স্বাক্ষরের পর তাতে অনেক নতুন এবং আপত্তিজনক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে দাবি করে ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় ঐক্য কমিশনের বিরুদ্ধে অনৈক্য সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন। ওই কমিশনের চেয়ারম্যান স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস।

শেষ আপডেট: 1 November 2025 20:16
বাংলাদেশে রাজনৈতিক (Bangladesh Politics) পরিস্থিতির দ্রুত বদল ঘটছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে মধুচন্দ্রিমা নিয়ে দলের মধ্যে গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিএনপি (BNP)। অন্যদিকে, জুলাই সনদ এবং গণভোট নিয়ে জামাত-ই ইসলামির সঙ্গে খালেদা জিয়ার পার্টির বিবাদ তুঙ্গে উঠেছে। জুলাই সনদে সই করার পরও সেই নথি নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিবাদ বেঁধেছে বিএনপির। স্বাক্ষরের পর তাতে অনেক নতুন এবং আপত্তিজনক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে দাবি করে ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় ঐক্য কমিশনের বিরুদ্ধে অনৈক্য সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন। ওই কমিশনের চেয়ারম্যান স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস (Muhammad Yunus)।
এদিকে, বিএনপি নেতাদের কথা অনুযায়ী চলতি নভেম্বরেই দেশে ফেরার কথা তারেক জিয়ার। যদিও ভোটের ব্যাপারে ওই দলের নেতারা এখনও সরকারকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। সরকারি ঘোষণা মেনে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির গোড়ায় জাতীয় সংসদ ভোট শেষ পর্যন্ত না হলে ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বিপাকে পড়বেন তারেক জিয়া। কারণ, একবার দেশে ফিরে এলে তাঁর পক্ষে আর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ফেরত যাওয়া সম্ভব হবে না। ভোট হলে বিএনপি সরকার গড়বে, এই আশায় দেশে ফেরার কথা ঘোষণা করেছেন তারেক। শিগগির ফিরব বলে প্রায় এক মাস আগে সাক্ষাৎকারে ঘোষণা করলেও দিন-তারিখ এখনও জানাতে পারেনি বিএনপি। তার উপর নভেম্ভরেই জুলাই সনদের উপর গণভোটের দাবিতে অনড় জামাত। বিএনপি নেতৃত্ব মনে করছে, জামাতের এই দাবির পিছনে সরকারের হাত আছে। গণভোটের ফলাফলকে সরকার তাদের প্রতি আস্থা বলে দাবি করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পিছিয়ে দিতে পারে, দলের আলোচনায় এমন আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন একাধিক নেতা।
এমন অস্থির, অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতির পিচে আচমকা ঘূর্ণি শুরু হয়েছে আওয়ামী লিগ নেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সক্রিয়তা ঘিরে। একাধিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, জয়ের সঙ্গে হালে প্রভাবশালী মার্কিন কর্তাদের একাংশের কথা হয়েছে। ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার হরণ, আওয়ামী লিগের কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও দলকে ভোটে অংশ নিতে না দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন কর্তাদের অবহিত করেছেন জয়। অনেক বছর হল, তিনি আমেরিকায় বাস করছেন। ইউনুস সরকার তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট বাতিল করার পর তিনি বাধ্য হয়ে আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়েছেন। মার্কিন পাসপোর্ট নিয়েই কয়েক মাস আগে দিল্লিতে মা এবং বোন সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সঙ্গে ইদ কাটিয়ে যান জয়।
একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, জয়ের সঙ্গে মার্কিন কর্তাদের বৈঠকের পর পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়। প্রায় এক বছর পর জয় সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। গত বছর অগস্টে বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরির পর জয় কিছু সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সম্প্রতি তিনি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে বলেন, আওয়ামী লিগকে ছাড়া ভোট হলে তা হবে এক ধরনের ভাঁওতাবাজি। ইউনুস সরকারকে আওয়ামী লিগের উপর থেকে অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান জয়।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনাও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছেন। তিনিও বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আওয়ামী লিগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে দলের লাখ লাখ সমর্থক ভোট বয়কট করবেন। সেই নির্বাচন এবং সরকার দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি পাবে না। ইউরোপ-আমেরিকা-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক মিডিয়া তাঁর সাক্ষাৎকার পেতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ভারতের আশ্রয়ে থেকে আওয়ামী লিগ নেত্রীর ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার নয়া দিল্লির তাঁর পাশে থাকার বার্তা আরও জোরালো করেছে বলে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহল মনে করছে। এতদিন হাসিনা শুধু ফেসবুক-সহ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছেন। এবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করেছেন। ভোট নিয়ে হাসিনার কথায় ইউনুস সরকার এবং বিএনপি-সহ আওয়ামী লিগ বিরোধী দলগুলি তেলেবেগুলে জ্বলে উঠলেও একটি বিষয় সব পক্ষকেই চিন্তায় ফেলেছে। এমনকী প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং উপ প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার আওয়ামী লিগ নেত্রীর সাক্ষাৎকার নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে একহাত নিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ সংবাদমাধ্যম শেখ হাসিনার অপশাসন নিয়ে প্রশ্ন করছে না।
আওয়ামী লিগ নেত্রী এ পর্যন্ত যে সাক্ষাৎকারগুলি দিয়েছেন লক্ষণীয় হল তাতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে কোনও বিরুপ মন্তব্য করেননি। যদিও গত বছর সরকার পতনের অনেক মাস পর হাসিনা এবং আওয়ামী লিগের নেতারা আমেরিকার দিকে ষড়যন্ত্রের আঙুল তুলেছিলেন। তবে তাঁরা নিশানা করেছিলেন বিগত জো বাইডেন সরকারের দিকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের বিরুদ্ধে হাসিনা ও তাঁর দলের নেতারা মুখ খোলেননি। বরং আওয়ামী লিগ নেত্রী দলের ফেসবুক পেজে যে ভাষণ দিচ্ছেন তাতে তিনি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সরব। জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনও চিন্তিত। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লিগকে বাদ দিয়ে নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত আমেরিকা সায় দেবে কি না, তা নিয়ে সরকার ও হাসিনা বিরোধী দলগুলির মধ্যে তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ভারত-মার্কিন সামরিক চুক্তি এবং শুল্ক বিবাদ নিষ্পত্তির সম্ভাবনা ঘিরেও চিন্তায় পড়েছে হাসিনা বিরোধী শিবির। ভারত-মার্কিন সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেলে আমেরিকার বাংলাদেশ নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এবং নয়াদিল্লিকে উপেক্ষা করে ঢাকার বিষয়ে হোয়াইট হাউস সিদ্ধান্ত নেবে না বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, গত বছর আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পর বিগত ১৩-১৪ মাসে বাংলাদেশের রাজনীতির পিচে আচমকাই নয়া ঘূর্ণি দেখা দিয়েছে।