সয়া খাবার কি সত্যিই স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়? গবেষণা বলছে স্বাভাবিক সয়া নিরাপদ, তবে সাপ্লিমেন্টে সতর্কতা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ জানুন।

সয়া কী স্তন ক্যানসার ডেকে আনে?
শেষ আপডেট: 19 February 2026 11:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সয়া বা সয়া-মিশ্রিত খাবার (Soya Food) কি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়? এই খাবারের উপর সাধারণ মানুষের অগাধ ভরসা আছে। বিশেষ করে সয়ামিল্ক (Soya Milk), টোফু (Tofu), এডামামে(Edamame) বা কচি সয়াবিন দানা (Soya Bean) কিংবা সয়া সসের (Soya Sauce) মতো খাবার নিয়ে কখনও শোনা যায় পুষ্টিগুণের কথা, কখন আবার স্বাস্থ্যে কুপ্রভাবের দিকটিও উঠে আসে। কিন্তু বাস্তবে কি এই আশঙ্কার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে?
আমেরিকার ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিকের দুই অঙ্কোলজিস্ট ডা.এরিন রোয়েশ এবং ডা. টিফানি ওঙ্গার এ বিষয়ে বেশ কিছু গবেষণামূলক তথ্য তুলে ধরেছেন তাঁদের গবেষণায়। তাঁদের কথায়, খাদ্যতালিকায় স্বাভাবিকভাবে সয়া গ্রহণ করলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, তা নয়। তবে সয়া সাপ্লিমেন্ট ক্ষতিকারক।
সয়াবিনের প্রোডাক্ট কি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়?
এটা সরাসরি বললে ভুল বলা হবে যে সয়া খাওয়া স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। ডা.ওঙ্গার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন,মানুষের উপর করা গবেষণায় এই দাবির পক্ষে সরাসরি কোনও প্রমাণ মেলেনি। তবে সয়ার সঙ্গে ক্যানসার হওযার প্রবণতা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন। আসল সত্যটা সকলের জানা দরকার। এর জন্য বিষয়ের গভীরে গিয়ে বুঝতে হবে।
সয়া ও স্তন ক্যানসার নিয়ে উদ্বেগের সূত্র কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, বিজ্ঞানসম্মতভাবে সয়া কেন কার্সিনোজেনিক হিসেবে ধরা হয় তা নিয়ে। এটি কী শরীরে ‘ফাইটোইস্ট্রোজেন’-এর মতো আচরণ করতে পারে? বিষয়টি বুঝতে গেলে প্রথমে জানতে হবে, স্তন ক্যানসার ও সয়ার রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে কিছু মৌলিক তথ্য।
আমাদের শরীরের কোষের উপরিভাগে থাকে প্রোটিনজাত অণু, যেগুলিকে বলা হয় ‘রিসেপ্টর’। এই রিসেপ্টরগুলি রক্তে উপস্থিত নির্দিষ্ট কিছু পদার্থের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। স্তন ক্যানসার কোষের রিসেপ্টর বিশেষভাবে ‘ইস্ট্রোজেন’ নামক হরমোনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং এই সংযোগ ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি দ্রুত করতে পারে। তাই শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে।
অন্যদিকে, সয়া-জাত পণ্যে থাকে ‘ফাইটোইস্ট্রোজেন’ নামের উদ্ভিদজাত যৌগ, যা শরীরে গিয়ে ইস্ট্রোজেনের মতো আচরণ করে। এখান থেকেই তত্ত্ব উঠে আসে যে সয়া খেলে শরীরে ইস্ট্রোজেনের প্রভাব বাড়তে পারে, ফলে ইস্ট্রোজেন-সংবেদনশীল ক্যানসার, যেমন স্তন ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ আশঙ্কা ছিল, সয়া খাওয়া মানেই শরীরে ইস্ট্রোজেন বাড়া, আর তার ফলেই ক্যানসারের ঝুঁকি।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। ডা. রোয়েশ জানিয়েছেন, “সয়ায় থাকা ফাইটোইস্ট্রোজেন ইস্ট্রোজেনের মতো দেখতে হলেও, তারা রিসেপ্টরের সঙ্গে একইভাবে যুক্ত হয় না। ফলে তারা ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিকে সেইভাবে ত্বরান্বিত করে না। এই পার্থক্যটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
গবেষণা কী বলছে?
