হাসিনার নতুন আইনজীবী জেড আই খান পান্না একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে কলকাতার কসবায় থাকতেন। তাঁর অতীত কীভাবে বর্তমান মামলার সঙ্গে যুক্ত?

পান্না ও হাসিনা
শেষ আপডেট: 24 November 2025 09:51
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া গুম-খুনের অভিযোগে দায়ের হওয়া দুটি মামলায় তাঁর আইনজীবী হিসাবে লড়াই করবেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য আইনজীবী জেড আই খান পান্না। তিনি নিজেই এই ব্যাপারে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে আর্জি জানালে তা মঞ্জুর হয়।
এরপর অশীতিপর এই আইনজীবীকে নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বসয় এবং অসুখবিসুখে কাবু এই আইনজীবী বেশ কয়েক বছর হল হুইল চেয়ার ব্যবহার করেন। এজলাসেও তিনি হুইল চেয়ারে বসে মামলা লড়েন। অনেকেই মনে করছেন, পান্না আইনজীবী হওয়ায় সরকার ও ট্রাইব্যুনাল গুমের মামলা দুটিতে কড়া চাপের মুখে থাকবে। এই ধরনের বহু মামলায় সরকারকে বিপাকে ফেলার কৃতিত্ব রয়েছে পান্নার ঝুলিতে।
প্রায় এক বছর আগে ‘দ্য ওয়াল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেই পান্না প্রথম জানিয়েছিলেন তিনি শেখ হাসিনার হয়ে মামলা লড়তে চান। বলেছিলেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কিংবা তিনি আওয়ামী লিগের সভানেত্রী, এই সব পরিচয় আমার কাছে গুরুত্বহীন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তাঁর এই পরিচয়ই আমার কাছে প্রধান। সেই জন্যই আমি তাঁর হয়ে নিখরচায় মামলা লড়তে চাই। জাতির পিতার কন্যা যদি ন্যায় বিচার না পান সেটা জাতির লজ্জা, বঙ্গবন্ধুর প্রতি অসম্মান। এই আইনজীবী মনে করেন, শেখ মুজিবুর রহমান না জন্মালে বাংলাদেশের জন্ম হত না।
তবে হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা রাষ্ট্রপক্ষ অন্য আইনজীবীকে দেওয়ায় পান্না সুযোগ পাননি। তবে বাংলাদেশে আইন আদালতের যা পরিস্থিতি তাতে হাসিনার হয়ে কেউ মামলা লড়বেন অনেকেই তা আশা করেননি। পান্নার মত প্রথিতযশা আইনজীবী স্বেচ্ছায় মামলা লড়তে চাওয়ায় তা অন্য মাত্রা পেয়ে গেল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল
প্রথম মামলায় ফাঁসির সাজা হওয়ার পর হাসিনা তাঁর হয়ে হয়ে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি অভিযোগ করেন জেড আই খান পান্নাকে তাঁর হয়ে মামলা লড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ওই মামলা চলাকালে দ্য ওয়াল-কে দেওয়া আর এক সাক্ষাৎকারে এই স্বনামধন্য আইনজীবী বলেছিলেন, হাসিনার বিরুদ্ধে মামলাটি অবৈধ। হাসিনাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
প্রবীণ এই আইনজীবী বরাবর বাংলাদেশে আলোচিত ব্যক্তিত্ব স্রোতের বিপরীতে হাঁটার কারণে। আইনের পেশায় আসার পর সব সরকারের বিরুদ্ধেই তিনি বড় বড় মামলায় আক্রান্ত পক্ষের হয়ে মামলা লড়েছেন। তিনি একই সঙ্গে একজন মানবাধিকার সংগঠক। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলির অন্যতম আইন ও সালিশ কেন্দ্র বা আসক-এর তিনি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। মানবাধিকার হরণ সংক্রান্ত বেশিরভাগ মামলা তিনি নিখরচায় লড়াই করে থাকেন।
শেখ হাসিনার সময়েও মানবাধিকার হরণের একাধিক মামলায় তিনি সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। সেই কারণে হাসিনা সরকারের সঙ্গেও তাঁর একাধিকবার বিরোধ হয়। বিগত সরকারের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী নানা আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন তিনি। এমনকী হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের গোড়ায় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো বন্ধ করার আদেশ চেয়ে গত বছর ২৯ জুলাই আইনজীবীদের একটি দল হাইকোর্টে আবেদন করে। ওই আবেদনের পক্ষে আদালতে যুক্তি-তর্ক উপস্থান করেছিলেন জেড আই খান পান্না। শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণের সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ২৯ জুলাই নাগরিক উদ্যোগে গঠিত জাতীয় গণতদন্ত কমিশনেরও সদস্য ছিলেন তিনি।
আবার অতীতে সামরিক শাসক হুসেইন মহম্মদ এরশাদ এবং বিএনপি-জামাতের সরকারের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এই আইনজীবী। গত বছর হাসিনা সরকারের পতনের পর বরাবর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলা এই আইনজীবীর বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যা মামলা দায়ের হয়েছিল। তার জেরে দেশব্যাপী প্রতিবাদ হওয়ায় তাঁর নাম বাদ দিতে বাধ্য হয় মামলাকারীরা। পরবর্তী সময় মামলাকারী স্বীকার করেন, তিনি জেড আই খান্না পান্নাকে চেনেন না। একজন আইনজীবীর কথায় নামটি এজাহারে লেখেন। আইন ও বিচার মহলের একাংশের মতে, অন্যায়ভাবে ধৃত আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মী, মুক্তিযোদ্ধাদের হয়ে তিনি মামলা লড়তে পারেন, অনুমান করেই এই আইনজীবীর বিরুদ্ধেই খুনের মামলা দেওয়া হয়েছিল।
গণ অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে শেখ মুজিবের স্ট্যাচু, স্বাধীনতার স্মারক ভাঙা শুরু হলে পাল্টা জনমত গড়তে প্রবীণ এই আইনজীবী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার পক্ষে কাজ করতে মঞ্চ-৭১ নামে একটি সংগঠন গড়েছেন। সেই সংগঠনের একটি বৈঠক থেকে পুলিশ মাস চারেক আগে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সাংবাদিক, অধ্যাপক-সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিল। পান্না আদালতে লড়াই করে তাঁদের কয়েকজনের জামিন নিশ্চিত করেন।
দ্য ওয়াল-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর চোখে ফাঁকি দিয়ে ভারতে চলে এসেছিলেন। কলকাতায় কসবার এক বাড়িতে এসে ওঠেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকবার কসবার সেই বাড়িতে এসেছেন। এখনও কসবাকে হাতের তালুর মতো চেনেন।
যুদ্ধের দিনগুলিতে কসবায় থেকেই অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং নিয়েছেন কলকাতা ও আশপাশের বহু জায়গায়। কয়েক মাসের প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে গিয়ে সম্মুখ সমরে অংশ নেন। জানান, ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে ৮ অগস্ট তাঁর জীবনে আলাদা মাত্রা বহন করে। ওইদিন সন্ধ্যায় কাউখালি থানায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলেছিলেন তিনি ও আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। তার আগে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই চলে। এক পর্যায়ে পাক সেনারা বিধ্বস্ত হয়ে একদল পালায়। আর একদলকে গ্রামবাসীরা পিটিয়ে হত্যা করে। একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আমি কোনও দলের লোক নই। আমি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় যা করার করে যাব। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমি তা হতে দিতে পারি না।