সিঙ্গাপুরে জুবিন গর্গের (Zubeen Garg) মৃত্যু, স্ত্রী গরিমার দাবি, অভিযুক্তরা সত্য লুকোচ্ছে, অসম পুলিশ ইচ্ছে করলে রহস্যের সমাধান করতে পারবে। দ্রুত তদন্ত ও স্বচ্ছতা দাবি করছেন তিনি।

জুবিন ও গরিমা।
শেষ আপডেট: 10 October 2025 19:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অসমের জনপ্রিয় গায়ক জুবিন গর্গের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হচ্ছে দিনদিন। এবার সেই প্রশ্ন তুললেন তাঁর স্ত্রী, ফ্যাশন ডিজাইনার গরিমা শইকিয়া গর্গ। তাঁর কথায়, অসম পুলিশ চাইলে এই রহস্য অনেক আগেই মিটে যেত, কিন্তু ইচ্ছে নেই বলেই সত্য সামনে আসছে না। গরিমার দাবি, যাঁরা এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁরা কেউই সত্যি বলছেন না, বরং ঘটনার আসল চিত্র গোপন করার চেষ্টা করছেন। তাঁর আরও অভিযোগ, জুবিনের মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনা নয়, বরং তা একরকম অবহেলার ফল।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে উত্তর-পূর্ব ভারত উৎসবে যোগ দিতে গিয়েছিলেন জুবিন। সেই সফরেরই অংশ হিসেবে তিনি অংশ নেন এক ইয়ট ভ্রমণে। সেন্ট জন’স আইল্যান্ডে যাওয়ার সময়েই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনাটি। সিঙ্গাপুর প্রশাসনের দেওয়া মৃত্যুসনদে লেখা ছিল—‘ড্রাউনিং’, অর্থাৎ ডুবে মৃত্যু। কিন্তু দেশে ফেরার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—যে মানুষটির চিকিৎসকদের পরামর্শে সাঁতার কাটা বারণ ছিল, তাঁকে কেন জলে নামতে দেওয়া হল? কোথায় ছিল নিরাপত্তা? কোথায় চিকিৎসা সহায়তা?
জুবিনের মৃত্যু ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্কের পর অসম সরকার তদন্তভার দেয় রাজ্যের ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট বা CID-কে। পরে তৈরি হয় একটি বিশেষ তদন্ত দল বা SIT। তারও পরে ৪ অক্টোবর সরকার গঠন করে একটি বিচারিক কমিশন, যার দায়িত্বে রয়েছেন গৌহাটি হাই কোর্টের বিচারপতি সৌমিত্র সাইকিয়া। তাঁকে ছ’মাসের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। অথচ এর মধ্যেই গরিমার মনে হচ্ছে তদন্তের গতি অত্যন্ত মন্থর। তাঁর স্পষ্ট মন্তব্য, “অসম পুলিশ চাইলে যেকোনও রহস্যের জট ছাড়াতে পারে। কিন্তু সবকিছুর জন্য প্রয়োজন ইচ্ছে। আমরা ধৈর্য ধরছি, সহযোগিতা করছি, কিন্তু এখন চাই দ্রুত পদক্ষেপ।”
এই মামলায় এখনও পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে—জুবিনের ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শর্মা, অনুষ্ঠান আয়োজক শ্যামতনু মহন্ত, ব্যান্ডের দুই সদস্য শেখর যোগী গোস্বামী ও অমৃতপ্রভা মহন্ত, এবং সন্দীপন গার্গ, যিনি আসাম পুলিশের অফিসার ও জুবিনের আত্মীয়। তদন্তকারীদের মতে, শ্যামতনু মহন্তের পরিবারের প্রভাব এবং রাজনৈতিক যোগাযোগও রয়েছে। মামলায় ইতিমধ্যেই খুনের অভিযোগ যুক্ত হয়েছে, যা এই রহস্যকে আরও জটিল করে তুলেছে। গরিমা গার্গ বলেন, “ওরা জানত জুবিনকে সাঁতার কাটতে মানা করা হয়েছিল। তবুও ওকে জলে নামতে দেওয়া হয়েছিল। এটা নিছক অবহেলা নয়, এর পেছনে আরও কিছু আছে বলে আমাদের সন্দেহ।”
তিনি জানান, ইয়টে কোনও নিরাপত্তা টিম বা চিকিৎসক ছিলেন না। অথচ এমন ভ্রমণে এসব থাকা উচিত ছিল। তাঁর কথায়, “জুবিনকে ঠিকমতো দেখাশোনা করা হয়নি। ও তো শুধু একজন শিল্পী নয়, অসমের প্রাণ। ওর প্রতি দায়িত্ব ছিল সবার।” গরিমা আরও জানান, সিঙ্গাপুর থেকে দেহ ফেরার পর অসম পুলিশ দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করে তাঁর হাতে রিপোর্ট দেয়, কিন্তু তিনি সেটি নিজের কাছে রাখেননি। তিনি বলেন, “ওটা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটা রাষ্ট্রের। আমি আইন জানি না, তাই সেটি ফিরিয়ে দিয়েছি। সরকার ঠিক করবে এটা প্রকাশ করা উচিত কিনা।”
তাঁর কথায়, যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের বক্তব্যে কোনও মিল নেই। সবাই আলাদা আলাদা কথা বলছে। “ওরা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, সত্যি আড়াল করছে,” বলেন গরিমা। তাঁর মনে হচ্ছে, তদন্তে কোথাও না কোথাও গাফিলতি হচ্ছে, কিংবা কেউ ইচ্ছে করেই গতি কমাচ্ছে। তাঁর আবেদন, “তিন সপ্তাহ কেটে গেছে, অথচ মানুষ এখনও জানে না কী ঘটেছিল। জুবিন শুধু আমার স্বামী নয়, পুরো অসমের আবেগ। এই আবেগের সঙ্গে খেলা করা ঠিক নয়। তদন্ত দ্রুত হোক, সত্য প্রকাশ পাক।” শেষে তিনি সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “আমরা শুধু সত্য চাই, ন্যায় চাই।”
অসমের সঙ্গীত জগতের ইতিহাসে জুবিন গার্গ ছিলেন এক আলাদা নাম। তাঁর কণ্ঠে লোকসঙ্গীত, রক, আধুনিক—সব ধারাই পেয়েছিল এক নতুন সুর। তাই তাঁর আকস্মিক মৃত্যু শুধুমাত্র এক পরিবারের ক্ষতি নয়, এটা গোটা অসমের আঘাত। তাঁর মৃত্যুর পর এই প্রশ্ন যে কত দূর গড়াবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু আপাতত একটাই সত্য—অসমের মানুষ জুবিনকে ভুলতে পারছে না। গরিমাও ন্যায়ের জন্য লড়াই থামাচ্ছেন না।