দুর্গোৎসব সনাতন হিন্দুদের ধর্মীয় পূজা হলেও বাস্তবে এটি সমাজের সব ধর্ম-বর্ণ-পেশার মানুষের মিলনমেলা এবং অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির অনন্য উদাহরণ

শেষ আপডেট: 10 September 2025 21:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর দুর্গাপুজো নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন সে দেশের ২২জন বিশিষ্ট নাগরিক। এক বিবৃতিতে তাঁরা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার উদ্দেশে বলেছেন, আপনি নিজের মন্তব্যের জন্য প্রকাশ্য ক্ষমা চান।
বিবৃতিতে তাঁরা বলেছেন, দুর্গোৎসব সনাতন হিন্দুদের ধর্মীয় পূজা হলেও বাস্তবে এটি সমাজের সব ধর্ম-বর্ণ-পেশার মানুষের মিলনমেলা এবং অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির অনন্য উদাহরণ। এই পূজাকে ‘মদ-গাঁজা’ দিয়ে কলঙ্কিত করে মিথ্যা বানানো উসকানিমূলক তথ্য ছড়িয়ে কোনো উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যাবে না।’
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামাল, আইন ও সালিস কেন্দ্রের চেয়ারপারসন জেড আই খান পান্না, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও মানবিক বিভাগের অধ্যাপক ফিরদৌস আজীম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, উন্নয়নকর্মী সৈকত শুভ্র আইচ, নৃবিজ্ঞান গবেষক জবা তালুকদার, অধিকারকর্মী রোজীনা বেগম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাইদুল ইসলাম, মানবাধিকারকর্মী আমিরুল রসুল, সাঈদ আহমেদ, আদিবাসী অধিকারকর্মী হানা শামস আহমেদ।
দুর্গাপুজো নিয়ে কী বলেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা? গত সোমবার ঢাকায় সাংবাদিকদের পুজো নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুজোয় মদ, গাঁজার আসর বসানো যাবে না। সেই কারণে পুজো প্রাঙ্গনে কোনও মেলার অনুমতি দেওয়া হবে না। বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে এক দুটি দোকান দেওয়া যাবে। তার বেশি নয়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মতে, পুজোর সময় মণ্ডপ চত্ত্বরে হওয়া মেলায় মদ, গাঁজা বিক্রি হয়। তাই মেলার করার অনুমতি না দিতে উদ্যোক্তাদের বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে মদ, গাঁজার সমস্যাকে দুর্গাপূজার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। অতীতে বাংলাদেশের বহু নেতাই পুজোয় মদ গাঁজা খাওয়া নিয়ে সরব হয়েছেন। তবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকাধীর এমন মন্তব্যে অনেকেই বিরক্ত। হিন্দুদের সংগঠনগুলি মনে করছে এই মন্তব্য একপেশে এবং একটি উৎসরকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা। সব ধর্মেরই বড় বড় উৎসব অনুষ্ঠানে কিছু মানুষ নেশা করেন। দুর্গাপুজোর সঙ্গে নেশা করার কোনও সম্পর্ক নেই।
তাৎপর্যপূর্ণ হল যে ২২ বিশিষ্টজন বুধবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মন্তব্যের প্রতিবাদ করে লিখিত বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন তাঁদের নব্বই-পচান্নবই ভাগই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁরা মনে করছেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মন্তব্য সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করবে। আরও লক্ষণীয়, অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সে দেশের সুশীল সমাজ মুখ খুলতে শুরু করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মন্তব্যে একটি সুপ্রাচীন, সর্বজনীন ধর্মীয় উৎসবের ভাবগাম্ভীর্য ও পবিত্রতাকে ক্ষুণ্ন করেনি; বরং শিশু, নতুন প্রজন্ম ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গাপূজাকে মাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত করে এক বৈষম্যমূলক ও বিভ্রান্তিকর বার্তা দিয়েছে। এটি সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের পাশাপাশি বাংলাদেশের দীর্ঘকালীন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘দুর্গাপূজাসহ হিন্দু এবং দেশের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পূজা, অনুষ্ঠান, উৎসব ও ধর্মস্থলে নানা সময়ে হামলা, আক্রমণ, ভাঙচুর, নিপীড়ন, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশের হিন্দুসহ সব জনগণের অবদান ও হিস্যা আছে। কোনওরকম উসকানি বা মব সন্ত্রাসকে ন্যায়সঙ্গত মনে করে ধর্মসহ হিন্দুদের সামগ্রিক জীবনের ওপর কোনও বৈষম্য, নিপীড়ন, বর্ণবাদ এবং অপমান দেশের সংবিধান, আইন ও জনসংস্কৃতিবিরোধী।
২২ বিশিষ্টজন বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিশ্বাস, চর্চা, স্থাপনা, প্রার্থনাস্থল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হয়েছে। এমনকি মদ ও গাঁজার প্রমাণহীন অজুহাত তুলে দেশজুড়ে বহু মাজার ও স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। কবর থেকে লাশ তুলে নুরাল পাগলার লাশ পর্যন্ত পোড়ানো হয়েছে। বিচারহীন এসব ঘটনায় উগ্রবাদী উসকানিমূলক শক্তির প্রভাব স্পষ্ট। রাষ্ট্রের অত্যন্ত দায়িত্বশীল অবস্থানে থেকেও একজন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এমন বর্ণবাদী উসকানিমূলক বক্তব্য উগ্রবাদী শক্তিকে আরও বেশি মব সন্ত্রাসে উৎসাহিত করতে পারে। এ ধরনের দায়িত্বহীন আচরণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে সোমবার দুর্গাপুজোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। রবিবাই আইনশৃঙ্খলা নিয়ে এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস পুজোয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। সেই প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, পুজোয় পর্যাপ্ত পরিমানে নিরাপত্তা থাকবে। সীমান্তে বাড়তি নজর থাকবে বিজিবির। এই সময়ই পুজোকে কেন্দ্র হওয়া মেলায় মদ গাঁজার সমস্যার কথা তোলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।