সোমবার বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের ৭৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সংগ্রামে প্রতিকূলতায় এগিয়ে চলে বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ।

বাংলাদেশ
শেষ আপডেট: 23 June 2025 00:01
সোমবার বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের ৭৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সংগ্রামে প্রতিকূলতায় এগিয়ে চলে বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ। ৭৬ বছরের মধ্যে প্রায় ৫১ বছরই আওয়ামী লিগকে থাকতে হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে, রাজপথ, আন্দোলন-সংগ্রামে। এই সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় আওয়ামী লিগকে অনেক বৈরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে। এগোতে হয়েছে অনেক চড়াই-উৎরাই এবং ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে। কখনও নেতৃত্ব শূন্যতা, কখনও দমন-পীড়ন, কখনও ভাঙনের মুখে পড়তে হয়েছে দলটিকে। বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ হারলে একা হেরে যায় না; সেই সঙ্গে দেশ ও জনগণও হেরে যায়। মুক্তিযুদ্ধ নির্বাসিত ও গণতন্ত্র পথবিচ্যুত হয়।
গভীর সংকটকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের জন্ম। মাওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকার টিকাটুলির রোজ গার্ডেনে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লিগ। জনগণের দেহ মনের নিরঙ্কুশ স্বাধীন বিচরণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে জন্ম নেয় দলটি। অনেক রক্তাক্ত পথ ধাপে ধাপে পাড়ি দিয়ে ১৯৫৫ সালে আওয়ামী পরিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে চলেছে। পঞ্চাশের দশকে অনেক ত্যাগী নেতা থাকলেও বঙ্গবন্ধুর মতো এতো স্পষ্ট, দৃঢ় ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান কেউ গ্রহণ করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই সৃষ্টি হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের মহাকাব্য।
৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯-এ ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লিগ দেশের মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়। আর এই কণ্ঠস্বরের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। ’৭০-এর জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে বাঙালির একমাত্র মুখপাত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লিগ। ’৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া ও স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা আওয়ামী লিগের সবচেয়ে বড় গৌরবময় অধ্যায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, আওয়ামী লিগের রাজনৈতিক পথচলা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য সুতোয় বাঁধা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্নকে ধারণ করেই আওয়ামী লিগ নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই, 'আওয়ামী লীগ-বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধু' এই তিনটি সত্তা একে অপরের পরিপূরক এবং বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এই ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করার কোনও সুযোগ নেই।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করার পর বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্বভাবতই প্রত্যাশা ছিল সবাই মিলে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তুলবে। সবাই মিলে দেশ পুনর্গঠনের কাজ দূরে থাক, দায়িত্ব গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত দেশি-বিদেশি শক্তি। বাংলাদেশ যখন কেবল মাত্র বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার পথে যাত্রা শুরু করেছিল ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টাকে সপরিবারে হত্যা করা হল। এর ৩ মাস পর জাতীয় চার নেতাকে কারাগারে হত্যা করা হয়। সোনার বাংলার স্বপ্নকে সমূলে উপড়ে ফেলতে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ছায়াসঙ্গী স্বপ্নের সারথী মুজিবনগর প্রবাসী সরকারের প্রধান সঞ্চালক জাতীয় চার নেতাকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা অবস্থায় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করাও ছিল স্বাধীনতা বিরোধীদের মাস্টার প্ল্যান। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোদ্ধাদের হারিয়ে সোনার বাংলার স্বপ্নই কেবল নয়, বাংলাদেশ নিজেও পথ হারিয়ে ফেলল। বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত করে। উত্থান ঘটে স্বাধীনতাবিরোধীদের। বাংলাদেশে শুরু হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতির পাশাপাশি রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন।
ছয় বছর বিদেশে নির্বাসন শেষে দেশের এক ক্রান্তিলগ্নে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন এবং দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লিগকে একত্রিত করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বহু ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে কখনও সরকারে, কখনও বিরোধী দলে থেকে দেশ গঠনে অনন্য অবদান রেখে চলেছে। মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যাই হোক না কেন বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ও বাঙালির অস্তিত্বের সকল ন্যায্য আন্দোলন ও প্রতিবাদের। বাংলা ও বাঙালির যা কিছু অর্জন তার সবকিছুর সঙ্গেই রয়েছে আওয়ামী লিগ। বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার চরম প্রতিকূলতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত এই দলটি বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে।
বাংলাদেশ আজ আবারও অস্তিত্ব সংকটে উপনীত। স্বাধীনতাবিরোধীদের থাবায় আবারো অতিক্রান্ত করছে এক অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল। নৈরাজ্য, জঙ্গিবাদের কালো ছায়ায় অবরুদ্ধ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এক সংকটময় অধ্যায়ে পরিণত। ৫ অগাস্ট ২০২৪ তারিখে স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে পরিকল্পিত এক জঙ্গি আক্রমণের শিকার হয় বাংলাদেশ। বর্তমান বাংলাদেশে অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম ধস, কলকারখানা বন্ধ, লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন। এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের বাস্তব চিত্র বর্তমান বাংলাদেশ। যে দলটি জনগণের অধিকার আদায়ের জন্যই সৃষ্টি হয়, যে দলের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা পায় সেই দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে অবৈধ সরকার। জাতির পিতা, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মুক্তিযুদ্ধ, মানুষের বাক স্বাধীনতা-স্বাধীনতার স্তম্ভ গুলি আজ ক্ষতবিক্ষত।
বাংলাদেশ আজ যে গভীর সাংবিধানিক, নৈতিক, মানবিক, অর্থনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক সংকটের মুখোমুখি তার থেকে উত্তোরণের একমাত্র অবলম্বন হল বাংলাদেশ আওয়ামী লিগ। একটি অবৈধ, অযোগ্য, গণমাধ্যম দলনকারী এবং জনবিচ্ছিন্ন সরকারের অধীনে দেশ যখন অরাজকতা, নিরাপত্তাহীনতা ও জঙ্গিবাদের কালো ছায়ায় নিমজ্জিত, তখন সাধারণ মানুষের উপলব্ধি ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। 'আওয়ামী লিগই সঠিক ছিল' –এই বোধ এবং দলটির প্রতি দেশের জনগোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ সমর্থন, এই পটপরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। আর এই গণজাগরণের অবিসংবাদিত নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার কোনও বিকল্প নেই। এই বাংলাদেশে যা কিছু সত্য, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সোনালী অর্জন সবই আওয়ামী লিগের নেতৃত্বেই অর্জিত। তাই বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও আওয়ামী লিগ ইতিহাসে অমর।
৭৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের শপথ হোক, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা ও প্রতিহিংসার পথ পরিহার করে এই অবৈধ সরকারের পতন ঘটিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করবই।
জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
লেখক
বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের সাংগঠনিক সম্পাদক