সয়া যে স্তন ক্যানসারের কারণ হতে পারে, তা একেবারে ভিত্তিহীনও নয়। কিছু ল্যাবরেটরি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, সয়ায় থাকা ‘আইসোফ্লাভোন’ (যা এক ধরনের ফাইটোইস্ট্রোজেন) উচ্চ মাত্রায় শরীরে গেলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে এখানেই বড় পার্থক্য— ল্যাব টেস্টের রেজাল্ট আর মানবদেহে তার প্রতিক্রিয়া এক নয়। মানুষের উপর করা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে, আইসোফ্লাভোন স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় না। বরং কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে যে সয়া হয়তো স্তন ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে পারে এবং বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
ডা. ওঙ্গারের বক্তব্য, “সমস্যার ইঙ্গিত শুধু ল্যাব মডেলে দেখা গিয়েছে, মানুষের উপর গবেষণায় নয়। তাই গবেষণার তথ্য ভাল করে খতিয়ে দেখা জরুরি, কাদের উপর গবেষণা হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, তা বোঝা দরকার।”
সয়া সাপ্লিমেন্ট নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
সয়া দুধ, টোফু, এডামামে বা অন্যান্য সয়া-যুক্ত খাবার খাওয়া বন্ধ করার কোনও প্রয়োজন নেই। তবে ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিকের এই দুই বিশেষজ্ঞের কথায় সয়া সাপ্লিমেন্ট মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। তাই সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তাঁরা। ডা. ওঙ্গার বলেন, “খাদ্যের মাধ্যমে সয়া গ্রহণ করাই ভালো, সাপ্লিমেন্টে ভরসা করা যাবে না।
এছাড়া একটি বড় সমস্যা হল—আমেরিকায় সাপ্লিমেন্টগুলি ওষুধের মতো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত নয়। বলা ভাল এদেশ তথা এ রাজ্যেও সাপ্লিমেন্টের রমরমা। যে কেউ কিনতে পারেন, খেতে পারেন। ফলে সাপ্লিমেন্টে ঠিক কতটা উপাদান রয়েছে বা ডোজ কতটা সঠিক, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। বিপদ হয় এভাবেই।
চিকিৎসকের কথায়, “ওষুধের দোকান থেকে কেনা আইসোফ্লাভোনের ডোজ টোফু খাওয়া বা সয়া দুধ পান করার তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সরাসরি খাদ্যের উপর নির্ভরশীল হওয়া দরকার, বিকল্প হিসেবে সয়া সাপ্লিমেন্টে ভরসা করবেন না। তাঁদের পরামর্শ—খাবার ও জলের মাধ্যমে স্বাভাবিক সয়া গ্রহণ করুন এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক বিকল্প বেছে নিন। আসলে এই পরামর্শ গোটা খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে আর কী করবেন?
স্তন ক্যানসারের আরও অনেক ঝুঁকির কারণ রয়েছে। তাই সয়া নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার আগে এই ঝুঁকিগুলির দিকে নজর দেওয়াই বেশি জরুরি।
কিছু ঝুঁকি রয়েছে যেগুলি পরিবর্তন করা যায় না—যেমন বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য বা স্তনের গঠন। তবে কিছু জীবনযাপন-সম্পর্কিত ঝুঁকি রয়েছে, যেগুলি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেগুলি হল:
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন: দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকলে ঝুঁকি বাড়ে। তাই এমন কোনও ব্যায়াম বা শারীরিক কাজ বেছে নিন যা আপনি উপভোগ করেন। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা সক্রিয় থাকা জরুরি।
সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন: পরিমিত আহার গুরুত্বপূর্ণ। চর্বিহীন প্রোটিন, দানাশস্য, ফল ও সবজি খান। স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনি কমান।
ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান কমান: ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান স্তন ক্যানসার-সহ একাধিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। ছাড়তে সমস্যা হলে চিকিৎসকের সাহায্য নিন।
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন: বিশেষ করে মেনোপজের পর মোটা হয়ে যাওয়া স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে উপরের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলি বজায় রাখলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
সবশেষে ডা. রোয়েশ স্পষ্ট জানিয়েছেন, “স্তন ক্যানসারের পরিচিত ঝুঁকির কারণগুলিকে উপেক্ষা করা সয়া খাওয়ার চেয়েও বিপজ্জনক। জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।”
আর খাদ্যতালিকায় থাকা স্বাভাবিক সয়াবিন বা সয়া-মিশ্রিত অন্য খাবারগুলো স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় না। তাই অযথা ভয় পাওয়ার কারণ নেই।