাপিছু আয়, মানোন্নয়নের নানা সূচকের উন্নতিও লক্ষণীয়।আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, আওয়ামী লিগের নেতারা কেউ পাল্টা এই কৃতিত্ব দাবি করলেন না। কোনও নেতা বললেন না, হাসিনা জমানায় বাংলাদেশে অনাহারে মৃত্যু কমেছে। বিদেশি ঋণ নিলেও সরকার ঋণ খেলাপি হয়নি।আওয়ামী লিগের নেতারা নীরব থেকে ইউনুস সরকারকে আরও বেশি আক্রমণত্মক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। লন্ডনের ফিন্যান্সিয়াল টাইমস হাসিনা জমানায় অর্থ লুটপাট নিয়ে একটি তথ্য চিত্র তৈরি করেছে। তাতে শুধু বিদেশে টাকা পাচারই নয়, আছে সেই টাকা উদ্ধার করে দেশে ফেরাতে ইউনুস সরকারের উদ্যোগের কথা। আমাকে ইউনুস সরকারের অনুগামীরা সেই তথ্যচিত্রের লিঙ্ক পাঠিয়েছেন। ধরে নেওয়া যায় আমার মতো আরও অনেক বিদেশি সাংবাদিককেও তাঁরা এই তথ্যচিত্র পাঠাচ্ছেন।  

অন্যদিকে, আওয়ামী লিগ কী করছে? এই দলের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সকলেই এখন বিদেশে। হাসিনা সহ অনেকে ভারতেও আছেন। তাঁরা কিন্তু এই ধারণার নির্মাণ করলেন না যে হাসিনা জমানাকে কেন নেপালের শাাকদের সঙ্গে তুলনা করা চলে না। গত বছর অগস্টের পর আমার আওয়ামী লিগের বহু নেতার সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি আশ্চর্য হয়েছি, বেশিরভাগেরই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কৌশল সম্পর্কে ধ্যানধারণা কম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তাঁদের আন্তরিকতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু স্বাধীনতা অর্ধ দশক পর যে রাজনৈতিক মেধা, কৌশল দিয়ে সমসাময়িক রাজনীতির মোকাবিলা জরুরি সেই বোধ অনেকেরই নেই।শুনছি, গত মাসে শেখ হাসিনার সঙ্গে দলের শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনের সাক্ষাতের পর সাধারণ সম্পাদক পদে ওবায়দুল কাদেরর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন তা নিয়ে কামড়াকামড়ি আরও বেড়েছে। কিন্তু আসল জায়গায় যে গলদ সেটা না সামাল দিতে পারলে আওয়ামী লিগ চলতি বিপদ থেকে সহজে রেহাই পাবে না।

নেতাদের এই দশার কারণ আমার মত, একটানা পনেরো বছর বিনা বাধায় সরকারি ক্ষমতাভোগ। ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে তোলে। রাজনীতে আওয়ামী লিগ সেই অন্ধত্বের শিকার। তাঁরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকার খেসারত দিচ্ছেন।আমার আরও মত হল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লিগের অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে বিএনপির হাত গুটিয়ে থাকায়। তারা জোরালো আন্দোলন গড়ে তুললে আওয়ামী লিগ নেতারাও মাঠে-ময়দানে ঘাম ঝরাতে বাধ্য হতেন। পশ্চিমবঙ্গে যেমন সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বাম সরকার ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল। তারপরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাম জমানার একজন মন্ত্রীকেও জেলে পুরতে পারেননি। কারণ তাঁরা লাগামহীন দুর্নীতি করেননি। ছোটখাটো অনিয়মেও ফুঁসে উঠতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।সেই তৃণমূল নেত্রীর সরকারের বিরুদ্ধে বাম-কংগ্রেস-বিজেপি তেমন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। তাতে তৃণমূলের ক্ষতি বই লাভ হয়নি।

আওয়ামী লিগের সমস্যা এখন বিস্তর। বিনা বাধায় পনেরো বছর ক্ষমতা ভোগের প্রায়শ্চিত্ত তাদের করতে হচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতি  মোকাবিলা করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে ক্ষমতা হারানোর আগে নেতাদের রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামহীন জীবনযাত্রা। মুজিব হত্যা পরবর্তী সময়ের সংকটের সঙ্গে দলের আজকের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এমনকী ৪৫ বছর আগে দেশে ফিরে দলের হাল ধরার সময় শেখ হাসিনা যাদের পাশে পেয়েছিলেন তেমন নেতানেত্রীরও আজ বড় অভাব। যাঁরা একই সঙ্গে দলের প্রতি অনুগত ও নিষ্ঠাবান ছিলেন।


```