৭ জুনকে ‘ছয় দফা দিবস’ এবং ছয় দফাকে ‘বাঙালির মুক্তির সনদ’ বলা হয়।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 5 June 2025 03:08
সাখাওয়াত হোসেন
বাংলাদেশের (Bangladesh) জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ৭ জুন এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনটি শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের স্মারক নয় বরং এটি বাঙালি জাতির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চূড়ান্ত দাবির ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৬৬ সালের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (Sheikh Mujibar Rahman) ঘোষিত ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারাদেশে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা নির্ধারণ করে দেয়। ফলে ৭ জুনকে ‘ছয় দফা দিবস’ এবং ছয় দফাকে ‘বাঙালির মুক্তির সনদ’ বলা হয়।
ছয় দফা: প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজন
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের শিকার। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই নিপীড়নের প্রথম প্রতিবাদ উঠে আসে, তবে প্রকৃত সমাধান তখনও অধরা ছিল। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি নিপীড়নের শিকল ছিঁড়ে বাঙালির জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই ছয়টি দফার মূল কথা ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্র থেকে ক্ষমতা হ্রাস করে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান।
ছয় দফার সারাংশ
* শক্তিশালী ফেডারেল শাসনব্যবস্থা ও প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন
* পররাষ্ট্র নীতি ও প্রতিরক্ষা বাদে সব ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে
* পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা মুদ্রা বা সমানাধিকারের নিশ্চয়তা
* রাজস্ব আহরণ ও ব্যয় ব্যবস্থার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রদেশের হাতে।
* বিদেশি বাণিজ্য ও সাহায্য প্রাপ্তির ওপর প্রদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
* পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব মিলিশিয়া বা আধাসামরিক বাহিনী গঠন।
এই দফাগুলি মূলত পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা ও সাংস্কৃতিক অবদমনের বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত প্রতিবাদ ও ভবিষ্যতের রূপরেখা প্রদান করে।
৭ জুন: রক্তাক্ত প্রতিরোধের দিন
১৯৬৬ সালের ৭ জুন তৎকালীন পাকিস্তানি সরকারের ছয় দফার বিরোধিতার প্রতিবাদে আওয়ামী লিগের ডাকে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। এই হরতালে পুলিশের গুলিতে ঢাকায় মনু মিয়া ও শামসুল হকসহ বেশ কয়েকজন শহিদ হন। বহু নেতাকর্মী আহত ও গ্রেফতার হন। এই ত্যাগের মধ্য দিয়েই ছয় দফা গণমানুষের দাবিতে রূপান্তরিত হয় এবং বাঙালির মুক্তির পথে এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়ে পরিণত হয়।
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
ছয় দফা দাবি ছিল আসলে একটি রাজনৈতিক রূপরেখা, যা বাঙালির আত্মপরিচয়, রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিফলন। এটি বাঙালির মধ্যে আত্মচেতনার জাগরণ ঘটায় এবং ’৭০-এর নির্বাচন ও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পথ রচনা করে। ছয় দফার চেতনা আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
৭ জুন শুধু একটি তারিখ নয়—এটি বাঙালির আত্মমর্যাদার দিন
ছয় দফা শুধু রাজনৈতিক ইশতেহার নয়—এটি ছিল বাঙালির জাতীয় মুক্তির দিকনির্দেশনা। ৭ জুনের আত্মত্যাগ, নেতৃত্বের দৃঢ়তা এবং জনতার সমর্থনই পরবর্তীতে বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। তাই এই দিনটি আমাদের ইতিহাসে চিরভাস্বর, আর ছয় দফা আমাদের স্বাধীনতার অগ্রদূত।
লেখক মার্কিন প্রবাসী গবেষক। ছাত্র লিগের সাবেক নেতা। মতামত ব্যক্তিগত