নোটিসে হাসিনা তাঁর বিচারকে সম্পূর্ণ প্রহসন এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে বর্ণনা করেছেন। সেই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালকে বলেছেন ভবিষ্যতে কোন মামলায় তাঁর বিচারে যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়।

শেখ হাসিনা
শেষ আপডেট: 1 April 2026 17:09
মৃত্যুদণ্ডের সাজা খারিজের দাবি জানিয়ে ঢাকার বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (bangladesh international crimes tribunal) আইনি নোটিস ধরালেন শেখ হাসিনা (Sheikh hasina)। তাঁর হয়ে লন্ডনের একটি আইন সংস্থা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে গত সোমবার এই নোটিস পাঠিয়েছে। বুধবার ট্রাইব্যুনালের হাতে সেই নোটিস পৌঁছেছে।
নোটিসে হাসিনা তাঁর বিচারকে সম্পূর্ণ প্রহসন এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে বর্ণনা করেছেন। সেই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালকে বলেছেন ভবিষ্যতে কোন মামলায় তাঁর বিচারে যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়।
প্রসঙ্গত মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে গত বছর ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড (Death Penalty) দিয়েছে। এছাড়া অন্য কয়েকটি মামলায় তার বিভিন্ন মেয়াদে কারাবাসের সাজা ঘোষণা করা হয়।
হাসিনার আইনি চিঠি এমন সময় ট্রাইব্যুনালের হাতে পৌঁছেছে যখন রাষ্ট্রসংঘ আওয়ামী লিগের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি পাঠিয়েছে। এই চিঠি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাঠানো হলেও জবাব দিতে হবে তারেক রহমানের সরকারকে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিডিউটারের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে জামায়াতে ইসলামী ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত আইনজীবী তাজুল ইসলামকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অ্যাটর্নি জেনারেল মহম্মদ আসাদুজ্জামান বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের আইনমন্ত্রী। তারেক রহমানের সরকার প্রথম থেকেই বলে এসেছে শেখ হাসিনা সহ আওয়ামী লিগ নেতাদের বিচারের বিষয়ে সরকার আইনের পথে চলবে। এখন দেখার বাংলাদেশে পালাবদলের পর নির্বাচিত সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার আইনি নোটিশ নিয়ে কী পদক্ষেপ করে।
আইনি নোটিসে লন্ডনের আইনি সংস্থা কিংকসলে নেপলি লিখেছে
১. আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের (Bangladesh) সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের (Awami League) সভাপতি শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) পক্ষে কাজ করছি।
২. আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সেই অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাচ্ছি, যার ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার ও দণ্ড প্রদান করেছে। শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে বিচার ও দণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা ন্যায়বিচার ও যথাযথ প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাঁর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে। এই পত্রটি বর্তমান প্রক্রিয়ার বৈধতা স্বীকার বা মেনে নেওয়া হিসেবে গণ্য হবে না। শেখ হাসিনা এই প্রক্রিয়ার এখতিয়ার, গঠন, কার্যপ্রণালী ও ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার অধিকার সংরক্ষণ করেন।
৩. শেখ হাসিনার বিচার এমন একটি বৈরী পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লিগ ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে বৈরিতা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার মধ্যে ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটি নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা, অপরাধীদের দায়মুক্তি এবং আওয়ামী লিগের পক্ষে আইনজীবীদের গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটে। আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হামলার শিকার হন।
৪. এই চিঠিতে নিম্নলিখিত গুরুতর লঙ্ঘনগুলো উল্লেখ করা হয়েছে:
ক. বিচারিক স্বাধীনতার অভাব: রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের নিয়োগ এবং পক্ষপাতমূলক মন্তব্য।
খ. প্রসিকিউশনের পক্ষপাত: রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত প্রধান প্রসিকিউটরের নিয়োগ।
গ. যথাযথ প্রক্রিয়া ও ন্যায্য বিচারের অধিকার লঙ্ঘন।
ঘ. অনুপস্থিতিতে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড প্রদান।
৫. এই লঙ্ঘনগুলো পৃথকভাবে ও সম্মিলিতভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অন্যায্য করেছে এবং এই রায় আইনগতভাবে অবৈধ।
৬. উপরোক্ত বিষয় ছাড়াও একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে—আইসিটির শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার করার এখতিয়ার নেই। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধ বিচার করার জন্য প্রণীত হয়েছিল। ২০২৪ সালে এই আইনের সংশোধনের মাধ্যমে এখতিয়ার বাড়ানো হয়, যা অবৈধ।
৭. ২০২৪ সালের ঘটনাগুলো সাধারণ ফৌজদারি আদালতের আওতায় পড়ে। আইনের পূর্বপ্রযোজ্যতা (retrospective application) আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
৮. এই ট্রাইব্যুনালের অপব্যবহার একটি গুরুতর এখতিয়ার লঙ্ঘন।
৯. স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে বিচার পাওয়ার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে প্রতিষ্ঠিত।
১০. শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই মানদণ্ড পূরণ করা হয়নি।
১১. ২০২৪ সালের পর বিচারক ও প্রসিকিউশন সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করা হয়।
১২. এই নিয়োগ প্রক্রিয়া পক্ষপাতের ধারণা তৈরি করে।
১৩. নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং বিচারকদের অভিজ্ঞতা সীমিত।
১৪. বিচারকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
১৫. বিচার চলাকালে মন্তব্য থেকে পক্ষপাতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
১৬. প্রতিরক্ষা আইনজীবীর বক্তব্য থেকেও পূর্বনির্ধারিত রায়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
১৭. ফলে ন্যায্য বিচার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
১৮. প্রসিকিউটরদের নিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যক।
১৯. প্রধান প্রসিকিউটরের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পক্ষপাতের ইঙ্গিত দেয়।
২০. একপাক্ষিকভাবে বিচার পরিচালিত হয়েছে।
২১. শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
২২. দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে।
২৩. এতে বিচার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে।
২৪. আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ন্যায্য বিচার না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
২৫. আন্তর্জাতিক বার অ্যাসোসিয়েশনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
২৬. হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একই উদ্বেগ জানিয়েছে।
২৭. অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিচারকে অন্যায্য বলেছে।
২৮. শেখ হাসিনাকে অভিযোগ জানানো বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
২৯. আন্তর্জাতিক আইনে অনুপস্থিতিতে বিচার ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে করা যায়।
৩০. পূর্বেও এমন বিতর্কিত বিচার হয়েছে।
৩১. মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড প্রযোজ্য।
৩২. এসব মানদণ্ড মানা হয়নি।
৩৩. ফলে এই দণ্ড আন্তর্জাতিক আইনে “summary execution” হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৩৪. এই বিচার আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক ন্যায়বিচারের মান লঙ্ঘন করেছে।
৩৫. আমরা দাবি জানাচ্ছি যে:
* রায় বাতিল করা হোক;
* মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করা হোক;
* ভবিষ্যৎ বিচার আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী করা হোক;
* আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক;
* সরকার এই লঙ্ঘন স্বীকার করে ব্যবস্থা নিক।
৩৬. শেখ হাসিনা তাঁর আইনি অধিকার দাবি করেছেন।
৩৭. ১৪ দিনের মধ্যে এই চিঠির জবাব দেওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।