GRP78 প্রোটিন কীভাবে সুস্থ কোষে ঢুকে জিন বদলে ক্যানসার ছড়ায়, সেই প্রক্রিয়ার খোঁজ পেলেন বিজ্ঞানীরা। নতুন গবেষণায় উঠে এল ক্যানসারের বিস্তারের রহস্য।

শেষ আপডেট: 4 March 2026 17:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বজুড়ে ক্যানসারের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। ভারতে আগামী কয়েক বছরে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছিল Indian Council of Medical Research। চিকিৎসা বিজ্ঞানে কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপির মতো একাধিক অগ্রগতি হলেও, ক্যানসার কীভাবে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখনও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। এক গবেষণায় সেই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলেছে বলে দাবি বিজ্ঞানীদের।
আমেরিকার University of Southern California-র গবেষকরা জানিয়েছেন, ক্যানসার কোষ সরাসরি হামলা চালায় না; বরং সুস্থ কোষের ভেতরে ঢুকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়। তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS) জার্নালে। গবেষক দলের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যামি এস লি।
গবেষণায় উঠে এসেছে একটি বিশেষ প্রোটিনের নাম— GRP78। সাধারণ অবস্থায় এই প্রোটিন কোষের এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকিউলামে থাকে এবং কোষের স্বাভাবিক কাজকর্মে সহায়তা করে। কিন্তু ক্যানসার শুরু হলে এই প্রোটিনের আচরণ বদলে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, GRP78 প্রথমে সুস্থ কোষের নির্দিষ্ট প্রোটিনের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ গড়ে তোলে, বিশেষ করে ID2 প্রোটিনের সঙ্গে। এরপর সুযোগ বুঝে কোষের নিউক্লিয়াসে প্রবেশ করে।
একবার নিউক্লিয়াসে ঢুকে পড়লে কোষের জিনগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ শুরু হয়। ডিএনএ-র স্বাভাবিক নির্দেশ বদলে গিয়ে তৈরি হয় জিনগত রূপান্তর (Genetic Mutation)। এর ফলেই কোষ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিভাজিত হতে থাকে এবং টিউমারে পরিণত হয়। পরে সেই প্রোটিন আশপাশের কোষেও ছড়িয়ে পড়ে, ফলে ক্যানসারের বিস্তার দ্রুত হয়।
মানবদেহে শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম রয়েছে, যা অস্বাভাবিক কোষকে চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু ক্যানসার কোষের এই ‘ছদ্মবেশী’ কৌশলের কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় ইমিউন সিস্টেম বিপদের আঁচ পায় না। যখন পর্যন্ত শরীর বুঝতে পারে, ততক্ষণে কোষ বিভাজন বেড়ে গিয়ে টিউমার বড় হয়ে ওঠে বা অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে—যাকে বলা হয় মেটাস্টেসিস।
ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়েই গবেষকরা এই প্রোটিন-নির্ভর প্রক্রিয়ার সূত্র ধরতে পেরেছেন। তাঁদের দাবি, যদি GRP78 ও তার সঙ্গী প্রোটিনগুলিকে লক্ষ্য করে নতুন ওষুধ তৈরি করা যায়, তাহলে ক্যানসারের বিস্তার প্রাথমিক পর্যায়েই থামানো সম্ভব হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসার চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেরিতে ধরা পড়া। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ চিহ্নিত হলে অস্ত্রোপচার, ওষুধ বা রেডিওথেরাপির মাধ্যমে নিরাময়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু লক্ষণ উপেক্ষা করলে বা নিয়মিত স্ক্রিনিং না করলে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তাই সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস, যেমন ধূমপান বা দূষণ এড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
গবেষণাটি নতুন দিশা দেখালেও, বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এটি এখনও গবেষণার পর্যায়ে। তবু ক্যানসারের জিনগত ও প্রোটিনগত গতিপথ বোঝার এই অগ্রগতি ভবিষ্যতে আরও কার্যকর থেরাপি উদ্ভাবনের পথ খুলে দিতে পারে।
ক্যানসারকে হারাতে গেলে শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন দ্রুত শনাক্তকরণ, গবেষণার অগ্রগতি এবং সচেতন জীবনযাপন— এই তিনের সমন্বয়।