চিঠির কপি পাঠানো হয়েছে রাষ্ট্রসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিষদের সদর দপ্তর এবং বিশ্বের প্রভাবশালী মানবাধিকার সংগঠনগুলিকে।

শেষ আপডেট: 2 November 2025 21:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রাষ্ট্রসংঘ তাদের উন্নয়ন সহায়তা প্রকল্প (ইউএনডিপি-UNDP) থেকে সে দেশকে মোটা অংকের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করেছে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির গোড়ায় সে দেশে ১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে ভোট পরিকাঠামো ও প্রক্রিয়াকে মজবুত করতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ইউএনডিপি।
বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ আন্তর্জাতিক ওই প্রতিষ্ঠানের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জোরালো আপত্তি তুলেছে। তাদের বক্তব্য রাষ্ট্রসংঘের সনদ অনুযায়ী ইউএনডিপি-র তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ করার মত অনুকূল পরিবেশ বাংলাদেশে নেই। দলের তরফে ইউএনডিপি'র বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্টিফান লিলারকে আইনি চিঠি পাঠিয়েছেন শেখ হাসিনার সাবেক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী।
১৮ পাতার চিঠিতে তিনি আওয়ামী লিগের আপত্তির আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন কেন ইউএনডিপি-র সিদ্ধান্ত অন্যায্য এবং আইন বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রসংঘের সনদে নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ের উল্লেখ করে মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে সকলের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ভোটদানের অনুকূল পরিবেশ নেই। রাষ্ট্রসংঘের সনদে সকলের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে সব রাষ্ট্রকে। কিন্তু বাংলাদেশে মোহাম্মদ ইউনুস সরকার উল্টো পথে ধাবিত হয়েছে। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল তথা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আওয়ামী লিগকে আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এই দলের পক্ষে রয়েছেন দেশের সিংহভাগ মানুষ।
আওয়ামী লিগের এই ব্যারিস্টার নেতা আইনি চিঠিতে বলেছেন, রাষ্ট্রসংঘ এমন কোন দেশে নির্বাচন খাতে অর্থ বরাদ্দ করতে পারে না যেখানে সব দল ও গোষ্ঠীর ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। চিঠির কপি পাঠানো হয়েছে রাষ্ট্রসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিষদের সদর দপ্তর এবং বিশ্বের প্রভাবশালী মানবাধিকার সংগঠনগুলিকে।
প্রসঙ্গত, কদিন আগেই বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের সভাপতি তথা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন তাঁর দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে পার্টির কোটি কোটি সমর্থকেরা ভোটদান কেন্দ্রে যাবেন না। তিনি আরও বলেছেন, আওয়ামী লিগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে তা দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি পাবে না। সেই নির্বাচনের ভিত্তিতে তৈরি সরকারও স্বীকৃতিহীন থাকবে।
একই কথা বলেছেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনিও একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউনুস সরকারকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, আওয়ামী লিগকে ছাড়া নির্বাচন হলে দেশের স্থিতিশীলতা ফিরবে না। অস্থিরতা বজায় থাকবে এবং নির্বাচন দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি পাবে না।
হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল তাঁর সময়ে সংঘঠিত নির্বাচনগুলি অবাধ ও নিরপেক্ষ ছিল না। আওয়ামী লিগ নেতৃত্ব এই অভিযোগ খণ্ডন করতে পাল্টা সরব হয়েছে। আওয়ামী লিগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য তথা দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম রবিবার বলেন, আওয়ামী লিগ সব সময়ই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। শেখ হাসিনার দ্বিতীয় দফার শাসনে যে তিনটি নির্বাচন সংঘটিত হয়েছে সেগুলি বিরোধীরা কখনও পরাজয়ের আশঙ্কায় বয়কট করেছে। কখনও নিজেদের মধ্যে দলাদলি করে আসন হারিয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি ২০১৪ এবং ২০২৪-এর নির্বাচন বয়কট করে। সরকারের তরফে তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে আহ্বান জানানো সত্ত্বেও দলটি তা বারে বারেই প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও একই আসনে দলের একাধিক প্রার্থী থাকায় তারা ভোট ভাগাভাগির জেরে হেরে গিয়েছে। খানমের বক্তব্য, বিএনপি মনোনয়ন বাণিজ্য করে নিজেদের কবর খুঁড়েছিল। একই আসনে তিনজন চারজন প্রার্থী ছিল তাদের। দেশে খালেদা জিয়া প্রার্থী বাছাই করেছিলেন। আবার লন্ডন থেকে তারেক জিয়া একাধিক ব্যক্তিকে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে মনোনয়ন দেন। আওয়ামী লিগের অভিযোগ, এইভাবে বিএনপি জাতীয় সংসদের বিভিন্ন আসনের টিকিট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনও বাসনাই তাদের ছিল না। মুখ বাঁচাতেই তারা হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার হরণ, গণতন্ত্র হরণ এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল।
খানমের বক্তব্য, ওই নির্বাচনগুলিতে সরকার বা আওয়ামী লিগের তরফে কোনও অনিয়ম করা হয়নি। শেখ হাসিনার উন্নয়ন অভিযান স্তব্ধ করতেই ভোট নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বয়কটের রাস্তা নেয় বিরোধীরা। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউনুস সরকার আওয়ামী লিগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দিচ্ছে না। এই ব্যাপারে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিএনপি-জামাত। আত্মগোপনে থাকা এই নেত্রী বলেছেন, বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে শেখ হাসিনার ফের প্রধানমন্ত্রী হবেন। আওয়ামী লিগের সরকার ফিরে পেতে দেশের মানুষ মুখিয়ে আছেন। তারা বলছেন আগেই ভালো ছিলাম।
এদিকে, ইউএনডিপি-কে লেখা আইনি চিঠিতেও আওয়ামী লিগ বলেছে, তাদের মনে রাখা দরকার দেশের বৃহত্তম দলকে বাদ দিয়ে কোন নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে পারে না। ফলে এমন নির্বাচনের আন্তর্জাতিক তহবিলের অর্থ ব্যয় অন্যায্য এবং অপচয়, নীতি বিরুদ্ধ। ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী ইউএনডিপি-কে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, তাদের উচিত হবে ইউনুস সরকারকে এই ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া যাতে দেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে। আওয়ামী লিগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে তা কখনই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না।