জিনের কার্যপ্রণালী বদলে কোষকে আবার তরুণ করার সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা। বার্ধক্য রোধে নতুন গবেষণার দিশা।

শেষ আপডেট: 20 March 2026 11:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আশিতে আসিও না!
আশি অবধি আয়ু (Anti-Aging) থাকলে আসতেই হবে। চুল পেকে যাবে, চামড়া কুঁচকে যাবে, হাত-পায়ে শিরা উঠে শীর্ণ-জীর্ণ ত্বক হবে, দাঁত পড়ে যাবে... যৌবনের ঝলমলে দিন চলে গিয়ে বার্ধক্য এসে যাবে হঠাৎ করেই। পুরানের গল্পের যযাতি জরা দান করে বৃদ্ধ থেকে জোয়ান হয়েছিলেন। তাঁর গোটা শরীর একেবারে ট্রান্সফর্ম হয়ে গিয়েছিল। থুরথুরে বুড়ো থেকে চনমনে যুবক হওয়ার এই জার্নিটা কীভাবে হয়েছিল তা পুরানে রহস্যই রাখা হয়েছে। জাদু মন্ত্রবলে তো আর সব সম্ভব হয় না। আসল ব্যাপারটা কী ঘটেছিল তারই খোঁজে আছেন বিজ্ঞানীরা।
এই যে বুড়ো কোষ একেবারে ভোল পাল্টে ফেলছে (Anti-Aging) , পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠছে সে নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিশাল গবেষণা চলছে। ‘অ্যান্টি-এজিং’, মানে হল বয়স ধরে রাখা বা প্রকৃতির নিয়মকে ফাঁকি দিয়ে শরীরের বয়স কমিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে বিরাট কর্মযজ্ঞ চলছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সক ইনস্টিউটের বিজ্ঞানীরা সে পথেই কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার সক ইনস্টিউটের সঙ্গে এই গবেষণায় জোট বেঁধেছে জেনেনটেক। ইঁদুরের ওপর সেলুলার রিজুভেনেশন (Cellular rejuvenation ) থেরাপির প্রয়োগ করছেন বিজ্ঞানীরা। এর অর্থ হল, মানব শরীরের মূল ধারক ডিএনএ-র সাজসজ্জা বদলে দিয়ে ফের দেহের কোষ ও কলাকে নবীন করে তোলা। আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। মানুষ বুড়ো হয় কারণ শরীরের কোষ-কলাগুলোর কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বয়স বেড়ে যায়। শরীরে তার ছাপ পড়তে শুরু করে। যদি এই প্রক্রিয়াটাকেই ঘুরিয়ে দেওয়া যায় (Anti-Aging) , তাহলেই বাজিমাত হয়ে যাবে।
বেশিদিন বেঁচে থাকার বাসনা কমবেশি সব মানুষেরই আছে। সমুদ্র মন্থন করে দেবতারাই যে শুধু অমৃতকুম্ভের সন্ধান করেছিলেন তা নয়, মানুষও যুগ যুগ ধরে সেই অমৃতেরই খোঁজ করে চলেছে। আয়ু বৃদ্ধি কীভাবে হবে সে নিয়ে খোঁজ-গবেষণা দীর্ঘ বছরের। একই সঙ্গে বুড়ো শরীরকে ফের তারুণ্যের স্বাদ দেওয়ার গবেষণাও চলছে। অ্যান্টি-এজিং নিয়ে সক ইনস্টিটিউটের গবেষণা তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের বংশগতির ধারক ডিএনএ-র মধ্যেই যাবতীয় গোপন সংকেত লুকনো থাকে। কোষ কখন কার্যক্ষম থাকবে, কতদিন পরে কার্যক্ষমতা হারাবে, কখন সতেজ থাকবে, কখন বুড়ো হবে ইত্যাদি। সহজ করে বললে, কোষ যখন বুড়ো হয় তখন তার মধ্যে জিনের সেই সংকেতে কিছু বদল আসে। জিনের মধ্যে রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণেই কোষ ধীরে ধীরে সতেজতা হারাতে থাকে। ফলে কোষ দিয়ে তৈরি কলার কার্যক্ষমতাও কমতে থাকে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার জৌলুস হারায়। মানুষ বার্ধ্যকের দিকে এগিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা গোড়ার এই বদলটাকেই থামিয়ে দিতে চাইছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিএনএ-র মধ্যে যে সংকেতের বদল হয় তাকেই ফের অদলবদল করে পরীক্ষা করছেন বিজ্ঞানীরা।
কালচক্রের গতিকে যদি উল্টে দিতে হয় তাহলে শরীরের কোষকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে তার আগের রূপে। এটা সম্ভব করতে পারে স্টেম কোষই (Stem Cell)। মানব ভ্রূণ তৈরির সময় জন্ম নেয় স্টেম কোষ। এই স্টেম কোষের ক্ষমতা বিরাট। মাতৃগর্ভে যখন মানবদেহ বা অন্য কোনও প্রাণীর দেহ গঠন শুরু হয়, তখন প্রথম কাজ শুরু করে প্রোজেনিটর কোষ বা স্টেম সেলগুলি। স্টেম সেল বিশেষ ধরনের পরিণত কোষে পরিবর্তিত হয় এবং সেই কোষ বিভাজিত হয়ে এক-একটি বিশেষ অঙ্গ তৈরি করে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ডিফারেন্সিয়েশন।
এই প্রক্রিয়াটা একমুখী। সাধারণত প্রোজেনিটর কোষ থেকে ডিফারেন্সিয়েটেড বা পরিণত কোষ তৈরি হয়, কিন্তু উল্টোটা হয় না। কিন্তু এই ধারণা প্রথম বদলে দেন পানি বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা। ২০০৬ সালে তিনি একগুচ্ছ বিশেষ ধরনের প্রোটিন আবিষ্কার করেন (ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস), যেগুলির পরিমাণ ও কার্যক্ষমতা অদলবদল করে ডিফারেন্সিয়েটেড কোষগুলিকে ফের প্রোজেনিটর কোষে পরিণত করা যায়। অর্থাৎ, কোষগুলিকে তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
সক ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা চার ধরনের ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস খুঁজে বের করেছেন-- Oct4, Sox2, Klf4, cMy। এগুলির বিন্যাস অদলবদল করলে নাকি কোষের বয়স কমছে বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে সাফল্য মিলেছে। দেখা গেছে এই ফ্যাক্টরগুলো কোষের পুনরুজ্জীবনে সাহায্য করছে। শরীরে দুরারোগ্য রোগ হওয়ার ঝুঁকিও কমাচ্ছে।
তবে পরীক্ষাটা আপাতত ইঁদুরের ওপরেই সীমাবদ্ধ আছে। মানুষের শরীরে কবে সাফল্য মিলবে, তারই পরীক্ষায় রয়েছেন বিজ্ঞানীরা।