ওজেম্পিক ও ওয়েগোভির মূল নির্মাতা সংস্থার পেটেন্ট শেষ হচ্ছে। ফলে সেমাগ্লুটাইডের জেনেরিক ওষুধ বাজারে এসে ডায়াবেটিস ও ওজন কমানোর চিকিৎসা সস্তা হতে পারে।

শেষ আপডেট: 19 March 2026 12:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডায়াবেটিস ও ওজন কমানোর চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে যে ওষুধটি গত কয়েক বছরে বিপুল আলোড়ন তুলেছে, সেটির বাজারে এবার বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সেমাগ্লুটাইড— যে মূল অণুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় ওষুধ ওজেম্পিক (Ozempic) ও উইগোভি (Wegovy), তার প্রাথমিক পেটেন্ট শেষ হতে চলেছে।
এই অণুটি তৈরি করেছিল ডেনমার্কের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা নোভো নরডিস্ক (Novo Nordisk)। ২০ মার্চ থেকে এর পেটেন্ট শেষ হওয়ায় বিভিন্ন দেশের ওষুধ সংস্থাগুলি এখন এই একই অণু ব্যবহার করে জেনেরিক সংস্করণ বাজারে আনতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে ডায়াবেটিস ও ওবেসিটির চিকিৎসার বিশ্ববাজারে বড় পরিবর্তন আসতে পারে— বিশেষ করে ভারত, চিন ও ব্রাজিলের মতো দেশে।
সেমাগ্লুটাইড এমন এক ধরনের ওষুধ, যা GLP-1 receptor agonist নামে পরিচিত একটি ওষুধের শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এটি মূলত দু’ভাবে কাজ করে। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং খিদে কমিয়ে দেয়। ফলে ওজনও কমে।
এই কারণেই এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ওজন কমানোর চিকিৎসাতেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০১৭ সালে এই ওষুধ প্রথম অনুমোদন পায়। তারপর থেকেই বিশ্বজুড়ে এর চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে।
তবে একটি বড় সমস্যা ছিল এর দাম। উন্নত দেশগুলিতে অনেক ক্ষেত্রে এই ওষুধের মাসিক খরচ ১০০০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। ফলে বহু রোগীর নাগালের বাইরে থেকে গেছে এই চিকিৎসা।
কোনও ওষুধের পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অন্য সংস্থাগুলি একই সক্রিয় অণু ব্যবহার করে জেনেরিক ওষুধ তৈরি করতে পারে। এই জেনেরিক ওষুধে মূল উপাদান একই থাকে, কিন্তু দাম অনেক কম হয়—কারণ নতুন করে গবেষণা ও উন্নয়নের খরচ তুলতে হয় না।
সেমাগ্লুটাইডের ক্ষেত্রেও সেই পরিস্থিতিই তৈরি হচ্ছে। ভারতে খুব শিগগিরই এর পেটেন্ট শেষ হতে চলেছে, যদিও আমেরিকার মতো কিছু বাজারে বিভিন্ন আইনি সম্প্রসারণের কারণে পেটেন্ট সুরক্ষা ২০৩১ সাল পর্যন্ত থাকতে পারে।
এই কারণে বিভিন্ন দেশে পেটেন্টের অবস্থা আলাদা। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে জেনেরিক ওষুধ তুলনামূলক দ্রুত বাজারে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেনেরিক সংস্করণ বাজারে এলে দামের বড় পতন ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ওষুধের দাম ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ভারতেই প্রায় ৫০টি জেনেরিক সংস্করণ বাজারে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে মাসিক চিকিৎসার খরচ অনেকটাই কমে যেতে পারে এবং আরও বেশি রোগী এই চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থা IQVIA-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি GLP-1 ওষুধের ক্ষেত্রে 'অ্যাক্সেস এক্সপ্যানশন' বা চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বড়ভাবে বাড়ার একটি পর্যায় শুরু করতে পারে।
সেমাগ্লুটাইড সাধারণ রাসায়নিক ওষুধ নয়। এটি একটি পেপটাইড-ভিত্তিক জৈবিক ওষুধ। এই ধরনের ওষুধের জেনেরিক সংস্করণকে অনেক সময় বায়োসিমিলার বলা হয়। তাই এগুলিকে বাজারে আনার আগে সংস্থাগুলিকে প্রমাণ করতে হয় যে ওষুধটি মূল ওষুধের মতোই কার্যকর এবং নিরাপদ।
তবে একবার অনুমোদন পেলে এই ওষুধগুলি একইভাবে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং খিদে কমানো —এই দুটি কাজই করতে পারে।
ভারতের বেশ কয়েকটি বড় ওষুধ সংস্থা ইতিমধ্যেই এই সুযোগের দিকে নজর রেখেছে।
সম্ভাব্য সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে—
Dr. Reddy’s Laboratories
Sun Pharmaceutical Industries
Lupin Limited
Cipla
Zydus Lifesciences
Torrent Pharmaceuticals
এই জেনেরিক ওষুধের দাম প্রতি সপ্তাহের ডোজে প্রায় ৫০০০ টাকা হতে পারে বলে অনুমান—যা মূল ওষুধের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম।
ভারতের মতো দেশে, যেখানে অধিকাংশ রোগীকেই চিকিৎসার খরচ নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়, সেখানে এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
এমনটা এই প্রথম নয়। কোলেস্টেরল, ক্যানসার বা ভাইরাসবিরোধী ওষুধের ক্ষেত্রেও বহুবার দেখা গেছে— জেনেরিক আসার পর দাম দ্রুত কমে গেছে এবং চিকিৎসার সুযোগ অনেক মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
পেটেন্ট শেষ হয়ে গেলেও বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বিভিন্ন কৌশল নিচ্ছে নোভো নরডিস্ক। কারণ সংস্থার কাছে এখনও অনেক সেকেন্ডারি পেটেন্ট রয়েছে—যেগুলি ওষুধের ডেলিভারি ডিভাইস, ফর্মুলেশন বা ব্যবহারের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে।
এগুলির মাধ্যমে কিছু বাজারে একচেটিয়া অধিকার ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
ভারতে সংস্থাটি সম্প্রতি Abbott Laboratories-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সেমাগ্লুটাইডের একটি নতুন ব্র্যান্ডেড সংস্করণ বাজারে আনার পরিকল্পনাও করেছে।
একইসঙ্গে সংস্থাটি পরবর্তী প্রজন্মের স্থূলতা ও মেটাবলিক রোগের চিকিৎসা নিয়েও গবেষণায় বিনিয়োগ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেমাগ্লুটাইডের পেটেন্ট শেষ হওয়া এই দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফার্মাসিউটিক্যাল পরিবর্তনগুলির একটি হতে পারে।
ডায়াবেটিস ও ওজন কমানোর ওষুধের বৈশ্বিক বাজার ভবিষ্যতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এই বাজারে জেনেরিক প্রবেশ করলে, ওষুধের দাম কমবে, রোগীদের কাছে চিকিৎসা আরও সহজলভ্য হবে, সংস্থাগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে। অর্থাৎ, একসময় অত্যন্ত দামি চিকিৎসা হিসেবে পরিচিত সেমাগ্লুটাইড ভবিষ্যতে অনেক বেশি মানুষের নাগালে চলে আসতে পারে।